প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৫ জানুয়ারি, ২০২৬
একবিংশ শতাব্দীর নির্বাচন আর শুধু ব্যালট বাক্স, ভোটকেন্দ্র কিংবা ভোট গণনার টেবিলে সীমাবদ্ধ নেই। দৃশ্যমান এই প্রক্রিয়ার আড়ালে সমান্তরালভাবে চলছে আরেকটি যুদ্ধ অদৃশ্য কিন্তু ভয়ংকর, নীরব কিন্তু সুদূরপ্রসারী প্রভাবসম্পন্ন। এই যুদ্ধের নাম সাইবার যুদ্ধ। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নির্বাচনি ব্যবস্থায় সাইবার নিরাপত্তা আজ আর বিলাসিতা নয়, এটি গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখার মৌলিক শর্ত।
ডিজিটাল প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে নির্বাচন ব্যবস্থায় এসেছে গতি, দক্ষতা ও স্বচ্ছতা। ভোটার তালিকা হালনাগাদ, প্রার্থীদের তথ্য সংরক্ষণ, ফলাফল প্রেরণ ও প্রকাশ সবকিছুতেই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। এতে একদিকে যেমন সময় ও ব্যয় কমছে, অন্যদিকে তেমনি সৃষ্টি হচ্ছে নতুন ধরনের ঝুঁকি। তথ্য এখন সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র, আর সেই তথ্য যদি সুরক্ষিত না থাকে, তাহলে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
বিশ্ব অভিজ্ঞতা আমাদের সতর্ক করে দেয়। উন্নত দেশগুলোও সাইবার হামলার ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয়। ভোটার ডেটাবেইস হ্যাক, ফলাফল ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ, নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট অচল করে দেওয়া, কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করা এমন ঘটনা বিভিন্ন দেশে নির্বাচনি প্রক্রিয়ার ওপর আস্থাকে নড়িয়ে দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচন-পরবর্তী অস্থিরতা, সহিংসতা ও রাজনৈতিক বিভাজনের পেছনেও সাইবার মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশনের বড় ভূমিকা রয়েছে।
বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বরং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে সাইবার ঝুঁকির মাত্রাও বাড়ছে। ভোটার তথ্য একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে সংবেদনশীল ডেটার মধ্যে পড়ে। এই তথ্য ফাঁস হলে বা বিকৃত হলে শুধু ব্যক্তিগত গোপনীয়তাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ে। একইভাবে, নির্বাচন সংক্রান্ত গুজব ও ভুয়া তথ্য খুব অল্প সময়ের মধ্যেই জনমনে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দিতে পারে, যার প্রভাব সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নির্দেশনা অত্যন্ত সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ। আসন্ন সংসদ নির্বাচন ও সম্ভাব্য গণভোট সামনে রেখে সব ধরনের সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে নির্দেশ তিনি দিয়েছেন, তা শুধু প্রশাসনিক আদেশ নয় এটি গণতন্ত্র রক্ষার একটি কৌশলগত ঘোষণা। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের সভায় তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, সরকার নাগরিক সেবাকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিয়ে যাচ্ছে, তাই এসব সেবাকে নিরাপদ রাখতে হলে সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করতেই হবে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় প্রধান উপদেষ্টা শুধু নির্বাচন নয়, সামগ্রিক নাগরিক সেবার সাইবার নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ নির্বাচন কোনো বিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের অন্যান্য ডিজিটাল অবকাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ সবকিছুই পরোক্ষভাবে নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত। এসব খাত দুর্বল হলে নির্বাচনি ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
এরইমধ্যে ৩৫টি প্রতিষ্ঠানকে ক্রিটিক্যাল ইনফরমেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে বাস্তবতা হলো এই তালিকা আরও সম্প্রসারণ এবং নিয়মিত হালনাগাদ করা প্রয়োজন। শুধু তালিকাভুক্ত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; এসব প্রতিষ্ঠানের সাইবার সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়মিত নিরীক্ষা, সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার আপডেট এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাই মূল চ্যালেঞ্জ।
প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট জনবলকে একটি রেটিং পদ্ধতির আওতায় আনার কথা। এটি বাস্তবায়িত হলে সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে। কোন প্রতিষ্ঠান কতোটা প্রস্তুত, কোথায় ঘাটতি রয়েছে তা নির্ধারণ করা সহজ হবে। একই সঙ্গে এটি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ইতিবাচক প্রতিযোগিতাও সৃষ্টি করতে পারে।
ফিনান্সিয়াল সেক্টরে সাইবার অপরাধের বিষয়ে ‘কেউ যেন পার পেয়ে না যায়’ এই কঠোর বার্তাও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অর্থনৈতিক খাতে সাইবার অপরাধ শুধু আর্থিক ক্ষতিই করে না, রাষ্ট্রের ওপর মানুষের আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। নির্বাচনকালীন সময়ে যদি আর্থিক ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হয়, তার রাজনৈতিক প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে। তাই জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি, বিচার বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত ভূমিকা এখানে অপরিহার্য।
তবে শুধু রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। নির্বাচনের সাইবার নিরাপত্তা একটি বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ। এরসঙ্গে জড়িত আছে ভোটারদের ডিজিটাল সচেতনতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা দেখছি, পড়ছি সবকিছুই যে সত্য নয়, এই বোধ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। ভুয়া খবর শনাক্ত ও যাচাই করার সক্ষমতা না থাকলে সাধারণ মানুষ সহজেই বিভ্রান্তির শিকার হয়। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা, তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি এবং গুজব প্রতিরোধে সক্রিয় অবস্থান গণমাধ্যমকেই নিতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের নৈতিক দায়িত্বও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভের জন্য যদি কেউ মিথ্যা তথ্য বা ডিজিটাল অপপ্রচারকে হাতিয়ার বানায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা।
নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব এখানে সবচেয়ে বেশি। শক্তিশালী সাইবার অবকাঠামো গড়ে তোলা, নিয়মিত নিরাপত্তা অডিট, ডেটা এনক্রিপশন, বহুমাত্রিক যাচাইকরণ (মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন) এবং জরুরি প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা ছাড়া আধুনিক নির্বাচন কল্পনাই করা যায় না। কোনো সাইবার হামলা হলে কীভাবে, কতো দ্রুত এবং কারা তা মোকাবিলা করবে এই রোডম্যাপ আগেই প্রস্তুত থাকতে হবে। সর্বশেষে বলতে হয়, গণতন্ত্রের মূল শক্তি মানুষের আস্থা। মানুষ যদি বিশ্বাস করে যে তাদের ভোট নিরাপদ, তাদের তথ্য সুরক্ষিত এবং নির্বাচনি ফলাফল অবিকৃত, তবেই নির্বাচন অর্থবহ হয়। সেই আস্থা নষ্ট হলে নির্বাচন শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়, যার কোনো গণতান্ত্রিক মূল্য থাকে না। নির্বাচনের সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে শুধু সার্ভার, সফটওয়্যার বা ফায়ারওয়াল রক্ষা করা নয় এটি নাগরিকের ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে রক্ষা করা।
সাদিয়া সুলতানা রিমি
শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ