প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০২ জানুয়ারি, ২০২৬
সময়ের অবিনাশী স্রোতে ভেসে মহাকালের গর্ভে বিলীন হতে যাচ্ছে আরও একটি বছর। ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে খসে পড়ছে ২০২৫ সালের শেষ দিনটি। দিগন্তের ওপাড়ে আজ যে সূর্যটি অস্তমিত হতে যাচ্ছে, তা শুধু একটি দিনের অবসান নয়, বরং ৩৬াস দিনের অসংখ্য গল্প, অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম আর ইতিহাসের একটি পূর্ণাঙ্গ অধ্যায়ের সমাপ্তি। বিদায়বেলা সবসময়ই কিছুটা বিষণ্ণতার রঙ মাখা থাকে, কিন্তু সেই বিষণ্ণতাকে ছাপিয়ে যখন নতুনের আবাহন ধ্বনিত হয়, তখন মানুষের মনে সঞ্চারিত হয় এক অদ্ভুত উদ্দীপনা। ২০২৫ সালকে বিদায় জানিয়ে আমরা যখন ২০২৬ সালের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে, তখন পেছনে তাকালে দেখা যায় প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির এক বিশাল খতিয়ান, আর সামনে তাকালে দেখা যায় অফুরন্ত সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত।
২০২৫ সালটি ছিল আমাদের জন্য এক গভীর আত্মোপলব্ধির বছর। বিগত ১২টি মাস আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়, কীভাবে প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়ে সংহতি বজায় রাখতে হয়। প্রযুক্তির বিস্ময়কর উত্থান থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ, সবকিছুই এই বছরে আমাদের জীবনকে কোনো না কোনোভাবে স্পর্শ করেছে। আমরা দেখেছি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জয়জয়কার, যা আমাদের কাজের ধরনকে বদলে দিয়েছে। আবার একই সঙ্গে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি প্রকৃতির রুদ্ররূপ, যা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে পৃথিবীর প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা কতখানি গভীর। এই বছরটি শুধু অগ্রগতির ছিল না, বরং এটি ছিল ধৈর্যের এবং মানবিকতার এক অগ্নিপরীক্ষা।
আমরা একে অপরের হাত ধরে বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছি, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাফল্যে উল্লসিত হয়েছি এবং বড় কোনো ব্যর্থতায় ভেঙে না পড়ে আবার নতুন করে শুরুর প্রেরণা খুঁজে পেয়েছি।
স্মৃতির এই মলাটবদ্ধ ডায়েরিটি খুললে দেখা যায়, ২০২৫ আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে। হয়তো কারো জন্য এটি ছিল কর্মজীবনে সাফল্যের বছর, কারও জন্য ছিল প্রিয়জনকে নতুন করে চেনার সময়, আবার কারও জন্য হয়তো এটি ছিল ব্যক্তিগত বিবর্তনের এক অনন্য অধ্যায়। প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলো মিলেমিশেই তৈরি হয় একটি জাতির বা একটি বিশ্বের সামষ্টিক ইতিহাস। এই বছরে আমরা যা কিছু অর্জন করেছি, তা আমাদের আগামী দিনের পাথেয়। আর যা কিছু আমরা হারিয়েছি বা যেখানে আমাদের ঘাটতি ছিল, তা আমাদের জন্য বড় শিক্ষা। ইতিহাস আসলে বর্তমানের দর্পণ, আর ২০২৫ সাল সেই দর্পণে আমাদের এমন কিছু প্রতিচ্ছবি দেখিয়েছে যা থেকে আমরা ২০২৬ সালে আরও সচেতন ও সংবেদনশীল হওয়ার শিক্ষা নিতে পারি।
এখন আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ২০২৬ সাল। একটি নতুন বছরের শুরুর অর্থ হলো একটি পরিষ্কার সেøট, যেখানে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ লিখতে পারি নিজের মনের মতো করে। নতুন স্বপ্নের বীজ বপন করার এই তো মাহেন্দ্রক্ষণ। আমরা যখন ২০২৬-কে স্বাগত জানাই, তখন আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে স্বপ্ন শুধু কল্পনা নয়, এটি হলো কর্মের অনুপ্রেরণা। আগামীর এই পথচলা যেন শুধু যান্ত্রিক না হয়, বরং তা যেন হয় আনন্দময়। আনন্দহীন কোনো সাফল্যই দীর্ঘস্থায়ী তৃপ্তি দিতে পারে না। তাই নতুন বছরে আমাদের প্রথম অঙ্গীকার হওয়া উচিত, আমরা যা-ই করি না কেন, তার মধ্যে যেন প্রাণের স্পন্দন থাকে। আমরা যেন যান্ত্রিকতার ভিড়ে হারিয়ে না গিয়ে নিজেদের মানবিক সত্তাকে টিকিয়ে রাখি।
২০২৬ সালের এই সূচনালগ্নে আমাদের বৈশ্বিক এবং ব্যক্তিগত লক্ষ্য হওয়া উচিত টেকসই উন্নয়ন এবং মানসিক প্রশান্তি। আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি, যেখানে প্রতিযোগিতা আমাদের প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফিরছে। কিন্তু ২০২৬ সালে আমরা কি পারি না একটু থামতে? আমরা কি পারি না অগ্রগতির সংজ্ঞাকে নতুন করে সাজাতে? শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা প্রযুক্তির উৎকর্ষই যেন আমাদের একমাত্র লক্ষ্য না হয়। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক সমাজ বিনির্মাণ করা যেখানে বৈষম্য কমবে, যেখানে প্রতিটি মানুষ তার সৃজনশীলতাকে বিকশিত করার সুযোগ পাবে। নতুন বছরের স্বপ্নে যেন মিশে থাকে এক টুকরো সবুজ পৃথিবী, স্বচ্ছ আকাশ এবং নিরাপদ জনপদ। আমরা যেন ঘৃণা আর বিভেদ ভুলে সহমর্মিতার এক নতুন ভাষা রপ্ত করতে পারি।
২০২৬ সালের যাত্রা শুরু হোক সাহসের সঙ্গে। ভয় আমাদের থমকে দেয়, কিন্তু স্বপ্ন আমাদের সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। গত বছরে যেসব কাজ আমরা অপূর্ণ রেখে এসেছি, যেসব ইচ্ছা পূরণ হয়নি, সেগুলোকে নতুন করে সাজিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে এই নতুন বছর। এটি শুধু তারিখ পরিবর্তনের উৎসব নয়, এটি হলো নিজের ভেতরের জরা ও স্থবিরতাকে ঝেড়ে ফেলার উৎসব। আমরা যেন নতুন বছরে শুধু ভোক্তা না হয়ে একজন স্রষ্টা হতে পারি। আমাদের চিন্তা, আমাদের কর্ম এবং আমাদের ভালোবাসা যেন পৃথিবীর জন্য কল্যাণকর হয়। আগামীর এই পথে চলার সময় আমাদের মনে রাখতে হবে যে, একা চলার চেয়ে সবাই মিলে চলার আনন্দ অনেক বেশি। তাই ২০২৬ হোক সম্মিলনের বছর, একে অপরের পরিপূরক হওয়ার বছর।
২০২৫-এর স্মৃতিগুলো আমাদের হৃদয়ে অমলিন থাকবে। যে মানুষগুলো আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং যারা আমাদের পথ চলতে সাহায্য করেছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েই আমরা নতুনের পথে পা বাড়াব। ২০২৬ সাল আমাদের জন্য শুধু একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি একটি নতুন সম্ভাবনা। এই নতুন বছরে প্রতিটি ভোরে সূর্যের আলো যখন আমাদের চোখে পড়বে, তখন যেন আমরা অনুভব করি যে আমাদের হাতে আরও একটি সুযোগ আছে ভালো কিছু করার, সুন্দর কিছু গড়ার। অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে, বর্তমানের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আমরা এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাব- এই হোক আমাদের মূলমন্ত্র।
বিদায় ২০২৫, তোমার দেওয়া শিক্ষা আর স্মৃতি আমরা সযত্নে লালন করব। স্বাগতম ২০২৬, তোমার কোলে ডানা মেলুক আমাদের হাজারো নতুন স্বপ্ন। আগামীর এই যাত্রা হোক আনন্দের, সার্থকতা আর প্রশান্তির। পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ুক শান্তির বার্তা, আর মানুষের মনে জাগুক নতুন প্রাণের স্পন্দন। সব বাধা পেরিয়ে, সব অন্ধকার ঘুচিয়ে ২০২৬ হয়ে উঠুক এক আলোকময় নতুন অধ্যায়।
পরিশেষে বলা যায়, সময়ের এই অমোঘ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ২০২৫ সাল আমাদের জন্য শুধু ফেলে আসা দিনগুলোর একটি দীর্ঘ তালিকা নয়, বরং এটি আমাদের জীবনের অভিজ্ঞতার এক ঋদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় ভাণ্ডার। ক্যালেন্ডারের পাতায় সংখ্যার বদল ঘটবে, গ্রেগোরিয়ান বর্ষপঞ্জির হিসেবে দিনপঞ্জিকা পাল্টে যাবে, এটাই জগতের চিরন্তন নিয়ম। কিন্তু এই পরিবর্তনের মাঝে আমাদের ভেতরের স্বপ্ন, সংকল্প এবং সংগ্রামের চেতনা যেন কখনও অমলিন না হয়। ২০২৬ সাল আমাদের সামনে যে নতুন সম্ভাবনার জানালা খুলে দিচ্ছে, তাকে গ্রহণ করতে হবে অসীম সাহস, ধৈর্য এবং চরম ইতিবাচকতা দিয়ে। আমরা বিগত বছরে যা কিছু অর্জন করতে পারিনি, যা কিছু আমাদের অপূর্ণতা ছিল, সেই গ্লানিকে ঝেড়ে ফেলে নতুন উদ্যমে পথ চলাই হোক আমাদের মূল লক্ষ্য।
অতীতের ভুলগুলো থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা আমাদের ভবিষ্যৎ পথের দিশারি হিসেবে কাজ করবে। বর্তমানের প্রতিটি মুহূর্তকে পুঁজি করে আমরা যদি একটি মানবিক, সহনশীল এবং সাম্যবাদী সমাজ গঠনের দৃঢ় শপথ নিতে পারি, তবেই নতুনের এই আবাহন প্রকৃত অর্থে সার্থক হবে। অন্ধকার গহ্বর থেকে আলোর পথে ফেরার নামই জীবন; আর সেই জীবনের জয়গান গেয়েই ২০২৬ সাল হয়ে উঠুক পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্য শান্তি, নিরাপত্তা, অনাবিল সমৃদ্ধি আর অফুরন্ত আনন্দের এক নতুন দিগন্ত।
যান্ত্রিকতার এই যুগে আমরা যেন আমাদের আত্মিক ও মানবিক সত্তাকে বিসর্জন না দিই; বরং একে অপরের প্রতি ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিই। ২০২৫ আমাদের যে প্রজ্ঞা দিয়েছে, তাকে পাথেয় করে ২০২৬-এর প্রতিটি দিন যেন আমাদের এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায় এক সুন্দর ও শান্তিময় পৃথিবীর দিকে। বিদায় ২০২৫, তোমার স্মৃতিগুলো আমাদের হৃদয়ে অমলিন থাকবে। স্বাগতম ২০২৬, তোমার আলোয় উদ্ভাসিত হোক আগামীর প্রতিটি পদচিহ্ন, আমাদের সম্মিলিত যাত্রা হোক জ্যোতির্ময় এবং কল্যাণকর।
ওসমান গনি
লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট