ঢাকা সোমবার, ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ২১ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

তথ্যের ভিড়ে সত্য হারিয়ে যাচ্ছে

আরিফুল ইসলাম রাফি
তথ্যের ভিড়ে সত্য হারিয়ে যাচ্ছে

‘তথ্যের ভিড়ে সত্য হারিয়ে যাচ্ছে’, এই বাক্যটি আজ আর শুধু একটি সাহিত্যিক আক্ষেপ নয়, এটি আমাদের সময়ের সবচেয়ে গভীর ও জটিল বাস্তবতার সারসংক্ষেপ। আমরা এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি, যেখানে তথ্য আর জ্ঞানের সমার্থক নয়, বরং তথ্য নিজেই এক ধরনের দূষণে পরিণত হয়েছে। চারপাশে এত বেশি তথ্য জমে উঠছে যে, তার ভেতর থেকে সত্যকে আলাদা করে শনাক্ত করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। সত্য যেন আজ আর আলো হয়ে আসে না; সে আসে ছায়ার ভেতর দিয়ে, প্রশ্নের আকারে, দ্বিধার মধ্য দিয়ে।

একসময় তথ্য ছিল সীমিত, কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও একটি স্বচ্ছ কাঠামো ছিল। সংবাদ তৈরি হতো ধাপে ধাপে; সংগ্রহ, যাচাই, সম্পাদনা, প্রকাশ। এই প্রক্রিয়ায় ভুলের সুযোগ থাকলেও দায়িত্বের একটি নৈতিক বৃত্ত ছিল। আজ তথ্য তৈরি হয় মুহূর্তে, ছড়িয়ে পড়ে চোখের পলকে। এই গতির ভেতরেই সত্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ সত্য ধীর, সত্য সময় চায়, প্রমাণ চায়, প্রেক্ষাপট চায়। অথচ আমাদের সময় ধৈর্যহীন, তাড়াহুড়া-আক্রান্ত এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় অভ্যস্ত।

ডিজিটাল প্রযুক্তি তথ্যকে গণতান্ত্রিক করেছে, এ কথা সত্য। কিন্তু এই গণতন্ত্রের ভেতরেই জন্ম নিয়েছে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা। সবাই বলছে, সবাই দেখাচ্ছে, সবাই ব্যাখ্যা করছে; কিন্তু কেউ শোনার দায় নিচ্ছে না। ফলে তথ্য আর সংলাপ তৈরি করছে না; তৈরি করছে প্রতিধ্বনি। মানুষ নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে মেলে এমন তথ্যই খুঁজে নেয়, বাকিটা এড়িয়ে যায়। এই প্রতিধ্বনি-কক্ষেই সত্য ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে পড়ে, কারণ সত্য সব সময় আরামদায়ক নয়, অনেক সময় তা অস্বস্তিকর।

তথ্যের ভিড়ে সত্য হারিয়ে যাওয়ার পেছনে ক্ষমতার রাজনীতিও গভীরভাবে জড়িত। তথ্য এখন আর নিরপেক্ষ কিছু নয়; এটি ক্ষমতা অর্জন ও ধরে রাখার কৌশল। রাজনৈতিক শক্তি, কর্পোরেট স্বার্থ, এমনকি সাংস্কৃতিক আধিপত্য; সবকিছুই তথ্যকে ব্যবহার করছে নিজেদের মতো করে। এখানে মিথ্যা সব সময় সরাসরি মিথ্যা হয়ে আসে না। বরং সত্যের নির্দিষ্ট অংশ বেছে নেওয়া হয়, বাকি অংশ আড়াল করা হয়। এই নির্বাচিত সত্যই সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ এটি প্রশ্নহীন বিশ্বাস তৈরি করে।

মিডিয়ার ভূমিকাও এই সংকটে গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদমাধ্যম এখন শুধু তথ্য পরিবেশনকারী নয়, বরং প্রতিযোগিতামুখী এক শিল্প। রেটিং, ক্লিক, ভিউ এই পরিমাপগুলোই ঠিক করে দেয় কোন তথ্য গুরুত্ব পাবে। ফলে জটিল সত্যের জায়গা দখল করে নেয় চমকপ্রদ শিরোনাম। গভীর বিশ্লেষণের বদলে আসে তাৎক্ষণিক মতামত। এতে সত্য সরলীকৃত হয়, কখনো বিকৃতও হয়। মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়ে সহজ ব্যাখ্যায়, কঠিন বাস্তবতা থেকে দূরে থাকতে শেখে।

এই পরিস্থিতিতে পাঠক বা দর্শকের দায়ও অস্বীকার করা যায় না। আমরা নিজেরাই এমন এক মানসিক অবস্থায় পৌঁছেছি, যেখানে বেশি ভাবতে চাই না। দীর্ঘ লেখা আমাদের ক্লান্ত করে, গভীর প্রশ্ন আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে। আমরা দ্রুত সিদ্ধান্ত চাই, সহজ দোষী চাই, সরল সমাধান চাই। ফলে যে তথ্য আমাদের আবেগকে উসকে দেয়, সেটিই আমাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। সত্য তখন আর যুক্তির বিষয় থাকে না, হয়ে ওঠে অনুভূতির বিষয়।

তথ্যের এই সংকট সমাজে গভীর ফাটল তৈরি করছে। ভুল তথ্য ভয় সৃষ্টি করে, বিভ্রান্তি ছড়ায়, মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস জন্ম দেয়। একটি গুজব পুরো সমাজকে উত্তপ্ত করে তুলতে পারে, সহিংসতার জন্ম দিতে পারে। যখন সত্যের জায়গা দখল করে নেয় ধারণা ও সন্দেহ, তখন সামাজিক সংহতি ভেঙে পড়ে। মানুষ আর মানুষকে বিশ্বাস করে না, প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বাস করে না, এমনকি নিজের বিবেচনাশক্তিকেও সন্দেহ করতে শুরু করে।

আরও গভীর একটি সংকট হলো স্মৃতির ক্ষয়। তথ্যের অতিভারে আমাদের মনে কিছুই স্থায়ী হয় না। আজ যে ঘটনা আমাদের আলোড়িত করে, কালই তা নতুন কোনো তথ্যের ভিড়ে চাপা পড়ে যায়। এই ভুলে যাওয়ার সংস্কৃতি ক্ষমতাকে দায়মুক্তি দেয়। কারণ যে সমাজ মনে রাখে না, সে সমাজ প্রশ্ন তোলে না। সত্য তখন শুধু হারায় না, ইতিহাস থেকেও মুছে যেতে থাকে।

তথ্যের ভিড়ে সত্য হারিয়ে যাওয়ার ফলে নৈতিকতার সংকটও দেখা দেয়। সত্য যখন আপেক্ষিক হয়ে যায়, তখন ন্যায়বিচারও আপেক্ষিক হয়ে পড়ে। মানুষ আর প্রশ্ন করে না কী সত্য, কী ন্যায়; প্রশ্ন করে কার সত্য, কার বর্ণনা। এতে নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়, মূল্যবোধের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়। সমাজ তখন শুধু সুবিধার হিসাবেই সিদ্ধান্ত নিতে শেখে। তবু এই অন্ধকারের মধ্যেও সত্য পুরোপুরি বিলীন হয়নি। সত্য এখনো আছে, কিন্তু তা নীরব, ধীর এবং দৃঢ়। সত্যকে ফিরে পেতে হলে আমাদের চিন্তার গতি কমাতে হবে। প্রশ্ন করার অভ্যাস ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রতিটি তথ্যের উৎস, উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট বুঝতে শিখতে হবে। সত্য খুঁজে পাওয়ার জন্য শুধু প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন নৈতিক সাহস ও বুদ্ধিবৃত্তিক সততা।

সবশেষে বলা যায়, তথ্যের ভিড়ে সত্য হারিয়ে যাওয়া কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়, এটি মানবিক সংকট। আমরা কীভাবে দেখি, কীভাবে ভাবি এবং কীভাবে বিশ্বাস করি, এই প্রশ্নগুলোর সঙ্গেই সত্যের ভবিষ্যৎ জড়িত। যদি আমরা তথ্যকে প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করি, তবে সত্য আরও গভীরে তলিয়ে যাবে। আর যদি আমরা সচেতনভাবে সত্যের অনুসন্ধানকে নিজেদের দায়িত্ব বলে মেনে নিই, তবে এই কোলাহলের মধ্যেও সত্য আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে ধীরে, কিন্তু অটলভাবে।

আরিফুল ইসলাম রাফি

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত