প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০১ ডিসেম্বর, ২০২৫
বাংলাদেশের শহুরে জীবন যেমন অনেক সুযোগ এনে দিয়েছে, তেমনি অনেক সমস্যাও সৃষ্টি করেছে। শহরের ঝকঝকে ভবন, আধুনিক অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান- সবকিছুই মানুষকে আকৃষ্ট করে। কিন্তু এই শহরের পেছনে লুকানো সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ভাড়াবাড়ির ক্রমবর্ধমান চাপ। ঢাকার মতো বড় শহরে, যেখানে কাজ, শিক্ষা এবং ব্যবসার সুযোগ বেশি, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে এই সমস্যা পুরোপুরি প্রভাবিত করছে।
প্রতিবছর শহরের বাসভাড়া বাড়ছে; কিন্তু মানুষের আয়ের হার সেই তুলনায় খুব কম। একজন সাধারণ চাকরিজীবীর মাসের বেতন দিয়ে যদি ভাড়া দেওয়া হয়, তাহলে পরিবারের বাকি খরচ- যেমন বাজার, বিদ্যুৎ-গ্যাস, চিকিৎসা, শিশুদের পড়াশোনা- সবই জটিল হয়ে পড়ে। অনেক পরিবার বাধ্য হয় খরচ কমিয়ে কাটাতে, আবার কেউ কেউ ঋণ নিয়ে সামাল দেয়। এতে মানসিক চাপ বেড়ে যায়, পরিবারে বিরোধও তৈরি হয়। নতুন শহরে এসে যারা কাজ বা পড়াশোনার জন্য থাকে, তাদের জন্য সমস্যা আরও জটিল। নিরাপদ ও সাশ্রয়ী জায়গায় বাসা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। ভালো এলাকার ফ্ল্যাট বা বাড়ি পেতে অনেক টাকা অগ্রিম দিতে হয়। অনেকে একাধিক বন্ধু বা সহকর্মীর সঙ্গে বাসাভাড়া করে, যাতে খরচ কম হয়। তবে স্থিরভাবে থাকা যায় না। ঘর পরিবর্তন, নতুন এলাকার পরিবেশ, প্রতিবেশীদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া- সবই চাপের কারণ।
ভাড়াবাড়ির কারণে শহরের নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষদের জীবনযাত্রার মানও কমে যাচ্ছে। নিরাপদ এলাকায় থাকার সুযোগ কমে যাওয়ায় তারা অনেক সময় শহরের অস্বাস্থ্যকর বা অস্থির এলাকায় থাকতে বাধ্য হয়। সেখানে স্কুল-কলেজ দূরে, পরিবেশ খারাপ, নিরাপত্তা কম। ফলে শিশুদের পড়াশোনার মানও প্রভাবিত হয়। পরিবারের বড়রা মানসিকভাবে অস্থির হয়ে পড়েন, পুরোপুরি কাজ বা জীবনে মনোযোগ দিতে পারেন না। শহরের ভাড়া বাড়ার সমস্যা শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ও মানসিক দিক থেকেও বড় প্রভাব ফেলে। অনেক পরিবার ঘর পরিবর্তনের চিন্তায় দিন কাটায়। নতুন এলাকায় মানিয়ে নেওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিবর্তন, অফিসে যাতায়াত- সবই চাপের সৃষ্টি করে। অনেক সময় পরিবারগুলোর মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। কেউ কেউ স্বল্প খরচের জন্য ছোট, অস্বাস্থ্যকর বা অস্থির বাসা বেছে নিতে বাধ্য হয়। এতে জীবনযাত্রার মান আরও কমে যায়।
রাকিব নামে এক তরুণ চাকরিজীবী ঢাকার একটি ওয়ান-রুমের ফ্ল্যাটে থাকেন। তার মাসিক বেতনের অর্ধেকই ভাড়া হিসেবে চলে যায়। বাকি অর্থ দিয়ে সে পরিবার এবং দৈনন্দিন খরচ সামলে চলেন। প্রতিদিন নতুন সমস্যা- পানি, বিদ্যুৎ, খাবারের খরচ- হিসাব রাখতে হয়। মানসিক চাপ এতোটাই বেড়ে যায় যে ঘুম কম হয়, কাজের মধ্যে মনোযোগ কমে যায়।
শিরিন নামের এক কলেজছাত্রীও শহরের একই সমস্যার মুখোমুখি। তার বাবা-মা গ্রামে থাকেন। শহরে পড়াশোনার জন্য তাকে এক বন্ধুর সঙ্গে ফ্ল্যাট শেয়ার করতে হয়। ভাড়া ও দৈনন্দিন খরচ মিলিয়ে সে প্রায় সবসময় চাপের মধ্যে থাকে। কখনও খাবারের খরচ কমাতে হয়, কখনও বই বা অন্যান্য খরচ বাদ দিতে হয়। ফলে তার পড়াশোনার উপর প্রভাব পড়ে।
মাহমুদ নামে এক অফিসকর্মীর পরিবারও একই সমস্যায় ভুগছে। তিন সন্তানসহ পরিবারটি শহরের কেন্দ্রের কাছে একটি ছোট ফ্ল্যাটে থাকে। মাসিক ভাড়া বাড়ায় পুরো পরিবারের জীবনযাত্রা স্থিতিশীল নয়। সন্তানদের স্কুলে পাঠানো, চিকিৎসা খরচ এবং অন্যান্য দৈনন্দিন খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।
ভাড়া বাড়ির সমস্যা শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ও মানসিক দিক থেকেও গভীর প্রভাব ফেলে। পরিবারে মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায়। সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়। মানুষ নতুন এলাকার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে না। শিশুরা শিক্ষার ক্ষেত্রে মনোযোগ দিতে পারে না। বড়রা কাজের প্রতি মনোযোগ হারায়। নিরাপত্তাহীনতা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ মানসিক চাপকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
শহরের নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো প্রায়ই একসঙ্গে থাকতে বাধ্য হয়। এতে স্বাধীনতা কমে এবং পারিবারিক বিরোধ তৈরি হয়। নতুন এলাকায় মানিয়ে নেওয়া, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সমস্যা সমাধান- সবই চাপের কারণ। অনেকে ভাড়ার জন্য পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে দেন। এতে জীবনযাত্রার মান আরও কমে যায়। ভাড়াবাড়ির সংকট সমাধানের জন্য সরকারের উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।
সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প বৃদ্ধি : সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন সাশ্রয়ী মূল্যের ফ্ল্যাট বা সরকারি আবাসন প্রকল্প বাড়াতে পারে। এতে সাধারণ মানুষ নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসনে থাকতে পারবে।
আইনগত সুরক্ষা : ভাড়াটিয়াদের জন্য আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বাড়িওয়ালা ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়াতে না পারে।
মানুষকেন্দ্রিক পরিকল্পনা : শুধুমাত্র নতুন ফ্ল্যাট তৈরি করা যথেষ্ট নয়, বিদ্যমান বাসস্থানে নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষা থাকা জরুরি।
সচেতনতা ও স্থানীয় সমিতি : শহরে ভাড়াটিয়াদের জন্য স্থানীয় সমিতি বা কমিটি গঠন করে সমস্যা সমাধান করা যেতে পারে।
যদি এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়, শহরের মানুষ আবার স্বস্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারবে। শহুরে জীবনের ভাড়া সংকট অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং মানসিকভাবে মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করছে। তাই এখনই প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, যথাযথ প্রশাসনিক পদক্ষেপ, এবং মানুষকেন্দ্রিক নীতি।
শহরের মানুষ নিরাপদ, স্থিতিশীল এবং সাশ্রয়ী আবাসনে থাকতে পারলে তারা নিজেদের জীবন উন্নত করতে পারবে। শিশুরা ভালো শিক্ষা পাবে, পরিবারে শান্তি থাকবে, মানসিক চাপ কমবে। শহরের জীবন হবে আরও সুন্দর, নিরাপদ এবং মানুষের জন্য সুবিধাজনক।
আরশী আক্তার সানী
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ