ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

শীতের রাতে মানবেতর জীবনযাপন

নুসরাত জাহান (স্মরনীকা)
শীতের রাতে মানবেতর জীবনযাপন

শীত মানুষের জীবনে কখনও উৎসব, কখনও উষ্ণতার আনন্দ। কিন্তু শহরের ফাঁকা ফুটপাত, ব্রিজের নিচের কালো অন্ধকার, আর শীতল রাতের কাঁপতে থাকা বাতাস বলে দেয় শীত সবার জন্য সুখ নিয়ে আসে না। কেউ যখন কম্বলে মুড়ি দিয়ে ঘুমায়, ঠিক তখনই আরেকজন ঠান্ডায় জমে যাওয়ার ভয়ে রাতভর চোখ মেলে রাখে। শীত যেন এক নিষ্ঠুর পরীক্ষক, যার কাছে মানবেতর জীবনযাপনে থাকা মানুষ, বিশেষ করে পথশিশুরা, প্রতিদিনই পরাজিত হয়।

ঢাকা শহরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার মানুষ শীতে মানবেতর জীবনযাপন করে। বিশেষ করে ফুটপাত, স্টেশন, পার্ক, ব্রিজের নিচে থাকা মানুষ যাদের মাথাগোঁজার ঠাঁই নেই। আর আছে অসংখ্য পথশিশু, যাদের ঘর মানে রাস্তাই, বিছানা মানে প্লাস্টিকের চাদর, কম্বল মানে পুরোনো কাগজ বা বস্তা। শীত যত বাড়ে, তাদের কষ্ট তত গভীর হয়। আমরা যেটাকে শীতের আলাদা অনুভূতি বলি, তাদের কাছে সেটা রাতের নিঃশব্দ আতঙ্ক। শীতে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার জন্য তারা একে অন্যের গা ঘেঁষে, ছেঁড়া কাপড়, বস্তা বা পরিত্যক্ত ব্যানার জড়িয়ে বসে থাকে।

শীতকাল আসলেই জরুরিভিত্তিতে নানা সংস্থা, ব্যক্তি বা সংগঠন কম্বল বিতরণ শুরু করে কিন্তু বাস্তবতা হলো, সাহায্যটি থাকে সাময়িক, অপ্রতুল এবং অনেক সময়ে সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছায় না। ঢাকার রেলস্টেশনে রাতে দেখা যায় ৬-১০ বছর বয়সী বাচ্চারা কুঁকড়ে শুয়ে আছে, ঠান্ডায় হাত-পা জমে গেছে, অথচ শরীরে নেই একটি গোছালো গরম কাপড়ও। ফুটপাতের নারী-পুরুষের অবস্থা আরও দুর্বিষহ। কেউ আবার ছোট বাচ্চাকে বুকে চেপে বসে থাকে যেন নিজের গায়ের উষ্ণতা দিয়ে সন্তানকে বাঁচানো যায়। বয়সী মানুষরা শীতে সবচেয়ে বিপদে পড়ে, কারণ তাদের শরীর আগের মতো সহ্য করতে পারে না। একটি ছোট সমীক্ষায় দেখা যায়, শীতকালে রাস্তার মানুষদের মৃত্যুর সংখ্যা অন্যান্য মৌসুমের তুলনায় অনেক বেশি। কারণ ঠান্ডাজনিত রোগ, নিউমোনিয়া, জ্বর এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সবকিছু মিলেই তাদের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

এ মানবিক সংকট হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে কিছু গভীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণ। দারিদ্র্য ও বৈষম্য এর অন্যতম প্রধান কারণ। দেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য এতটাই তীব্র যে একদিকে বিলাসবহুল জীবন, অন্যদিকে ফুটপাতে বেঁচে থাকার সংগ্রাম এই দুইয়ের তফাৎ প্রতিদিনই আরও বাড়ছে। দারিদ্র্যের কারণেই মানুষ ঘর হারায়, কাজ হারায়, সুযোগ হারায়। নগরায়ণ ও স্থানচ্যুতির ফলেও মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে তাদের। গ্রাম থেকে শহরে শ্রমের খোঁজে মানুষ আসে; কিন্তু কাজের নিশ্চয়তা নেই। জায়গার দাম আকাশছোঁয়া। যাদের সামান্য আয়, তাদের পক্ষে ভাড়া বাড়ি নেওয়াও কঠিন। আর যাদের কোনো আয় নেই, তারা বাধ্য হয়ে রাস্তাই বেছে নেয়। সামাজিক অবহেলার কারণেও এমনটি হয়ে থাকে।

পথশিশুদের জন্য কোনো সুসংগঠিত নীতি নেই। তারা কারো পরিবারের সদস্য নয়, কারও দায়িত্বও নয় ফলে রাষ্ট্রীয় সহায়তার বাইরে রয়ে যায়। অনেকের কাছে তারা সমস্যা, আবার অনেকে মনে করে অপরাধপ্রবণ। তাই সমাজ তাদের মানবিক দৃষ্টি দেয় না। শীতপ্রস্তুতি না থাকা ও নীতিগত ঘাটতির ফলে প্রতিবছর হাজারও মানুষ রাস্তায় ধুঁকে মরে। সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র কম এবং যেগুলো আছে তাও পর্যাপ্ত নয়। অনেকেই নিরাপত্তাহীনতার কারণে এসব কেন্দ্রে যেতে চায় না। এছাড়া শীতে সাহায্য কার্যক্রমগুলো দীর্ঘমেয়াদি নয়, বছরজুড়ে নিয়মানুবর্তী কোনো ব্যবস্থাপনা নেই। এই সমস্যা শুধু দুঃখ প্রকাশ করে শেষ করার মতো নয়। কিছু বাস্তবমুখী সমাধান প্রয়োজন। সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি ও উন্নয়ন করতে হবে। প্রতিটি শহর, উপজেলা ও জেলায় শীতকালীন স্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র থাকা জরুরি, যেখানে খাবার, চিকিৎসা এবং গরম কাপড়ের ব্যবস্থা থাকবে।

পথশিশুদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রণয়ন করতে হবে। তাদের জন্য শিক্ষা, খাদ্য, চিকিৎসা এবং নিরাপদ বাসস্থানের নিশ্চয়তা দিতে হবে। অস্থায়ী কম্বল বিতরণ নয় বছরজুড়ে যত্নশীল উদ্যোগ দরকার। এনজিও ও কমিউনিটি উদ্যোগ সক্রিয় করতে হবে। যারা কাজ করছে, তাদের সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। কমিউনিটিভিত্তিক পোশাক ব্যাংক, কম্বল ব্যাংক বা শীত-সংগ্রহ ক্যাম্প স্থাপন করা যেতে পারে। সমাজের সম্পৃক্ততা সৃষ্টি করতে হবে।

সমাজকে বুঝতে হবে, এই মানুষগুলো বোঝা নয়, বরং রাষ্ট্রেরই নাগরিক। তাদের বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। যে অতিরিক্ত পোশাক ব্যবহার হয় না, তা দান করা, খাদ্য সহায়তা দেওয়া এসব ছোট উদ্যোগই বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দক্ষতা উন্নয়ন করতে হবে।

যারা রাস্তায় থাকে, তাদের অনেকেই কাজ করতে আগ্রহী। সঠিক প্রশিক্ষণ ও কাজের সুযোগ পেলে তারা নিজেরাই নিজেদের ঘরভাড়া নিতে পারবে, শীতেও বাঁচতে পারবে। শীত শুধু ঋতুর পরিবর্তন নয়, মানবিকতারও পরীক্ষা। একটি সমাজ তখনই সভ্য হয়, যখন তার দুর্বলতম মানুষও নিরাপদ থাকে। যারা ফুটপাতে রাত কাটায়, যারা ছেঁড়া চাদর জড়িয়ে শীতে কুঁকড়ে থাকে, তারা আমাদের সমাজের অদৃশ্য মানুষ। আমরা যদি তাদের পাশে না দাঁড়াই, তবে উষ্ণ ঘরেও আমাদের মানবিকতা শীতল হয়ে যাবে। শীত সবার জন্য আনন্দের নয়, এ সত্যিটা আমরা যত দ্রুত বুঝব, তত দ্রুত বদলাবে তাদের গল্প, যাদের রাতের আকাশের নিচে বেঁচে থাকা মানেই প্রতিদিন একটি নতুন সংগ্রাম।

নুসরাত জাহান (স্মরনীকা)

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত