প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৬ জানুয়ারি, ২০২৬
বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি কঠিন; কিন্তু অনিবার্য প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়- আমাদের জন্য আসলে কোনটি বেশি জরুরি, গণতন্ত্র না গণতন্ত্রে পৌঁছানোর পদ্ধতি? কারণ বাস্তবতা হলো, গণতন্ত্রের নামেই এ দেশে সবচেয়ে বেশি রক্ত ঝরেছে, সবচেয়ে বেশি মানুষ গুম হয়েছে, বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সবচেয়ে বেশি সংকুচিত হয়েছে এবং বিচার বিভাগ সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। অন্যদিকে ইতিহাসের একাধিক পর্বে দেখা গেছে, সামরিক শাসন বা সামরিক- সমর্থিত শাসনব্যবস্থার সময়েই দেশে শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে, বিচার বিভাগের কার্যকারিতা বেড়েছে, সংবাদমাধ্যম তুলনামূলকভাবে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে এবং সাধারণ মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই- যতই তা রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হোক না কেন।
গণতন্ত্রের সংকট- নাম আছে, চর্চা নেই: গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়, গণতন্ত্র মানে জবাবদিহি, আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিরোধীমতের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর স্বাধীনতা। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বারবার দেখা গেছে, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক সরকারগুলো গণতন্ত্রকে নিজের দলীয় সম্পত্তিতে পরিণত করেছে। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দলীয়করণ, বিচার বিভাগের ওপর অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ এবং সংবাদমাধ্যমকে ভয় দেখিয়ে বা প্রলোভনে বশে আনার সংস্কৃতি- সব মিলিয়ে গণতন্ত্র এখানে অনেক সময় জনগণের অধিকার নয়, বরং শাসকদের ঢাল হয়ে উঠেছে। ফলে প্রশ্ন ওঠে, যে গণতন্ত্র জনগণকে নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেই গণতন্ত্র কিসের গণতন্ত্র?
সামরিক শাসন- বিতর্কিত কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা : সামরিক শাসন আদর্শ কোনো শাসনব্যবস্থা নয়- এ কথা বলার প্রয়োজন নেই। কিন্তু বাংলাদেশে সামরিক শাসনের অভিজ্ঞতাও একমাত্রিক নয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সামরিক শাসনের কিছু পর্বে- আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে, বিচার বিভাগ তুলনামূলক স্বাধীনভাবে কাজ করেছে, গণমাধ্যম অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিশোধের ভয় ছাড়াই কথা বলতে পেরেছে। এগুলো সামরিক শাসনের গুণ হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক ব্যর্থতার প্রতিফলন হিসেবেই বেশি স্পষ্ট। যখন নির্বাচিত সরকারগুলো রাষ্ট্র পরিচালনায় চরম ব্যর্থতা দেখায়, তখন রাষ্ট্র নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য বিকল্প শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে- এটাই ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা।
প্রশ্নটি আসলে গণতন্ত্র বনাম স্বৈরতন্ত্র নয় : এই বিতর্ককে যদি সরলভাবে ‘গণতন্ত্র বনাম সামরিক শাসন’ হিসেবে দেখা হয়, তবে আলোচনা ভ্রান্ত পথে যাবে। প্রকৃত প্রশ্ন হলো- গণতন্ত্রের পথে উত্তরণের জন্য কোন পদ্ধতি সবচেয়ে কার্যকর ও নিরাপদ?
যদি গণতন্ত্রের নামে জনগণের জীবন, স্বাধীনতা ও মর্যাদা হুমকির মুখে পড়ে, যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়ে যায়, যদি বিচার না পাওয়া একটি স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হয়- তবে সেই তথাকথিত গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখার নৈতিকতা কোথায়? রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। গণতন্ত্র সেই নিরাপত্তার মাধ্যমণ্ড কিন্তু যদি মাধ্যমই লক্ষ্যকে ধ্বংস করে দেয়, তবে পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা করা অযৌক্তিক নয়।
সাংবিধানিক সামরিক হস্তক্ষেপ- একটি বিতর্কিত কিন্তু প্রয়োজনীয় ধারণা: এখানেই আসে সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়টি- সামরিক শাসন কি কখনও অনিবার্য হতে পারে? উত্তর হতে পারে, হ্যাঁ, তবে কিছু কঠোর শর্তে। সামরিক হস্তক্ষেপ কখনোই ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা ক্ষমতালোভী হওয়া উচিত নয়। বরং তা হতে হবে- স্পষ্টভাবে সময়সীমাবদ্ধ, সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত, গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের রোডম্যাপসহ, বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। অর্থাৎ সামরিক শাসন হবে লক্ষ্য নয়, বরং গণতন্ত্রে ফেরার একটি অন্তর্বর্তী পদ্ধতি। ইতিহাসে বিশ্বের বহু দেশে- তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, এমনকি ইউরোপের কিছু রাষ্ট্রেও- রাষ্ট্র সংকটে সামরিক বা অরাজনৈতিক তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক কাঠামো পুনর্গঠনের নজির আছে।
জনগণের ইচ্ছাই শেষ কথা : যেকোনো শাসনব্যবস্থার বৈধতার মূল উৎস জনগণ। যদি জনগণ দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তাহীনতা, অবিচার ও দমন-পীড়নের শিকার হয়, তবে তারা কেবল নির্বাচন নয়- একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা চায়। জনগণের সেই আকাঙ্ক্ষাকে অবজ্ঞা করে শুধু ‘গণতন্ত্র’ শব্দটি উচ্চারণ করা রাজনৈতিক ভণ্ডামির শামিল। গণতন্ত্র কোনো পবিত্র মন্ত্র নয় যে, তা উচ্চারণ করলেই সব পাপ ধুয়ে যাবে। গণতন্ত্র একটি চর্চা, একটি দায়িত্ব, একটি নৈতিক অঙ্গীকার। সেই চর্চা ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রকে নতুন করে পথ খুঁজতে হয়- তা যত কঠিনই হোক।
নিশ্চয়ই স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণতন্ত্রই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গণতন্ত্রে পৌঁছানোর পথ যদি বারবার রক্ত, গুম ও দমন-পীড়নে ভরে যায়, তবে সেই পথ সংশোধন করা অপরাধ নয়, বরং দায়িত্ব। সামরিক শাসন কখনোই কাঙ্ক্ষিত নয়; কিন্তু কোনো কোনো ঐতিহাসিক বাস্তবতায় তা অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে- শর্ত একটাই, তা যেন হয় গণতন্ত্র হত্যার হাতিয়ার নয়, বরং গণতন্ত্র উদ্ধারের সেতু। রাষ্ট্র টিকে থাকে শক্তির ভারসাম্যে, কিন্তু রাষ্ট্র এগিয়ে যায় ন্যায়ের পথে। আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত- আমরা শুধু শাসনের নাম চাই, নাকি প্রকৃত অর্থে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র?
এম মহাসিন মিয়া
সাংবাদিক ও লেখক, পার্বত্য চট্টগ্রাম