ঢাকা সোমবার, ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ২৮ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

নিপা ভাইরাস জনস্বাস্থ্যের এক নতুন আতঙ্কের নাম

নিপা ভাইরাস জনস্বাস্থ্যের এক নতুন আতঙ্কের নাম

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার জনস্বাস্থ্যের সামনে অন্যতম বড় আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে নিপা ভাইরাস (NiV)। এটি একটি প্রাণঘাতী ‘জুনোটিক’ ভাইরাস, যা মূলত পশু থেকে মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এই ভাইরাসটিকে এমন একটি প্যাথোজেন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে, যার মহামারি ঘটানোর সক্ষমতা রয়েছে এবং যার বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনো কার্যকর ভ্যাকসিন বা সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শীতকালীন সময়ে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব একটি নিয়মিত এবং অত্যন্ত উদ্বেগজনক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। নিপা ভাইরাসের ভয়াবহতা মূলত এর উচ্চ মৃত্যুহারের মধ্যে নিহিত। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যুর হার ৪০ শতাংশ থেকে শুরু করে ক্ষেত্রবিশেষে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ, আক্রান্ত ১০ জনের মধ্যে অন্তত ৭ জনেরই মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকে, যা করোনা বা অন্যান্য পরিচিত ভাইরাসের তুলনায় বহুগুণ বেশি ভয়ঙ্কর।

এই ভাইরাসের আক্রমণ পদ্ধতি অত্যন্ত দ্রুত এবং ধ্বংসাত্মক।

সংক্রমণের পর প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণ জ্বরের মতো উপসর্গ দেখা দিলেও খুব দ্রুত তা তীব্র শ্বাসকষ্ট এবং ‘এনসেফালাইটিস’ বা মস্তিষ্কের প্রদাহে রূপ নেয়। রোগী প্রলাপ বকতে শুরু করে, খিঁচুনি হয় এবং শেষ পর্যন্ত কোমায় চলে যায়। যারা সৌভাগ্যবশত বেঁচে যান, তাদের অনেকের মধ্যেই দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক সমস্যা বা ব্যক্তিত্বের পরিবর্তনের মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে যায়।

বাংলাদেশে নিপা ভাইরাস সংক্রমণের প্রধান মাধ্যম হলো বাদুড়ের লালা বা মলমূত্র মিশ্রিত খেজুরের কাঁচা রস। শীতকালে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য হিসেবে খেজুরের রস অত্যন্ত জনপ্রিয়। কিন্তু গাছিরা যখন গাছ থেকে রস সংগ্রহের জন্য হাঁড়ি পাতেন, তখন ‘টেরোপাস’ প্রজাতির ফলখেকো বাদুড় সেই হাঁড়িতে মুখ দেয় বা সেখানে মলত্যাগ করে। এই দূষিত রস না ফুটিয়ে সরাসরি পান করলেই মানুষ নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। এছাড়া বাদুড়ের খাওয়া আধা-খাওয়া ফল থেকেও এই সংক্রমণ ছড়াতে পারে।

উদ্বেগের বিষয় হলো, নিপা ভাইরাস এখন আর শুধু পশু থেকে মানুষে সীমাবদ্ধ নেই। এটি আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে থাকা সুস্থ মানুষের শরীরেও ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে আক্রান্ত রোগীর সেবা করা পরিবারের সদস্য বা স্বাস্থ্যকর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

নিপা ভাইরাসকে কেন ‘বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, তার কিছু যৌক্তিক কারণ রয়েছে-

এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য কোনো অনুমোদিত টিকা বা অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। কেবলমাত্র রোগীকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। ২. দ্রুত রূপান্তর : ভাইরাসের প্রকৃতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হয়। যদি এটি কোনোভাবে বায়ুবাহিত হওয়ার সক্ষমতা অর্জন করে, তবে তা মানবসভ্যতার জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। ৩. শনাক্তকরণে জটিলতা : প্রাথমিক লক্ষণগুলো সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো হওয়ায় অনেক সময় রোগ শনাক্ত করতে দেরি হয়ে যায়, যা সংক্রমণের বিস্তার ঘটাতে সাহায্য করে।

প্রতিকার ও প্রতিরোধে করণীয়

নিপা ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক নেই, তাই ‘প্রতিরোধই একমাত্র সমাধান’। এই ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিছু কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। জনসচেতনতাই নিপা প্রতিরোধের প্রধান অস্ত্র।

খেজুরের কাঁচা রস পান করা থেকে পুরোপুরি বিরত থাকতে হবে। ‘রস ফুটিয়ে পান করলে ঝুঁকি কম’- এমন প্রচারণা থাকলেও সবচেয়ে নিরাপদ হলো কাঁচা রস এড়িয়ে চলা। গাছ থেকে পড়া বা বাদুড়ে খাওয়া আধা-খাওয়া ফল কোনোভাবেই খাওয়া যাবে না। বাজার থেকে কেনা ফল ভালো করে ধুয়ে ও খোসা ছাড়িয়ে খেতে হবে। যদি কেউ আক্রান্ত হন, তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। রোগীর ব্যবহৃত পোশাক ও সামগ্রী আলাদা রাখতে হবে এবং পরিচর্যার সময় মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারি পর্যায়ে নজরদারি (Surveillance) বাড়াতে হবে। বিশেষ করে যে জেলাগুলোতে নিপা ভাইরাসের প্রকোপ বেশি, সেখানে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণের ব্যবস্থা এবং আইসোলেশন ওয়ার্ডের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন।

নিপা ভাইরাস কেবল একটি রোগ নয়, এটি আমাদের অসচেতনতার এক চরম মূল্য। শীতের সকালে এক গ্লাস খেজুরের কাঁচা রস পানের আনন্দ কোনোভাবেই জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না। ঐতিহ্যের চেয়ে প্রাণের সুরক্ষা আগে।

সরকারের পাশাপাশি গণমাধ্যম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে সম্মিলিতভাবে প্রচার চালাতে হবে যাতে মানুষের মধ্যে আচরণগত পরিবর্তন আসে। বিজ্ঞান ও সচেতনতার মেলবন্ধনেই আমরা পারি এই মরণঘাতী ভাইরাসের হাত থেকে আমাদের প্রিয়জনদের রক্ষা করতে। মনে রাখতে হবে, নিপা ভাইরাসের কোনো দ্বিতীয় সুযোগ নেই। তাই সতর্ক থাকাই জীবন রক্ষার একমাত্র পথ।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত