ঢাকা শুক্রবার, ০২ জানুয়ারি ২০২৬, ১৮ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

জাতীয় সমাজসেবা দিবস ২০২৬ : মানবিক দায়িত্ব ও সমাজের অগ্রযাত্রা

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
জাতীয় সমাজসেবা দিবস ২০২৬ : মানবিক দায়িত্ব ও সমাজের অগ্রযাত্রা

সমাজের অবহেলিত, বঞ্চিত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে প্রতি বছর পালিত হয় জাতীয় সমাজ সেবা দিবস। এই দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়; বরং এটি মানবিক চেতনার এক শক্তিশালী স্মারক, যা আমাদের দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নগুলো নতুন করে ভাবতে শেখায়। জাতীয় সমাজ সেবা দিবস ২০২৬ এমন এক সময়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যখন বৈশ্বিক সংকট, অর্থনৈতিক বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও সামাজিক অস্থিরতার প্রভাব বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোকেও বহুমাত্রিকভাবে প্রভাবিত করছে। এই বাস্তবতায় সমাজসেবার ভূমিকা আরও গভীর, বিস্তৃত ও সময়োপযোগী হয়ে উঠেছে।

সমাজসেবার দর্শন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট : সমাজসেবা মূলত একটি মানবিক দর্শনের নাম। মানুষ সামাজিক জীব—এই মৌলিক সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে সমাজসেবার জন্ম। বাংলাদেশের সমাজসেবা কার্যক্রমের শিকড় বহু পুরোনো। উপমহাদেশীয় ঐতিহ্য, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায় পারস্পরিক সহায়তার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, আধুনিক সমাজসেবার ভিত্তি সেখানেই। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে পুনর্গঠন, পুনর্বাসন ও দারিদ্র্য বিমোচনে সমাজসেবার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব কার্যক্রম রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।

জাতীয় সমাজ সেবা দিবসের তাৎপর্য : জাতীয় সমাজ সেবা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়- উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন সমাজের শেষ প্রান্তের মানুষটিও মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারে। এই দিবস সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সামাজিক দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও ব্যক্তি পর্যায়ের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্র হিসেবেও দিবসটি গুরুত্বপূর্ণ।

সমাজসেবা ও দারিদ্র্য বিমোচন : বাংলাদেশের অন্যতম বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ হলো দারিদ্র্য ও বৈষম্য। সমাজসেবা কার্যক্রম দারিদ্র্য বিমোচনে বহুমুখী ভূমিকা রেখে চলেছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি সমাজের দুর্বল জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এসব উদ্যোগ সামাজিক সুরক্ষার একটি দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করেছে, যা মানবিক রাষ্ট্র গঠনে সহায়ক।

নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় সমাজসেবা : সমাজের অগ্রগতিতে নারী ও শিশুর ভূমিকা অনস্বীকার্য। অথচ এই দুটি শ্রেণিই নানা বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হয়। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে নারী উন্নয়ন, মাতৃত্বকালীন সহায়তা, শিশু সুরক্ষা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। একইভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করছে। জাতীয় সমাজসেবা দিবস এসব উদ্যোগের অগ্রগতি মূল্যায়নের সুযোগ এনে দেয়।

সমাজসেবা ও যুবসমাজ : যুবসমাজ যেকোনো দেশের শক্তি। তবে বেকারত্ব, মাদকাসক্তি ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তাদের বিপথে ঠেলে দিতে পারে। সমাজসেবা কার্যক্রমের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন, আত্মকর্মসংস্থান ও সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে যুবসমাজকে সমাজসেবামুখী করা সময়ের দাবি। স্বেচ্ছাসেবার মাধ্যমে তারা নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগব্যবস্থাপনায় সমাজসেবা : বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা অন্যতম দেশ। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন ও খরায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন, মানসিক সহায়তা ও সামাজিক পুনর্গঠনে সমাজসেবার ভূমিকা অপরিসীম। এই দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়- দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু প্রযুক্তি নয়, মানবিক সহানুভূতিও সমান জরুরি।

সমাজসেবায় নৈতিকতা ও মূল্যবোধ : সমাজসেবা শুধু পেশাগত দায়িত্ব নয়; এটি একটি নৈতিক অঙ্গীকার। সততা, জবাবদিহি ও মানবিক মূল্যবোধ ছাড়া সমাজসেবা কার্যক্রম কার্যকর হতে পারে না। সমাজসেবকদের প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় সমাজ সেবা দিবস আত্মসমালোচনার সুযোগ দেয়- আমরা কি সত্যিই মানুষের জন্য কাজ করছি, নাকি শুধু আনুষ্ঠানিকতা পালন করছি?

চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা : সমাজসেবা খাতে পর্যাপ্ত জনবল ও বাজেটের অভাব, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং সেবার লক্ষ্যভিত্তিক বণ্টনে অসামঞ্জস্য বিদ্যমান। পাশাপাশি সমাজসেবা সম্পর্কে জনসচেতনতার ঘাটতিও বড় বাধা। এই দিবস চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পথ খোঁজার উপলক্ষ।

২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে করণীয় : প্রথমত, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে সেবা আরও স্বচ্ছ ও সহজলভ্য করতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সরকার ও কমিউনিটি পর্যায়ে সমন্বয় জোরদার করা জরুরি। তৃতীয়ত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণদের স্বেচ্ছাসেবায় যুক্ত করতে হবে। চতুর্থত, দাননির্ভরতা কমিয়ে টেকসই ক্ষমতায়নভিত্তিক সমাজসেবা গড়ে তুলতে হবে।

জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটির কার্যক্রম : মানবিক স্বাস্থ্যসেবার বাস্তব রূপ, স্বাস্থ্য খাত সমাজসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র, যেখানে দরিদ্র মানুষের দুর্ভোগ সবচেয়ে স্পষ্ট। এই বাস্তবতা থেকে সরকারি হাসপাতালগুলোতে গড়ে ওঠে জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি। এর লক্ষ্য আর্থিকভাবে অক্ষম রোগীদের চিকিৎসা সহজ করা এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাকে রোগীবান্ধব করা। জরুরি অস্ত্রোপচার, জটিল চিকিৎসা ও ব্যয়বহুল পরীক্ষায় আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে সোসাইটিটি বহু জীবন রক্ষায় ভূমিকা রাখছে। রোগী কল্যাণ সোসাইটি শুধু আর্থিক সহায়তায় সীমাবদ্ধ নয়; রোগীর মানসিক ও সামাজিক কল্যাণেও গুরুত্ব দেয়। দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত রোগী ও পরিবারের মানসিক চাপ কমাতে সহানুভূতিশীল আচরণ, দিকনির্দেশনা ও সামাজিক সমর্থন আরোগ্যে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি অপেক্ষাকক্ষ, বিশুদ্ধ পানি, শৌচাগার ও পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থায় সহায়তার মাধ্যমে হাসপাতাল পরিবেশ উন্নত করা হয়।

এ সোসাইটি স্বাস্থ্য খাতে সামাজিক দায়িত্ববোধ ও দানশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তোলে।

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

সমাজকর্ম ও প্রবন্ধ লেখক প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত