ঢাকা মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ২৯ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

গ্যাস ভোগান্তিতে নাগরিক জীবন

লুৎফুন্নাহার
গ্যাস ভোগান্তিতে নাগরিক জীবন

বর্তমান নগরসভ্যতার সঙ্গে গ্যাস যেন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। রান্না থেকে শুরু করে কলকারখানা, হোটেল-রেস্তোরাঁ, এমনকি ছোট দোকান পর্যন্ত- সবখানেই গ্যাসের ব্যবহার অপরিহার্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের নাগরিক জীবনে গ্যাস আজ আর নিশ্চিত কোনো সুবিধা নয়, বরং এক অনিশ্চয়তার নাম। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ গ্যাস ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। এই ভোগান্তি শুধু রান্নাঘরে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর প্রভাব পড়ছে মানুষের সময়, অর্থ, মানসিক স্বাস্থ্যে এবং সামগ্রিক নাগরিক জীবনে।

নগর জীবনে গ্যাস হলো সবচেয়ে সহজ ও সাশ্রয়ী জ্বালানি। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য গ্যাসের বিকল্প প্রায় নেই বললেই চলে। সকালবেলা স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, অফিসগামী মানুষ- সবারই সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে হয়। এই ব্যস্ত জীবনে গ্যাস যদি নিয়মিত না থাকে, তাহলে পুরো দিনের ছকটাই এলোমেলো হয়ে যায়। একজন শিক্ষার্থীর দিনের শুরু হয় সকালের নাশতা দিয়ে। গ্যাস না থাকলে সেই নাশতা হয় দেরিতে, কখনও আবার বাদই পড়ে যায়। ফলে ক্লাসে মনোযোগ নষ্ট হয়। একইভাবে কর্মজীবী মানুষ দেরিতে অফিসে পৌঁছায়, যার প্রভাব পড়ে কাজের ওপর। এভাবেই গ্যাসসংকট ধীরে ধীরে নাগরিক জীবনের স্বাভাবিক গতি নষ্ট করে দেয়।

বর্তমানে শহরের বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় গ্যাস থাকে না। কোথাও সকালে নেই, কোথাও আবার রাতে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। বিশেষ করে রাতের বেলা গ্যাস চলে যাওয়াটা নাগরিক জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারাদিন কাজ শেষে মানুষ যখন রান্নার জন্য গ্যাসের চুলা জ্বালাতে যায়, তখনই দেখা যায় গ্যাস নেই। অনেক সময় খুব কম চাপের গ্যাস আসে, যা দিয়ে রান্না করা প্রায় অসম্ভব। চুলায় আগুন জ্বলে ঠিকই, কিন্তু হাঁড়ি বসালে আগুন নিভে যায়। এতে রান্নার সময় দ্বিগুণ বা তিনগুণ বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতি দিনের পর দিন চলতে থাকলে মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষোভ তৈরি হয়। গ্যাস ভোগান্তির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হলো রান্নাঘর। বিশেষ করে গৃহিণীরা এই সংকটের মুখে সবচেয়ে বেশি পড়েন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কখন গ্যাস আসবে, কখন যাবে- এই চিন্তায় তাদের সময় কাটে। অনেক পরিবার রাতে রান্না করতে না পেরে ভাত-ডাল রেখে দেয়, আবার কেউ কেউ বিকল্প হিসেবে বাইরের খাবারের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়।

গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবার ইলেকট্রিক রাইস কুকার বা ইনডাকশন চুলা ব্যবহার করে। কিন্তু সবার পক্ষে এসব কেনা সম্ভব নয়। আবার বিদ্যুতের লোডশেডিং থাকলে সেসবও কোনো কাজে আসে না। ফলে রান্নাঘর হয়ে ওঠে এক অসহায় যুদ্ধক্ষেত্র। গ্যাসসংকট শিক্ষার্থীদের জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলছে। সকালে দেরিতে রান্না হলে অনেক শিক্ষার্থী ঠিকমতো খেতে পারে না। খালি পেটে ক্লাসে বসে পড়াশোনা করা কঠিন। আবার পরীক্ষার সময় রাতে পড়াশোনা করতে গিয়ে দেখা যায়, গ্যাস নেই বলে রাতের খাবার দেরিতে খেতে হচ্ছে। এতে পড়ার মনোযোগ নষ্ট হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় বা মেসে থাকা শিক্ষার্থীদের অবস্থা আরও করুণ। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রান্না শেষ না হলে তাদের না খেয়েই থাকতে হয়। অনেক সময় দেখা যায়, গ্যাস আসার আশায় রাত ১২টা বা ১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয়। কর্মজীবী মানুষদের জন্য সময় সবচেয়ে মূল্যবান। কিন্তু গ্যাস ভোগান্তি তাদের সময়ের হিসাব নষ্ট করে দেয়। সকালে দেরিতে রান্না হলে অফিসে পৌঁছাতে দেরি হয়। আবার রাতে রান্না করতে না পেরে পরদিন অফিসের জন্য খাবার প্রস্তুত করা যায় না। অনেকেই বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে খান, যা স্বাস্থ্য ও অর্থ- দুই দিক থেকেই ক্ষতিকর। এভাবে প্রতিদিনের ছোট ছোট সমস্যাগুলো একসময় বড় মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গ্যাস সংকট নাগরিক জীবনে অর্থনৈতিক চাপও সৃষ্টি করছে। গ্যাস না থাকায় মানুষকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা অনেক বেশি ব্যয়বহুল। এলপি গ্যাস সিলিন্ডার, বৈদ্যুতিক চুলা- এসবের খরচ সাধারণ মানুষের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

এছাড়া রেস্তোরাঁ, হোটেল ও ছোট খাবারের দোকানগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গ্যাস না থাকলে তাদের ব্যবসা বন্ধ রাখতে হয়। ফলে কর্মচারীরা কাজ হারায়, মালিকদের লোকসান গুনতে হয়। এই প্রভাব শেষ পর্যন্ত পুরো নগর অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। গ্যাস ভোগান্তি শুধু শারীরিক কষ্ট নয়, মানসিক চাপও বাড়ায়। প্রতিদিন কখন গ্যাস আসবে- এই অনিশ্চয়তা মানুষকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ বাড়ে। রান্না দেরি হলে ছোট বিষয় নিয়েও বিরক্তি তৈরি হয়। পাশাপাশি সামাজিক জীবনও প্রভাবিত হয়। অতিথি এলে অনেক পরিবার আতঙ্কে থাকে- গ্যাস থাকবে তো? উৎসব বা দাওয়াতের সময় গ্যাস না থাকলে আনন্দ মাটি হয়ে যায়। এভাবে গ্যাস সংকট নাগরিক জীবনের স্বাভাবিক সামাজিক বন্ধনেও প্রভাব ফেলছে।

গ্যাসসংকটের পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে- সরবরাহ ঘাটতি, অব্যবস্থাপনা, অবৈধ সংযোগ ইত্যাদি। কিন্তু সাধারণ নাগরিক এসব কারণ জানার চেয়ে সমাধানটাই বেশি চায়। নাগরিকরা নিয়মিত বিল পরিশোধ করেও যখন গ্যাস পায় না, তখন প্রশ্ন ওঠে- তাহলে এই ভোগান্তির দায় কে নেবে? প্রশাসনের উচিত গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও পরিকল্পিত ও স্বচ্ছ করা। কোথায় কখন গ্যাস থাকবে না, তা আগে থেকে জানানো হলে মানুষ মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে পারে। একই সঙ্গে অবৈধ সংযোগ বন্ধ করে সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করা জরুরি।

গ্যাস ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, আমদানি ব্যবস্থার উন্নয়ন- এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে, যেন গ্যাসের অপচয় না হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও গণমাধ্যমে গ্যাস ব্যবহারে সচেতনতা বাড়ানো যেতে পারে। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব।

গ্যাস ভোগান্তিতে নাগরিক জীবন আজ বিপর্যস্ত। এটি শুধু একটি জ্বালানি সংকট নয়, বরং সময়, অর্থ, মানসিক শান্তি ও সামাজিক জীবনের ওপর এক গভীর আঘাত। প্রতিদিনের ছোট ছোট সমস্যার মধ্য দিয়েই বোঝা যায়, গ্যাস ছাড়া নাগরিক জীবন কতটা অচল হয়ে পড়ে। গ্যাস ভোগান্তি কমলে তবেই নাগরিক জীবন ফিরে পাবে তার স্বাভাবিক ছন্দ।

লুৎফুন্নাহার

দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত