ঢাকা বুধবার, ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ২৩ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ঐতিহ্য থেকে জিআই স্বীকৃতি : ফরিদপুরের পাট টেকসই অর্থনীতির নতুন দিগন্ত

কৃষিবিদ ড. মো. আল-মামুন
ঐতিহ্য থেকে জিআই স্বীকৃতি : ফরিদপুরের পাট টেকসই অর্থনীতির নতুন দিগন্ত

বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্য খাত দেশের অর্থনীতি, গ্রামীণ জীবিকা এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়নে বহু দশক ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। একসময় ‘সোনালি আঁশ’ নামে পরিচিত এই ফসল দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎস ছিল। গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকাশক্তি, শিল্পাঞ্চলের বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের পরিচয়ের অন্যতম বাহক- পাট ছিল সব ক্ষেত্রেই কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে ফরিদপুর অঞ্চলের পাট তার দীর্ঘ, উজ্জ্বল ও শক্তিশালী আঁশের কারণে বিশ্ববাজারে একটি স্বতন্ত্র সুনাম অর্জন করেছিল।

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্লাস্টিক দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশগত সংকটের কারণে নবায়নযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব কাঁচামালের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ফরিদপুরের পাটের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জিআই স্বীকৃতি শুধু প্রশাসনিক অর্জন নয়; এটি কোনো পণ্যের উৎপত্তি, গুণগত বৈশিষ্ট্য এবং ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি হাতিয়ার।

ফরিদপুরের পাটের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। পদ্মা, আড়িয়াল খাঁ ও অন্যান্য নদীবিধৌত অঞ্চলের উর্বর পলিমাটি, অনুকূল জলবায়ু এবং শতাব্দী প্রাচীন চাষপদ্ধতির কারণে এখানকার পাটের আঁশ তুলনামূলকভাবে লম্বা, মসৃণ ও শক্তিশালী হয়। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে ‘ঋধৎরফঢ়ঁৎ ঔঁঃব’ নামে পরিচিত এই পাট ইউরোপীয় শিল্পকারখানায় ব্যাপক চাহিদা পেত। সে সময় বাংলার পাট মানেই ছিল মানসম্মত কাঁচামালের প্রতীক, আর ফরিদপুরের পাট ছিল তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

২০২৪-২৫ মৌসুমে বাংলাদেশে প্রায় ৭ লাখ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়ে আনুমানিক ১৬ লাখ মেট্রিক টন পাটআঁশ উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে ফরিদপুর জেলায় প্রায় ৮৬,৫০০ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ মেট্রিক টনের বেশি। এই পরিসংখ্যান এ অঞ্চলের কৃষি সম্ভাবনা এবং পাটের ঐতিহ্যকে প্রতিফলিত করে।

ঔপনিবেশিক আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমল পর্যন্ত পাট ছিল দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। ১৯৫০ থেকে ১৯৭০-এর দশকে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে আসত। কোটি কোটি কৃষক, শ্রমিক ও শিল্পাঞ্চলের বিকাশ একমাত্র এই ফসলের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে স্বাধীনতার পর জাতীয়করণ, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, প্রযুক্তিগত স্থবিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সিন্থেটিক ফাইবারের আগ্রাসনের কারণে পাটশিল্প দ্রুত সংকটে পড়ে।

বিশেষ করে ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে পলিপ্রপিলিন ও প্লাস্টিকের দাপটে আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের চাহিদা নাটকীয়ভাবে কমে যায়। সরকারি পাটকলগুলো লোকসানে পড়ে বন্ধ হতে থাকে, হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ে এবং কৃষক পর্যায়ে পাট চাষে অনীহা দেখা দেয়। গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় পাটশিল্প ক্রমেই প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাতে থাকে।

একসময় যা ছিল ‘সোনালি আঁশ’, তা যেন অর্থনীতির মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

তবে বৈশ্বিক বাস্তবতা এখন বদলাচ্ছে। প্লাস্টিক দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব কাঁচামালের চাহিদা বাড়ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ উন্নত বিশ্ব প্লাস্টিকের বিকল্প খুঁজছে। এই প্রেক্ষাপটে পাট আবারও সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক আঁশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ফরিদপুরের পাটের জিআই স্বীকৃতি এই পরিবর্তিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত সুযোগ। জিআই স্বীকৃতির অন্যতম বড় সুবিধা হলো ব্র্যান্ডিং ও বাজার সুরক্ষা। এটি ফরিদপুর অঞ্চলের পাটকে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় দেয়, যা আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করে। একই সঙ্গে কৃষক ন্যায্য মূল্য পাবেন এবং মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব কমবে। তবে, এই সুফল স্বয়ক্রিয়ভাবে আসবে না। জিআই স্বীকৃতিকে অর্থনৈতিক সাফল্যে রূপান্তর করতে হলে প্রয়োজন সুপরিকল্পিত নীতি, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সমন্বিত উদ্যোগ।

গবেষণা ও প্রযুক্তির অগ্রগতি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট গত এক দশকে পাট গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন, রোগ প্রতিরোধী ও জলবায়ু সহনশীল পাট উন্নয়ন এবং ২০১০ সালে পাটের জিনোম সিকোয়েন্স আবিষ্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম দেশ হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। এই বৈজ্ঞানিক অর্জন পাট শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। বর্তমানে লো-লিগনিন পাট, পরিবেশবান্ধব রেটিং প্রযুক্তি এবং আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা চলমান, যা পাটের মান ও ব্যবহার বহুমুখী করতে পারে।

পাটপাতার পুষ্টিগুণ ও ঔষধি সম্ভাবনাও নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। আয়রন, ক্যালসিয়াম ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ পাটপাতা খাদ্য ও স্বাস্থ্যপণ্য শিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। গবেষণার এই বিস্তৃত ক্ষেত্রগুলোকে শিল্পায়নের সঙ্গে যুক্ত করলে পাট শুধু কাঁচামাল নয়, বরং বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তরিত হতে পারে।

বর্তমানে বিশ্ববাজারে বহুমুখী পাটজাত পণ্যের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। জুট জিওটেক্সটাইল, বায়োডিগ্রেডেবল প্যাকেজিং, জুট কম্পোজিট, ফার্নিচার বোর্ড, হোম ডেকোর, ফ্যাশনসামগ্রী, এমনকি অটোমোবাইল শিল্পে পাটের ব্যবহার বাড়ছে। বিশেষ করে জিওটেক্সটাইল খাতে পাটের ব্যবহার মাটির ক্ষয়রোধ, নদী তীর সংরক্ষণ এবং সড়ক নির্মাণে পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। দেশীয়ভাবে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ রেলওয়ে ও পানি উন্নয়ন বোর্ডে পাটজাত জিওটেক্সটাইল ব্যবহারের উদ্যোগ ইতিবাচক অগ্রগতি নির্দেশ করে।’

বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাট উৎপাদক এবং পাট ও পাটজাত পণ্যের শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশ। তবুও দেশের মোট রপ্তানি আয়ে পাট খাতের অবদান মাত্র প্রায় ২ শতাংশের কাছাকাছি। এর প্রধান কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ শুল্ক ও অশুল্ক প্রতিবন্ধকতা, কঠোর মান ও সার্টিফিকেশন জটিলতা, প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা এবং উদ্যোক্তাদের জন্য সমন্বিত সহায়তা ব্যবস্থার অভাব। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক মানদ- পালনে ব্যর্থ হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে পারছেন না।

মান নিয়ন্ত্রণের অভাব, জিআই ট্যাগের অপব্যবহার, পাটকলের আধুনিকীকরণের ধীরগতি, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্র্যান্ডিং ও ডিজাইনের সীমাবদ্ধতা এসব সমস্যা সমাধান না হলে জিআই স্বীকৃতির সুফল পুরোপুরি পাওয়া সম্ভব হবে না। বিশেষ করে ফরিদপুরের বাইরে উৎপাদিত নিম্নমানের পাট যেন ‘ফরিদপুরের পাট’ নামে বাজারজাত না হয়, সে বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। নীতিনির্ধারণে সমন্বয়ও অপরিহার্য। কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বেসরকারি খাত ও তরুণ উদ্যোক্তাদের পাটভিত্তিক শিল্পে সম্পৃক্ত করতে প্রণোদনা ও সহায়ক নীতি প্রয়োজন। ডিজাইন, প্যাকেজিং ও আন্তর্জাতিক মানের ব্র্যান্ডিং ছাড়া বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা টেকসই হবে না।

ফরিদপুরের পাটের জিআই স্বীকৃতি শুধু অতীতের গৌরবের স্মারক নয়; এটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের সবুজ অর্থনীতির ভিত্তি। যথাযথ নীতি, বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা, উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ এবং কৃষকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হলে ‘সোনালি আঁশ’ আবারও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে আসতে পারে। সময় এসেছে এই সম্ভাবনাকে কার্যকর বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার, না হলে বৈশ্বিক সবুজ বাজারে আমরা পিছিয়ে পড়ব।

পরিসংখ্যান, গবেষণা ও নীতি উদ্যোগ সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো গেলে ফরিদপুরের পাট বাংলাদেশের সবুজ বিপ্লবের বাহক হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এই দ্বৈত দায়িত্ব আমাদের সামনে রয়েছে ঐতিহ্য রক্ষা ও আধুনিক অর্থনীতির সঙ্গে সমন্বয়। সঠিক নীতি, শিল্প-গবেষণা সংযোগ এবং উদ্যোক্তা বিকাশ নিশ্চিত করতে পারলে পাট খাত আগামী দিনে দেশের অন্যতম প্রধান সবুজ অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।

কৃষিবিদ ড. মো. আল-মামুন

প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত