প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৬ জানুয়ারি, ২০২৬
মানুষের জীবনের আড়ালে কত অশ্রু, কত নীরব আর্তনাদ চাপা পড়ে থাকে- তার হিসাব সমাজ বড় কমই রাখে। নির্যাতন ও সহিংসতার আলোচনায় আমরা যখন দৃষ্টির আলো ফেলি, তখন সাধারণত একদিকই আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু সমাজের এই একমুখী আলোয় অন্ধকারে পড়ে থাকে এক গভীর সত্য- এই পৃথিবীতে কেবল নারীই নয়, পুরুষও নির্যাতিত হয়। তাদের যন্ত্রণা আরও নীরব, আরও অনুচ্চারিত, যেন জীবনের এক অগোচর প্রান্তে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে পুরুষকে শৈশব থেকেই এক ধরনের ‘ভূমিকায়’ গড়ে তোলা হয়- সে শক্ত হবে, সহ্য করবে, চোখের পানি গোপন করবে, ব্যথাকে বুকে চেপে রাখবে। সমাজ যেন দেয়াল তুলে দেয় তাদের দুর্বলতার সামনে। ‘পুরুষ মানুষ কাঁদে না,’ ‘সমস্যা সামলানো তার দায়িত্ব’- এই কথাগুলো শুধু বাক্য নয়, মানসিক শিকল। ফলে যখন কোনো পুরুষ অপমান, প্রতারণা, মানসিক নিপীড়ন বা আর্থিক শোষণের শিকার হয়- তখন সে কথা বলতেই পারে না। কারণ কথা বললেই তাকে ‘দুর্বল’, ‘অযোগ্য’, কিংবা ‘পুরুষসুলভ নয়’- এই কটুকথা শুনতে হয়।
পরিবারে পুরুষকে দেওয়া হয় শক্তির প্রতীক, উপার্জনকারী, রক্ষকের আসন। কিন্তু এই সম্মানসূচক পরিচয়ের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে চরম চাপ ও অদৃশ্য বোঝা। স্বামী, বাবা, ভাই কিংবা পুত্র- প্রত্যেক ভূমিকায় তাদের সামনে থাকে একটাই দাবি: শক্ত থাকো। অথচ বাস্তবতায় দেখা যায়, সম্পর্কের সংঘাত, অপমান, মানসিক নির্যাতন, প্রতারণা, এমনকি শারীরিক আঘাতের শিকারও হয় পুরুষ। কিন্তু সমাজের চোখে এই আঘাতগুলো গোনা হয় না; বরং মুছে দেওয়া হয়।
আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতাও এই নীরবতাকে আরও গভীর করে। নারীর সুরক্ষার জন্য বিস্তৃত আইন, সংগঠন ও সচেতনতা থাকলেও পুরুষ নির্যাতনের ক্ষেত্রে সেই সমতানির্ভর কাঠামো নেই। ফলে পুরুষ ভুক্তভোগীরা সাহায্য চাইতে গেলেও অনেক সময় গুরুত্ব পান না। এতে প্রশ্ন উঠে- সমতা যদি হয় সমাজের লক্ষ্য, তবে একজন ভুক্তভোগী পুরুষ কেন সেই সমতার বাইরে?
ডিজিটাল যুগে নির্যাতনের রূপ আরও বহুমাত্রিক হয়েছে। ট্রলিং, ব্ল্যাকমেইল, স্ক্রিনশটের হুমকি, মানসিক অপমান- এসবের শিকার পুরুষ হলে সমাজ তা প্রায়ই হাসির বিষয় বানিয়ে ফেলে। তাদের যন্ত্রণা আরও নিঃসঙ্গ, আরও অস্বীকৃত হয়ে ওঠে।
তাই আজ প্রশ্ন বড় জরুরি- শুধু নারী নয়, পুরুষও নির্যাতিত হয়; কিন্তু সমাজ কেন তা দেখতে পায় না? কারণ আমাদের সামাজিক দৃষ্টি এখনও পুরুষের ব্যথাকে গুরুত্ব দেওয়ার মতো সংবেদনশীল হয়নি। নীরবতার এই দেয়াল ভেঙে সত্যটিকে স্বীকার করার সময় এখনই। পুরুষ নির্যাতনের বিষয়টি সমাজে অদৃশ্য থেকে যাওয়ার পেছনে রয়েছে বহুমাত্রিক সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক কারণ। আমাদের সমাজের গভীরে রোপিত লিঙ্গভিত্তিক ধারণাগুলো পুরুষকে এমন একটি প্রতীকী অবস্থানে বসিয়েছে, যেখানে তার কষ্ট প্রকাশ করার সুযোগ নেই। ছোটবেলা থেকে তাকে শেখানো হয়- ‘পুরুষ দুর্বল হয় না’, ‘পুরুষ কাঁদে না’, ‘পুরুষ সব সহ্য করে’- এই সংস্কৃতিই তাকে নিজের যন্ত্রণা লুকিয়ে রাখতে বাধ্য করে। ফলে নির্যাতন হলেও তিনি তা স্বীকার করতে পারেন না; কারণ সমাজ তাকে দুর্বল বলে চিহ্নিত করবে, পুরুষত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলবে।
নির্যাতনের সংজ্ঞা আমাদের সামাজিক চেতনায় খুব সংকীর্ণ। আমরা নির্যাতন মানেই শারীরিক আঘাত বুঝি। অথচ পুরুষরা সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হয় মানসিক ও আবেগগত নির্যাতনের- অপমান, দোষারোপ, আর্থিক শোষণ, চরিত্রহনন, সম্পর্কের ব্ল্যাকমেইল, সামাজিকভাবে লজ্জিত করা- এসবের গভীর ক্ষত চোখে দেখা যায় না, কিন্তু তা বিধ্বংসী। তবু মানুষ মনে করে, যেহেতু তিনি পুরুষ, তাই এসব তার ওপর “প্রযোজ্য নয়”- এমন বিকৃত ধারণা নির্যাতনকে আরও বিস্তৃত করে।
আইনি কাঠামো ও সহায়তার অভাব পুরুষদের নীরবতাকে স্থায়ী করে তোলে। নারীর সুরক্ষায় একাধিক আইন, সেল্টার হোম, হেল্পলাইন, এনজিও ও সামাজিক সচেতনতার প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। কিন্তু পুরুষ ভুক্তভোগীদের জন্য প্রায় কোনো নিরাপদ কাঠামো নেই। একজন পুরুষ থানায় গিয়ে অভিযোগ করতে চাইলে অনেক সময় উপহাসের মুখে পড়েন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যেও লিঙ্গভিত্তিক ধারণা কাজ করে- ‘পুরুষ আবার নির্যাতনের শিকার হয় নাকি?’ এই প্রশ্নই তার ন্যায়বিচারের পথ বন্ধ করে দেয়।
সামাজিক লজ্জার ভয় পুরুষকে আরও একাকী করে তোলে। পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী- কেউই তার যন্ত্রণা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে না। বরং তাকে নিয়ে ঠাট্টা, ব্যঙ্গ, ‘মজার ঘটনা’ বানিয়ে ফেলা- এসবই তাকে চুপ থাকার পথে ঠেলে দেয়। পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি সমাজের অবহেলা এতটাই প্রবল যে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, আত্মদ্বন্দ্ব- এসবও তাকে একাকী করে ফেলতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে নীরবতা এতই গভীর হয় যে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, পরিবার বিচ্ছেদ, আর্থিক পতন, এমনকি আত্মহত্যার মতো সিদ্ধান্তে পর্যন্ত পৌঁছে যায় কেউ কেউ।
জনপ্রিয় সংস্কৃতি- ড্রামা, সিনেমা, কৌতুক, সোশ্যাল মিডিয়া- পুরুষ ভুক্তভোগীকে প্রায়ই হাস্যরসের চরিত্রে রূপ দেয়। স্ত্রী বা প্রেমিকার হাতে পুরুষ বিপদে পড়লে তা হাসির খোরাকে পরিণত হয়। এই বিনোদনমূলক বিকৃতি সমাজে ভুল বার্তা পাঠায়- পুরুষের ওপর নির্যাতন যেন গুরুত্ব পাওয়ার মতো কোনো বিষয়ই নয়। পুরুষ নির্যাতন অদৃশ্য থেকে যায় কারণ সমাজ চোখ খোলে শুধু একদিকে, আর অন্যদিকের বাস্তবতাকে প্রথার মোটা পর্দায় ঢেকে রাখে। এই পর্দা সরানোই আজ সবচেয়ে জরুরি।
পুরুষ নির্যাতনের বিষয়টি সমাজে অস্বীকৃত থাকায় তা যে শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি সৃষ্টি করে- তা নয়; বরং এটি তৈরি করছে বহুস্তরীয় সামাজিক সমস্যা, যা ক্রমে আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। নীরব ভুক্তভোগী সমাজে এক ধরনের অদৃশ্য মানসিক সংকটের জন্ম দিচ্ছে। যখন কেউ নিজের ওপর হওয়া নির্যাতনের কথা বলতে পারে না, তখন তার ভেতরে জমতে থাকে হতাশা, অপরাধবোধ, আত্মদ্বন্দ্ব ও মানসিক চাপ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগুলো রূপ নেয় বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, আত্মহীনতা এমনকি আত্মহননের প্রবণতায়। অনেক পুরুষ মানসিক যন্ত্রণার ভারে ভেঙে পড়লেও সাহায্য চাওয়ার পথ খুঁজে পান না- এটি এক গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা।
পারিবারিক সম্পর্কেও এর ছাপ গভীরভাবে পড়ে। নির্যাতিত পুরুষ নিজের কষ্ট চেপে রেখে ধীরে ধীরে মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন, যা পরিবারে অশান্তি, দূরত্ব ও ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করে। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, সন্তানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব, অকারণ রাগ বা হঠাৎ আবেগপ্রবণতা- এ সবই একটি অস্বাস্থ্যকর পারিবারিক পরিবেশ তৈরি করে। পরিবার সমাজের প্রথম ভিত্তি- সেখানে অস্থিরতা মানেই বৃহত্তর সমাজের ভেঙে পড়া। পুরুষ নির্যাতনকে অস্বীকার করা সমাজে এক ধরনের অসম ন্যায়বোধ গড়ে তোলে। যখন শুধু একপক্ষকে সুরক্ষা দেওয়া হয় আর অন্যপক্ষকে উপেক্ষা করা হয়, তখন ন্যায়ের ধারণাই বিকৃত হয়ে পড়ে। এতে আইন ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। পুরুষের প্রতি অবহেলা শুধু তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না; বরং এটি সমতা প্রতিষ্ঠার পথেও বড় বাধা তৈরি করে। নীরব নির্যাতনের চাপে পুরুষরা প্রায়ই আত্মরক্ষার ভুল পথে হাঁটেন- সহিংসতা, আসক্তি, অতিরিক্ত রাগ, বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। এর ফলে আরও নতুন সামাজিক সমস্যা তৈরি হয়, যা পরে আবার পরিবার ও সমাজকেই বিপর্যস্ত করে।
পুরুষ নির্যাতনকে স্বীকৃতি না দেওয়া সমাজে চাপা ক্ষতের মতো থেকে যায়- বাইরে থেকে দেখা যায় না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সমাজের সুস্থতা, ন্যায়বোধ ও সম্পর্কের স্থিতি ধ্বংস করে দেয়।
সানিয়া তাসনিম লামিয়া
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ