প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬
জানুয়ারির তীব্র শীতে বাংলার জনপদে এক ভিন্নতর উষ্ণতা। ভোরের ঘন কুয়াশার চাদর ভেদ করে পাড়ার টং দোকান থেকে শুরু করে শহুরে গলিপথে কেতলি থেকে ওঠা ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে গরম গরম নির্বাচনি আলাপ। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সাধারণ মানুষ আজ যে হিসাব কষছে, তা শুধু হারের নয়, বরং নিজেদের অধিকার ফিরে পাওয়ার হিসেব। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ভোটাধিকার বঞ্চিত একটি জাতির সামনে এখন এক মাহেন্দ্রক্ষণ- ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
যদি সবকিছু ঠিকঠাক থাকে, তবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে- এই ঐতিহাসিক নির্বাচন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতা বদলের পালা নয়, বরং একটি রাষ্ট্র সংস্কারের অগ্নিপরীক্ষা। ভোটাদের ভোট দেওয়ার পাশাপাশি রয়েছে বিশাল দায়বদ্ধতা।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচনের মেরুদণ্ড হলো প্রশাসন। নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার প্রধান কারিগর তারা। যদি প্রশাসন নির্মোহ ও নিরপেক্ষ থাকে, তবেই জাতি একটি অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচন উপহার পায়। প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে যদি সততা থাকে, তবে সাধারণ ভোটাররা নির্ভয়ে কেন্দ্রে গিয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, প্রশাসন যখনই কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর আজ্ঞাবহ হয়ে পড়ে, তখনই নির্বাচন কলঙ্কিত হয়, জনজীবন পর্যুদস্ত হয়। তাই এবার ২০০৮ সালের মতো পাতানো নির্বাচন রুখে দিতে হবে। আধিপত্যবাদের নগ্ন কবল থেকে প্রশাসন কতটা স্বচ্ছ থাকতে পারবে, জনমনে এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
প্রশাসন যখন নিরপেক্ষতা হারায়, তখন নির্বাচনি মাঠ অসমতল হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক দলগুলোর পেশি শক্তি আর কালো টাকার আস্ফালন দমনে প্রশাসনকে হতে হবে বজ্রকঠিন। অতীতের ‘চিরুনি অভিযান’ বা বিশেষ পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার মতো কলঙ্কিত অধ্যায়গুলো থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রশাসনকে বুঝতে হবে, তারা কোনো দলের নয়, তারা রাষ্ট্রের সেবক। বিগত ফ্যাসিষ্ট সরকারের মদদপুষ্ট কর্মকর্তারা এখনও প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অবস্থান করছে- জনমনে এই সন্দেহ প্রবল। এই সন্দেহ দূর করার গুরু দায়িত্ব অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের। বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে পারস্পরিক নজরদারি বা মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে, যাতে কোনো চোরাগোপ্তা পথে নির্বাচনকে প্রভাবিত করা না যায়। নির্বাচন সুষ্ঠু করা শুধু দায়িত্ব নয়, এটি হবে প্রশাসনের জন্য পেশাদারিত্ব প্রমাণের অন্তিম সুযোগ।
ভোটের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন প্রার্থীর উপর হামলা হচ্ছে। পতিত ফ্যাসিস্ট দেশকে বিপথে ঠেলে দিতে নীল নকশা আঁকছে। ঠিক এই জায়গায় প্রশাসনকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। পূর্বের সকল ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে দেশের স্বার্থে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
নির্বাচনকে ঘিরে এরইমধ্যে অশুভ শক্তির ছায়াপাত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পতিত স্বৈরাচারের দোসররা দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। জুলাই বিপ্লবের অগ্রসৈনিক শরীফ ওসমান হাদি কিংবা স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মুসাব্বিরের মতো তরুণদের রক্ত যখন রাজপথে ঝরে, তখন তা নির্বাচনের জন্য এক ভয়াবহ অশনি সংকেত দেয়। এই ‘টার্গেট কিলিং’ এবং অগ্নিসন্ত্রাসের উদ্দেশ্য হলো জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা, যাতে মানুষ ভোটকেন্দ্রে আসার সাহস না পায়।
এর পাশাপাশি যোগ হয়েছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ‘ডিসইনফরমেশন’ বা পরিকল্পিত অপতথ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। সরকার ও প্রশাসনকে এই সাইবার যুদ্ধের বিরুদ্ধেও সমানতালে লড়াই করতে হবে। সত্য তথ্য দ্রুত জনগণের সামনে তুলে ধরার মাধ্যমেই শুধু এই গুজব প্রতিরোধ করা সম্ভব। এজন্য সরকারকে সংশ্লিষ্ট মহলকে সজাগ থাকতে হবে।
গণমাধ্যম হলো রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। একটি সচল ও শক্তিশালী গণমাধ্যমই পারে জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে। সাধারণ মানুষ তথ্যের জন্য গণমাধ্যমের ওপর নির্ভর করে এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতেই তাদের জনমত গড়ে ওঠে। কিন্তু বিগত নির্বাচনগুলোতে গণমাধ্যমের ভূমিকা আমাদের আশাহত করেছে। দিনের আলোয় ভোট ডাকাতি হলেও অনেক গণমাধ্যম তখন দেখেও না দেখার ভান করেছে, কিংবা ব্যস্ত ছিল ক্ষমতার তোষামোদিতে।
আগামী নির্বাচনে গণমাধ্যমকে হতে হবে গণমানুষের কণ্ঠস্বর। সকল ভয়ভীতি ও অদৃশ্য ‘কুমিরদের’ চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে সত্যকে তুলে ধরতে হবে। যদি কোথাও কোনো অনিয়ম হয়, তবে তা সাথে সঙ্গে জাতির সামনে তুলে ধরা গণমাধ্যমের নৈতিক দায়িত্ব। গণমাধ্যম যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, তবে জালিয়াত চক্র পিছু হটতে বাধ্য হবে। জাতির স্বার্থে এবং সত্যের স্বার্থে গণমাধ্যমকে হতে হবে আপসহীন।
একটি নির্বাচনের প্রাণ হলো জনগণ। গত তিনটি নির্বাচনে ভোট দিতে না পারার যে আক্ষেপ ও হাহাকার জনগণের মনে জমে আছে, এবার তারা তা সুদে-আসলে মিটিয়ে নিতে চায়। সাধারণ মানুষ এখন আর গালভরা প্রতিশ্রুতিতে ভুলতে রাজি নয়; তারা চায় বৈষম্যহীন এক নতুন বাংলাদেশ।
বিশেষ করে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তরুণ ভোটাররা। যারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিজেদের বুক পেতে দিয়েছিল গুলির সামনে, যারা রাজপথের লড়াকু সৈনিক, তারাই হবে এবারের নির্বাচনের ভাগ্যনিয়ন্তা। এই তরুণ প্রজন্মের চোখে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। তারা এমন প্রার্থীকে বেছে নিতে চায়, যাদের মধ্যে দেশপ্রেম আর সততা আছে, যারা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থে নয় বরং জাতির কল্যাণে কাজ করবে।
জনগণকে শুধু ভোট দিয়েই দায় সারলে চলবে না, তাদের হতে হবে সচেতন পাহারাদার। ভোটকেন্দ্রে দ্রুত উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং কোনো অনিয়ম দেখলে সম্মিলিতভাবে তা প্রতিহত করা এখন সময়ের দাবি। জুলাইয়ের সেই দেশপ্রেমিক উন্মাদনা নিয়ে যদি ছাত্র-জনতা ঐক্যবদ্ধ থাকে, তবেই আমরা একটি সুষ্ঠু নির্বাচন এবং সুন্দর একটি দেশ উপহার পাব।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়, এটি ১৬ কোটি মানুষের সম্মান ও অধিকার পুনরুদ্ধারের লড়াই। প্রশাসন যদি তাদের মেরুদণ্ড শক্ত রাখে, গণমাধ্যম যদি সত্যের ঝাণ্ডা বয়ে চলে এবং জনগণ যদি সচেতন প্রহরী হয়ে কেন্দ্রে অবস্থান নেয়- তবেই আমরা সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ পাব। ফ্যাসিবাদের চিহ্ন মুছে ফেলে একটি সুন্দর ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রগঠনের পথে এই নির্বাচন হোক আমাদের প্রথম বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। কুয়াশা কেটে গিয়ে যেমন সূর্য ওঠে, তেমনি আমাদের নির্বাচনি মাঠের সকল ধোঁয়াশা কেটে গিয়ে উদিত হোক গণতন্ত্রের এক নতুন সূর্য। সবশেষ রাজনৈতিক দলগুলোকে হতে হবে উদার। সকলে সকলের প্রতি সম্মান বজায় রাখতে পারলে কোনো সহিংসতা হবে না। জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ধরে রেখে এগোতে হবে। বাস্তবায়ন করতে হবে তারুণ্যের কাঙ্ক্ষিত সোনার বাংলাদেশ।
আব্দুল কাদের জীবন
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়