ঢাকা সোমবার, ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ২১ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

উপনিবেশবাদ ভেঙে মাথা তুলে দাঁড়ানোর প্রত্যয়

আব্দুল কাদের জীবন
উপনিবেশবাদ ভেঙে মাথা তুলে দাঁড়ানোর প্রত্যয়

বঙ্গজনপদ তথা বর্তমান বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবেই অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং উর্বর একটি অঞ্চল। এই ভূখণ্ডকে শাসন করেছে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভিনদেশি শক্তি। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, কেউ এ জনপদকে ভালোবেসে এখানকার সভ্যতার উন্নয়ন করেছে, আবার কেউবা এ অঞ্চলের সর্বস্ব লুটে নিয়ে নিজেদের করেছে অঢেল সম্পদশালী। এই বাংলা অঞ্চল বারবার মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সেই স্বাধীনতার স্থায়িত্ব ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর থেকে যে ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা হয়েছিল, তার রেশ আজ ভিন্ন আঙ্গিকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে মানচিত্র থেকে ব্রিটিশ বা ফরাসি শাসনের প্রথাগত অবসান ঘটলেও শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়, যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলছেন ‘নব্য উপনিবেশবাদ’। বর্তমান বিশ্বে আমেরিকা, ব্রিটেন, রাশিয়া এবং চীনের মতো দেশগুলো তাদের দাপট দেখাচ্ছে। বিশেষ করে পশ্চিমা শক্তিগুলোর উত্থান বিশ্বব্যবস্থাকে এক মেরুকরণের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ, আইএমএফের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলার মাধ্যমে তারা উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো মানবতার দোহাই দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও দিনশেষে তারা শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ রক্ষায় কতটা সচেষ্ট, তা আজ বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভূ-রাজনীতির বলি : ফিলিস্তিন থেকে সুদান : ফিলিস্তিনের বর্তমান মানবিক বিপর্যয়ের মূলে রয়েছে কয়েক দশকের ঔপনিবেশিক ষড়যন্ত্র। ঠিক একইভাবে বর্তমানে সুদান এক ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, সুদানে আরেকটি ‘গাজা’ তৈরি হতে যাচ্ছে। সুদানে যে আরএসএফ (RSF) গণহত্যায় মেতে উঠেছে, তার প্রধান অস্ত্রের জোগানদাতা হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাম উঠে আসছে। আবার ধারণা করা হয়, আমিরাতের নেপথ্য সহযোগী হিসেবে কাজ করছে ব্রিটেন।

এর অর্থ হলো, সুদানে গণহত্যার দায় পরোক্ষভাবে সেই পুরনো ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর দিকেই যাচ্ছে। গত শতাব্দীতে ফিলিস্তিনকে যেভাবে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, ইউক্রেন পরিস্থিতিও তার থেকে খুব বেশি ভিন্ন নয়। পশ্চিমা বলয়ের বাইরে রাশিয়া এককভাবে শক্তিশালী হওয়ায় ইউক্রেনে তাদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে পৃথিবীর বাকি অংশে নব্য উপনিবেশবাদের জাল এতটাই সুক্ষ্ম যে, তা সাধারণ মানুষের অনুধাবনের বাইরে থেকে যায়।

অর্থনৈতিক শৃঙ্খল ও বিশ্বমোড়লদের ভূমিকা : জাতিসংঘ তার আদর্শে কতোটা অটুট রয়েছে, তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী সংশয় তৈরি হয়েছে। পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলো যখন কোনো অপরাধ করে, তখন তা আন্তর্জাতিক আইনে কতটুকু অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলো যখন অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে আইএমএফের ঋণের দ্বারস্থ হয়, তখন তারা বিশ্বমোড়লদের শোষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এই ঋণের শর্তাবলি অনেক সময় সংশ্লিষ্ট দেশের সার্বভৌমত্বকে খর্ব করে।

বিশ্ববাজার এখন ডলার দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। ডলারের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে এমন কোনো মুদ্রাকে বিশ্বব্যাপী শক্ত ভিত গড়তে দেওয়া হচ্ছে না। এটি মূলত এক ধরনের অর্থনৈতিক উপনিবেশবাদ, যা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে সারাজীবন ঋণের জালে আবদ্ধ করে রাখে।

সফট পাওয়ার এবং সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন : উপনিবেশবাদ এখন আর শুধু সরাসরি ভূখণ্ড দখল নয়, বরং এটি ‘সফট পাওয়ার’ বা সুক্ষ্ম প্রচারণার (Narrative) মাধ্যমে কাজ করে। সুক্ষ্ম বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্যের মাধ্যমে একটি সম্ভাবনাময় জনপদকে গ্রাস করে নেয় আধুনিক সাম্রাজ্যবাদ। যখন কোনো দেশে এই ‘সফট উপনিবেশবাদ’ কাজ করে না বা তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না, তখনই সাম্রাজ্যবাদ তার নগ্ন রূপ ধারণ করে।

ইরাক, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, লিবিয়া এবং কাশ্মিরের পর এখন সুদান তার বাস্তব উদাহরণ। এসব জায়গায় যখনই কোনো জাতি তার নিজস্ব স্বকীয়তা বা সম্পদ রক্ষা করতে চেয়েছে, তখনই সেখানে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। এই তথাকথিত ‘গণতন্ত্র রক্ষা’ বা ‘সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধের’ নামে মূলত প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠনই মূল লক্ষ্য থাকে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে একটি নতুন পথে হাঁটার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা ছিল সবপ্রকার দেশি-বিদেশি আধিপত্যবাদকে সমূলে ধ্বংস করে বিশ্ব দরবারে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গঠন করা। কিন্তু একটি স্বাধীন সার্বভৌম সত্তা হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা কতোটা চ্যালেঞ্জিং, তা বর্তমান ভূ-রাজনীতি বিচার করলে বোঝা যায়।

বাংলাদেশ যদি পূর্ণাঙ্গভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পথে পা বাড়ায়, তবে তাকেও হয়তো সুদানের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি করার চেষ্টা করা হতে পারে। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগরের নিয়ন্ত্রণ এবং এই বন্দর পাওয়ার জন্য বিশ্বের সব পরাশক্তি মরিয়া হয়ে আছে। এই ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণেই বিশ্বমোড়লরা বাংলাদেশকে তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে দিতে চায় না।

স্বনির্ভরতার শপথ- আগামীর পথনকশা : বিশ্বব্যাপী এই অদৃশ্য শৃঙ্খল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি এবং সুসংগঠিতভাবে এগিয়ে যেতে হবে। চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটাতে হবে। করতে হবে বিভিন্ন সুক্ষ্ম সমস্যার সমাধান।

দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা : সবার আগে দেশ থেকে দারিদ্র্য দূর করতে হবে। অর্থনৈতিকভাবে পরাধীন দেশ কখনও প্রকৃত রাজনৈতিক স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে না।

কৃষি ও ভারী শিল্প : কৃষিতে বিপ্লব ঘটানোর পাশাপাশি আমাদের ভারী শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে হবে। শুধু কাঁচামাল রপ্তানিকারক দেশ না হয়ে ফিনিশড প্রোডাক্ট তৈরিতে মনোযোগী হতে হবে।

সাংস্কৃতিক মুক্তি : অর্থনৈতিক মুক্তির পূর্বশর্ত হলো সাংস্কৃতিক মুক্তি। বিজাতীয় সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ বাদ দিয়ে আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও মূল্যবোধকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে হবে।

ব্লু ইকোনমি বা নীল অর্থনীতি : বঙ্গোপসাগর আমাদের জন্য এক বিশাল আশীর্বাদ। সমুদ্রের তলদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে।

প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা : দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের সঠিক ব্যবহার এবং উত্তোলনে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে বিদেশি কোম্পানির ওপর নির্ভরতা কমে।

জনশক্তিকে জনসম্পদে রূপান্তর : আমাদের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। যথাযথ শিক্ষা ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের বিশ্বমানের জনসম্পদে রূপান্তর করার প্রজেক্ট এখনই হাতে নিতে হবে।

আমরা যখনই নিজস্ব উদ্ভাবন বা স্বাধীন নীতি নিয়ে এগোতে চাইব, তখনই হয়তো অদৃশ্য উপনিবেশবাদের রোষানলে পড়ব। নিষেধাজ্ঞার ভয় বা কৃত্রিম সংকটের মুখে আমাদের ফেলা হতে পারে। কিন্তু বর্তমান তুরস্কের উদাহরণ আমাদের সামনে আছে; যারা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজেদের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে বলীয়ান করেছে।

আমাদের দেশেও যদি একদল উন্মাদ দেশপ্রেমিক তরুণ থাকে, যারা নিজের দেশের মাটিকে হৃদয়ে ধারণ করে, তবে এই বন্ধুর পথ পাড়ি দেওয়া সহজ হয়ে যাবে।

আমরা চাই নিজেদের সম্পদ কাজে লাগিয়ে নিজেদের শক্তিতে বিশ্বমঞ্চে মাথা তুলে দাঁড়াতে। ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল ভেঙে এক নতুন, আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়াই হোক আমাদের আগামী দিনের অঙ্গীকার। এটি একটি ভয়ানক চ্যালেঞ্জ।

যেটি একমাত্র সফল করতে পারবে দেশপ্রেমিক জনগণ ও শিক্ষিত সমাজ।

আব্দুল কাদের জীবন

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত