ঢাকা সোমবার, ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ২১ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

বিষাক্ত বাতাসে বিপন্ন জনস্বাস্থ্য : বাঁচতে হলে লড়তে হবে এখনই

বিষাক্ত বাতাসে বিপন্ন জনস্বাস্থ্য : বাঁচতে হলে লড়তে হবে এখনই

বাংলাদেশ এখন এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি, যা কোনো সীমান্ত সংঘাত বা রাজনৈতিক অস্থিরতা নয়, বরং আমাদের নিঃশ্বাসের সঙ্গে মিশে থাকা অদৃশ্য বিষ- বায়ুদূষণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক বায়ুমান সূচকে (AQI) ঢাকা ও এর আশপাশের শহরগুলো নিয়মিতভাবে বিশ্বের শীর্ষ দূষিত শহরের তালিকায় থাকছে। এই পরিস্থিতি শুধু একটি পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, বরং এটি একটি জাতীয় স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা।

গত কয়েক দশকে শিল্পায়ন ও নগরায়নের নামে আমরা প্রকৃতিকে চরম অবজ্ঞা করেছি। বায়ুদূষণের মাত্রা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শিশু থেকে বৃদ্ধ- কেউই নিরাপদ নয়। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর শুধু বায়ুদূষণের কারণে হাজার হাজার মানুষ অকাল মৃত্যুবরণ করছে। ফুসফুসের ক্যান্সার, শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ এবং কিডনিজনিত জটিলতার মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই বিষাক্ত বাতাস। গর্ভবতী মায়েরা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, যার ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশে বায়ুদূষণের কারণগুলো এখন আর অজানা নয়।

প্রধানত চারটি উৎস থেকে এই বিষ ছড়াচ্ছে- দেশের চারপাশের শত শত ইটভাটা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ কার্বন ও সালফার ডাই-অক্সাইড ছড়িয়ে দিচ্ছে। যথাযথ আচ্ছাদন ছাড়াই রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও বহুতল ভবন নির্মাণের ফলে বাতাসে ধূলিকণার (PM 2.5) পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহারকারী যানবাহনগুলো রাজপথে বিষ উগড়ে দিচ্ছে। শিল্পবর্জ্য পুড়িয়ে ফেলা এবং কারখানার অপরিশোধিত ধোঁয়া সরাসরি বায়ুমণ্ডলে মিশছে। এছাড়া আন্তঃসীমান্ত বায়ুদূষণও একটি বড় প্রভাব ফেলছে।

করণীয় ও স্থায়ী সমাধান- বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে শুধু সভা-সেমিনার বা ক্ষণস্থায়ী পরিকল্পনা করলে চলবে না। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি এবং কঠোর পদক্ষেপ। সনাতন পদ্ধতির ইটভাটা চিরতরে বন্ধ করে পরিবেশবান্ধব ‘জিগজ্যাগ’ পদ্ধতি বা ব্লক ইটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। মেগাপ্রজেক্ট থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত ভবন নির্মাণ—সব ক্ষেত্রেই পানি ছিটানো এবং বেষ্টনী দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। আইন অমান্যকারীদের বড় অঙ্কের জরিমানা ও কাজের অনুমতি বাতিলের বিধান কার্যকর করতে হবে।

ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে গণপরিবহনের মান উন্নত করতে হবে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক যানবাহন উৎসাহিত করা এবং কলকারখানায় গ্রিন টেকনোলজি ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। ঢাকা ও এর আশপাশের সবুজ এলাকা বৃদ্ধি করতে হবে। শহরের প্রতিটি খালি জায়গায় গাছ লাগানো এবং কৃত্রিম জলাধার তৈরি করে ধূলিকণা কমানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। যেহেতু বায়ুদূষণ একটি বৈশ্বিক সমস্যা, তাই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে ‘এয়ার কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট’ নিয়ে কাজ করতে হবে।

বায়ু ূষণ আমাদের জীবন থেকে শুধু আয়ু কেড়ে নিচ্ছে না, এটি আমাদের অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতাকেও ধ্বংস করছে। অসুস্থ নাগরিক নিয়ে একটি জাতি কখনোই সমৃদ্ধ হতে পারে না। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করে পরিবেশ আইনকে দাঁত-নখযুক্ত করে তুলতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন আমরা নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য নির্মল বাতাস নিশ্চিত করতে পারব। নতুবা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আমরা রেখে যাব শুধু একটি বিশাল হাসপাতাল। এখনই সময় জেগে ওঠার। সরকার, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ মানুষ- সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে বাংলাদেশকে এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে মুক্ত করতে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত