প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৯ জানুয়ারি, ২০২৬
বাংলার গ্রাম একসময় ছিল খেলার মাঠ, মিলনমেলা আর উৎসবের এক বিশাল মঞ্চ। সেখানে দিনের আলো শেষ হতো শিশুদের দৌড়ঝাঁপের মধ্য দিয়ে, আর সন্ধ্যা নেমে আসত কিশোর-যুবকদের প্রতিযোগিতা আর হাসিঠাট্টার শব্দে। গোল্লাছুটের দৌড়, বউচির নিয়ম, কানামাছির ব্যস্ততা, হাডুডুর থাবা, দড়ি টানাটানির উত্তেজনা কিংবা নৌকাবাইচের পাগল করা ছন্দ; এসব ছিল গ্রামীণ খেলাধূলার প্রাণ। গ্রামের মাঠে তখন শুধু খেলার উত্তেজনা ছিল না; ছিল সম্পর্ক, ছিল এক ধরনের সমবেত শক্তি, ছিল সামাজিক সংযোগের অদৃশ্য সুতো। কিন্তু এখন এসব দৃশ্য যেন স্মৃতি হয়ে গেছে। গ্রামের মাঠে গিয়ে দেখা যায় বাচ্চারা দল বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু খেলছে না। হাতে আছে মোবাইল, কানে এয়ারফোন, চোখ পর্দায় আটকে। মাঠ ফাঁকা, গাছের ছায়া নিঃসঙ্গ, আর খেলা যেন সময়ের পেছনে হারিয়ে গেছে।
গ্রামীণ খেলাধূলা আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে, এটা শুধু একটি বাক্য নয়, বরং সময়ের পরিবর্তনের সাক্ষী। সমাজের পরিবর্তন, প্রযুক্তির আগ্রাসন, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গি আর আধুনিক বিনোদনের বিস্তার- সবকিছু মিলেই যেন নিরব চাপে মুছে দিচ্ছে এসব খেলা। অথচ এগুলো শুধু বিনোদন ছিল না, বরং ছিল সংস্কৃতি, ছিল স্বাস্থ্যচর্চা, ছিল অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা, ছিল পরিচয়ের অংশ। গ্রামীণ খেলাধূলা ধীরে ধীরে পিছে সরে গেলে তা শুধু ঐতিহ্যের ক্ষতি নয়; প্রজন্মেরও ক্ষতি।
একদিন গ্রামের বাচ্চারা বিকালে মাটি ছুঁয়ে, ঘাম ঝরিয়ে খেলত। গোল্লাছুটে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার সেই উত্তেজনা, কিংবা হাডুডুতে ‘হাডুডু হাডুডু’ বলে নিঃশ্বাস নিয়ন্ত্রণের সেই বুদ্ধিমত্তা; এসব ছিল শরীরের সাথে মস্তিষ্কেরও খেলা। গ্রামের খেলা দলবদ্ধভাবে শেখাতো কাজ করতে, শেখাতো নেতৃত্ব, শেখাতো সাহস, শেখাতো হার-জিতের মধ্য দিয়ে সহমর্মিতা। এখনকার শিশুদের অনেকেই হয়তো জিততে পারে, কিন্তু হারতে শেখে না; কারণ তারা খেলা শেখার সময়টা মোবাইল বা স্ক্রিনের সামনে ব্যয় করছে, যেখানে রিস্টার্ট বাটন আছে, কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই।
ডিজিটাল যুগে বিনোদন বদলে গেছে। এখন শিশুরা বিকালে গিয়ে বন্ধু ডাকার বদলে মেসেঞ্জারে নোটিফিকেশন পায়, মাঠে ছুটে যাওয়ার বদলে অনলাইনে ‘জয়েন গেম’ ক্লিক করে। গ্রামে গিয়ে দেখা যায় স্কুল থেকে ফিরে অনেক শিশুই গেম খেলে, ক্রিকেট বা ফুটবল মাঠে নয়; বরং ফোনের পর্দায়। তাদের কাছে হাডুডুর শব্দ অর্থহীন, গোল্লাছুট অচেনা, দাড়িয়াবান্ধা বা কানামাছি যেন গল্পের বিষয়। আর এসব খেলা থেকে তৈরি হওয়া যে সামাজিক মিলন ও সম্পর্ক, তাও যেন ক্রমে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
গ্রামে আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে মাঠ হারিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। একসময় গ্রামের মাঝখানে ছিল বিশাল সব খোলা মাঠ।
ধান কাটার মৌসুমে বা চৈত্রের শেষ দিকে যখন গ্রাম একটু অবসর পেত, তখন সেই মাঠেই হতো খেলা ও উৎসব। কিন্তু এখন কৃষিজমি দামি হয়ে গেছে, অনেক গ্রামে মাঠ বা পতিত জমি বাড়িঘর বা বাণিজ্যিক কাজে পরিণত হয়েছে। জমির মূল্য যত বেড়েছে, মাঠ তত কমেছে। মাঠ কমে গেলে খেলা কমে, খেলা কমে গেলে মিলনমেলা বন্ধ হয়, মিলনমেলা বন্ধ হলে সামাজিক সম্পর্কও কমে যায়। এ এক অদ্ভুত চক্র, যা নীরবে চলে যাচ্ছে কিন্তু প্রভাব রেখে যাচ্ছে গভীরভাবে।
গ্রামীণ খেলাধূলা হারিয়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ হলো একাডেমিক চাপ। এখন অভিভাবকেরা চান শিশুরা যেন ভালো ফল করে, কোচিংয়ে যায়, ইংরেজিতে পারদর্শী হয়, কম্পিউটার শেখে। তাদের কাছে খেলা সময় নষ্ট মনে হয়। আগে গ্রামের পরিবারগুলো শিক্ষাগত কর্মকাণ্ড ও খেলার মধ্যে ভারসাম্য রাখত। স্কুল শেষে খেলতে যেত শিশুরা, তবুও পড়াশোনায় পিছিয়ে যেত না। এখন যেন সময়ের গণনা বদলে গেছে, খেলা বাদ দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য বাদ দিয়ে পড়াশোনা; সামাজিক বিনোদন বাদ দিয়ে ডিজিটাল বিনোদন।
ষাট-সত্তর বছর আগের গ্রামে নৌকাবাইচ ছিল উৎসবের প্রাণ। বর্ষার শেষে নৌকা সাজিয়ে সুর মিলিয়ে চালকদের চিৎকার; এটা শুধু খেলা ছিল না, ছিল শিল্প, ছিল আবেগ, ছিল যোগসূত্র। কিন্তু এখন নৌকাবাইচ হয় বটে, কিন্তু তা অনুষ্ঠান নির্ভর, মধ্যে মধ্যে মিডিয়ার ক্যামেরার জন্য বা রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখার অংশ হিসেবে। গ্রামের যুবকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এগুলোতে আগের মতো নেই। তারা এখন শহরে কাজ করে, থাকে অন্য জায়গায়, আর গ্রামে ফিরে আসে উৎসবের দিনে, সেও হয়ত দুদিনের জন্য।
অথচ গ্রামীণ খেলাধূলার পাঠ সমাজে অনেক বড় ভূমিকা রাখত। লাঠিখেলা শেখাত শৃঙ্খলা ও শক্তি, হাডুডু বা কাবাডি শেখাত দ্রুত চিন্তা ও সাহস, দড়ি টানাটানি শেখাত দলবদ্ধ চর্চা, গোল্লাছুট শেখাত গতি ও কৌশল। এসব খেলার কোনো কৃত্রিম নিয়ম ছিল না, ছিল না চাপ, ছিল না পরীক্ষা; ছিল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক শেখার পদ্ধতি। কোনো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিশুদের জন্য এমন শেখার পদ্ধতি পরবর্তীতে তৈরি করা হয়, যা মূলত খেলার মধ্য দিয়ে শেখা। অথচ আমাদের গ্রামে এই শিক্ষাটি ছিল স্বতঃস্ফূর্তভাবে। এখন সেটাই হারিয়ে যাচ্ছে।
বহির্বিশ্বে যেসব দেশ শিশুদের শৈশবকে খেলাধূলার মাধ্যমে গড়ে তুলেছে, সেসব দেশে স্বাস্থ্য, আচরণ, মনোবিজ্ঞান ও সামাজিক দক্ষতা- সবক্ষেত্রেই উন্নতি বেশি। খেলাধূলা মানসিক চাপ কমায়, বিষণ্ণতা কমায়, সামাজিক সংযোগ বাড়ায় আর নেতৃত্ব তৈরি করে। অথচ আমাদের সমাজ শৈশবকে প্রতিযোগিতার চাপে রেখেছে। শিশুরা পড়াশোনা করে, পরীক্ষা দেয়, টিউশনে যায়; কিন্তু খেলতে পারে না। একসময় গ্রামের খেলাধূলা ছিল এই ভারসাম্য ফেরানোর মাধ্যম।
গ্রামীণ খেলাধূলা হারিয়ে যাওয়া মানে স্মৃতিও হারানো। অনেকের শৈশব জুড়ে আছে বৃষ্টি শেষে মাঠে কাদা মাখা দৌড়, রোদে পুড়ে গোল্লাছুট খেলা, ঈদের সকালে দড়ি টানাটানির হাসি, নৌকাবাইচের চিৎকার কিংবা বিজয়ী দলকে লাউ বা কলা পুরস্কার দেওয়া। এসব স্মৃতি শুধু মজার নয়; মানুষের আবেগ, সম্পর্ক ও পরিচয়েরও অংশ। এখনকার বাচ্চারা সেই স্মৃতি পাবে কি? হয়তো তাদের স্মৃতি হবে ভার্চুয়াল, আর সেখানেই ক্ষতি, বাস্তব সম্পর্ক ভার্চুয়াল সম্পর্কের মতো সহজে গড়ে ওঠে না।
তবে হারিয়ে যাওয়া মানেই শেষ হয়ে যাওয়া নয়। কিছু জায়গায় আবার গ্রামীণ খেলাধূলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। স্কুলে বা কলেজে গ্রামীণ ক্রীড়া উৎসব, পহেলা বৈশাখে হাডুডু বা নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা, স্থানীয় ক্লাবগুলোতে কাবাডি টুর্নামেন্ট- এসব ইতিবাচক দিক। যদিও এগুলো এখনও খুব সীমিত এবং অনেকটাই অনুষ্ঠাননির্ভর, তবুও একটা চেষ্টা চলছে যা ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক। একটি দেশের সংস্কৃতি শুধু তার সংগীত, সাহিত্য বা পোশাকে নয়; তার খেলাধূলাতেও প্রকাশ পায়। পশ্চিমের ফুটবল বা ক্রিকেট আমাদের দেশে জনপ্রিয়, কিন্তু গ্রামের খেলাগুলো আমাদের নিজেদের। শিশুদের দৌড়ঝাঁপ, কিশোরদের খেলায় তর্ক আর আনন্দ, যুবকদের প্রতিযোগিতায় একতাবদ্ধতা- এসবই আমাদের সমাজকে তৈরি করেছে। এগুলো হারিয়ে গেলে আমাদের ভেতরের অনেক কিছুই হারিয়ে যাবে।
গ্রামীণ খেলাধূলা ফিরিয়ে আনার জন্য তিনটি দিক জরুরি- মাঠ, সময় ও মানসিকতা। মাঠ ছাড়া খেলা হয় না। সময় ছাড়া অংশগ্রহণ হয় না। আর মানসিকতা ছাড়া উৎসাহ হয় না। অভিভাবকদেরও একটু ভাবতে হবে, শিশুর স্বাস্থ্য ও মানসিক সুস্থতা পরীক্ষার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও চাইলে এই খেলাগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার, যুবকেন্দ্র, ক্লাব, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কিংবা ক্রীড়া সংস্থাগুলোর ভূমিকা থাকতেও পারে।
হয়তো একদিন গ্রামের শিশুরা আবার খেলতে শিখবে মাঠে, ভার্চুয়াল জগতে নয়। হয়তো আবার ঈদের পরে দড়ি টানাটানি হবে, বৈশাখে নৌকাবাইচ হবে, হাডুডুর শ্বাসরুদ্ধ উত্তেজনা ছড়াবে মাঠ জুড়ে। হয়তো আবার শিশুরা দৌড়াতে দৌড়াতে হারতে শিখবে, জিততে শিখবে, সম্পর্ক গড়তে শিখবে। আমাদের সমাজে আবার ফিরবে সেই হারিয়ে যাওয়া মিলনমেলার শব্দ।
আরিফুল ইসলাম রাফি, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়