ঢাকা বুধবার, ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ২৩ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

তীব্র গ্যাস সংকট ও বিপর্যস্ত জনজীবন

তীব্র গ্যাস সংকট ও বিপর্যস্ত জনজীবন

বর্তমান বাংলাদেশে গ্যাস সংকট শুধু একটি যান্ত্রিক বা কারিগরি সমস্যা হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন জাতীয় বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে শিল্পাঞ্চল গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রাম- সর্বত্রই ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। গৃহিণীর রান্নাঘর থেকে শুরু করে বৃহৎ শিল্পকারখানার উৎপাদন চাকা- সবই আজ গ্যাসের অভাবে স্থবির। এই ভয়াবহ সংকট আমাদের জাতীয় অর্থনীতি এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর যে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তা উপেক্ষা করার কোনো অবকাশ নেই।

গ্যাস সংকটের প্রভাব বহুমুখী। একে একে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ ও দেশের শিল্প খাত। শহরের হাজার হাজার পরিবারে এখন মধ্যরাত বা ভোর ছাড়া গ্যাসের দেখা মেলে না। দিনের বেলা চুলা জ্বলে না বললেই চলে। ফলস্বরূপ, মানুষকে বিকল্প হিসেবে এলপিজি (LPG) বা ইলেকট্রিক চুলার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্তের বাজেটে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো রান্না করতে না পেরে সাধারণ মানুষকে হোটেল বা ফুটপাথের অস্বাস্থ্যকর খাবারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো পোশাক শিল্প (RMG)। গ্যাস সংকটের কারণে টেক্সটাইল ও ডাইং মিলগুলোতে উৎপাদন সক্ষমতা ৫০-৬০ শতাংশে নেমে এসেছে। ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো বন্ধ থাকায় কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে সময়মতো রপ্তানি অর্ডার সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে আমরা প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাব।

গ্যাসের অভাবে সার কারখানাগুলো বন্ধ থাকলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হবে, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। অন্যদিকে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ গ্যাসনির্ভর হওয়ায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পনার অভাবই আজকের এই সংকটের প্রধান কারণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে চরম অনীহা এবং আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) নির্ভরতাই আমাদের এই বিপদে ফেলেছে।

গত এক দশকে নতুন গ্যাস কূপ খনন ও অনুসন্ধানে যে পরিমাণ বিনিয়োগ করার কথা ছিল, তা করা হয়নি। দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্রসীমায় বিশাল গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমরা বিদেশি আমদানির দিকে বেশি ঝুঁকেছি। বিশ্ববাজারে এলএনজির দামের অস্থিরতা এবং ডলার সংকটের কারণে সরকার পর্যাপ্ত গ্যাস আমদানি করতে পারছে না। ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহের ঘাটতি দিন দিন বাড়ছে। তিতাসসহ বিভিন্ন গ্যাস বিতরণ কোম্পানির অধীনে থাকা হাজার হাজার কিলোমিটার অবৈধ সংযোগ এবং সিস্টেম লসের নামে বিশাল অপচয় এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। দুর্নীতির কারণে বৈধ গ্রাহকরা গ্যাস পাচ্ছেন না, অথচ প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় অবৈধ সংযোগ সগৌরবে চলছে।

এই সংকট থেকে উত্তরণ রাতারাতি সম্ভব নয়, তবে সঠিক এবং টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করলে দীর্ঘমেয়াদী মুক্তি সম্ভব। বাপেক্সকে শক্তিশালী করে স্থলভাগে দ্রুত নতুন কূপ খনন করতে হবে। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে ব্লু-ইকোনমি বা সমুদ্রসীমার গ্যাস উত্তোলনে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে দ্রুত কাজ শুরু করতে হবে।

গ্যাস খাতের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। প্রতিটি এলাকায় চিরুনি অভিযান চালিয়ে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে। আমদানিকৃত এলএনজি খালাসের জন্য বিদ্যমান টার্মিনালগুলোর সংস্কার এবং নতুন টার্মিনাল স্থাপন দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। শুধু গ্যাসের ওপর নির্ভর না করে সৌরশক্তি ও বায়ুবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে।

জ্বালানি নিরাপত্তা একটি দেশের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে জড়িত। বর্তমান গ্যাস সংকট নিরসনে শুধু ‘জোড়াতালি’ দেওয়া সিদ্ধান্তে কাজ হবে না। সরকারকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করতে হবে। শিল্পকারখানা সচল রাখা এবং জনগণের জীবনযাত্রায় স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, আমাদের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। আমরা আশা করি, সরকার এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথাযথ সাহসিকতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে পদক্ষেপ নেবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত