প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০২ জানুয়ারি, ২০২৬
বিদায়ী ২০২৫ সাল দেশের শেয়ারবাজারের জন্য ছিল এক ঘটনাবহুল ও চ্যালেঞ্জিং বছর। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, অর্থনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপের মধ্যে দিয়ে বিনিয়োগকারীরা পার করেছেন একটি দীর্ঘ অনিশ্চয়তার সময়। বছরের শেষ কর্মদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সূচকের সামান্য উত্থান ঘটলেও, পুরো বছরের সামগ্রিক চিত্রটি খুব একটা সুখকর নয়।
সূচকের ওঠানামা ও বাজার চিত্র : বছরের শুরুতে ডিএসইএক্স সূচক যেখানে ছিল ৫২১৬ পয়েন্টে, বছরের শেষ কর্মদিবসে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৪৮৬৫ পয়েন্টে। অর্থাৎ পুরো বছরে প্রধান সূচকটি প্রায় ৩৫১ পয়েন্ট বা ৬.৭৩ শতাংশ হারিয়েছে। যদিও বছরের মাঝামাঝি সময়ে সূচক কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিল এবং ৫৬০০ পয়েন্ট অতিক্রম করেছিল, কিন্তু শেষ প্রান্তিকে এসে শেয়ার বিক্রির চাপের কারণে তা ফের নিম্নমুখী হয়।
লেনদেনে মন্দাভাব : ২০২৫ সালে বাজারের বড় একটি দুর্বলতা ছিল বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহ। ২০২৪ সালের তুলনায় দৈনিক গড় লেনদেন উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। গত বছর যেখানে গড়ে ৬৩২ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হতো, এ বছর তা ৫২১ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। অনেক বড় বিনিয়োগকারী ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সাইডলাইনে বসে পর্যবেক্ষণ করার নীতি অবলম্বন করেছেন, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ওপর।
খাতভিত্তিক প্রভাব ও তালিকাভুক্তি : ২০২৫ সাল ছিল নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে এক আকালের বছর। এক দশকের মধ্যে এই প্রথম বাজারে কোনো উল্লেখযোগ্য বড় আইপিও দেখা যায়নি। এর কারণ হিসেবে বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন কমিশন বাজারের স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় আইপিও অনুমোদনে কঠোরতা অবলম্বন করা হয়েছে। অন্যদিকে, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা খাত বড় ধরনের ধসের সম্মুখীন হয়েছে, যেখানে কিছু কোম্পানি তাদের মূল্যের ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হারিয়েছে।
আশার আলো ও সংস্কার : এত নেতিবাচক খবরের মধ্যেও কিছু ইতিবাচক দিক দৃশ্যমান।
ব্যাংক একীভূতকরণ : বছরের শেষ দিকে পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত হয়ে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠিত হওয়ার উদ্যোগ ব্যাংক খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কিছুটা ফেরাতে শুরু করেছে।
রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবাহ : ডিসেম্বরে প্রবাসীদের পাঠানো আয়ের ধারাবাহিকতা অর্থনীতির জন্য স্বস্তিদায়ক খবর ছিল, যা পরোক্ষভাবে বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে সহায়তা করছে।
স্বচ্ছতা বৃদ্ধি : নতুন কমিশন বাজারে কারসাজি ঠেকাতে বেশ কিছু আইনি সংস্কার ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, যার সুফল দীর্ঘমেয়াদে পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়।
শেয়ারবাজার মূলত আস্থার জায়গা। ২০২৫ সালটি ছিল সেই হারানো আস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টার বছর। যদিও সংখ্যাতত্ত্বে বাজার পিছিয়ে ছিল, কিন্তু কাঠামোগত সংস্কারের যে ভিত্তি এ বছর তৈরি হয়েছে, তার ফল ২০২৬ সালে পাওয়া যেতে পারে। বিনিয়োগকারীদের জন্য পরামর্শ থাকবে- হুজুগে পড়ে শেয়ার কেনাবেচা না করে কোম্পানির মৌলিক ভিত্তি (Fundamentals) বিচার করে বিনিয়োগ করার। ২০২৬ সালে শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়াবে এবং সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত হবে- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।