প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬
শীত আসে নীরবে। কারো ঘরে শীত মানে কম্বলের ভেতর আরাম, গরম চায়ের কাপে ধোঁয়া আর জানালার পাশে বসে অলস সময় কাটানো। কিন্তু ফুটপাতের মানুষের কাছে শীত মানে মৃত্যু-সমান এক সতর্ক সংকেত। রাত নামলেই ঠান্ডা বাতাস যেন ছুরি হয়ে শরীরে বিঁধে যায়। খোলা আকাশের নিচে শুয়ে থাকা মানুষগুলোর জন্য শীত কোনো ঋতু নয়, শীত এক নিষ্ঠুর পরীক্ষা যেখানে প্রতিটি রাত পার হওয়াই এক ধরনের বিজয়। স্বচ্ছলতার সাথে জীবনযাপন করা মানুষগুলো শীতের শীতল প্রকৃতিকে উপভোগ করে। তারা কামনা করে শীতের সময়কাল যাতে আরো বাড়ে? তবে যেসব মানুষ রাস্তার ধারে, ঝুড়িতে মানবেতর জীবনযাপন করে তাদের জন্য শীত যেন এক অভিশাপ।
বাংলাদেশের শীত তুলনামূলকভাবে স্বল্প সময়ের হলেও এর প্রভাব ছিন্নমূল মানুষের জীবনে ভয়াবহ। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা শহর, রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, ফুটপাত, লঞ্চঘাট সব জায়গাতেই শীতে ভেসে ওঠে অসহায় মানুষের দীর্ঘশ্বাস। এরা কেউ কাজ হারানো শ্রমিক, কেউ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, কেউবা জীবনের ধাক্কায় পথে নেমে আসা মানুষ। সমাজের মূল স্রোত থেকে ছিটকে পড়া এই মানুষগুলোর জন্য শীতকাল হয়ে ওঠে সবচেয়ে কঠিন সময়। যেখানে তাদের বেঁচে থাকা চ্যালেঞ্জ হয়ে পরে।
শীতের রাতে ফুটপাতে গেলে দেখা যায়, একজন বৃদ্ধ মানুষ খবরের কাগজ গায়ে জড়িয়ে কাঁপছে, পাশেই এক মা তার ছোট শিশুকে বুকের সাথে চেপে ধরে উষ্ণতা দেওয়ার চেষ্টা করছে। অনেকেই পলিথিন, বস্তা কিংবা কার্টন জোগাড় করে শরীর ঢাকার চেষ্টা করে। কোথাও কোথাও কয়েকজন মিলে আগুন জ্বালিয়ে হাত সেঁকে নেয় কিন্তু সেই আগুনেও নিরাপত্তা নেই। শীতের প্রকোপে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, জ্বর, ডায়রিয়া এসব রোগ তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে। চিকিৎসা তো দূরের কথা, অনেক সময় অসুস্থ হওয়ার পরও তারা বুঝে ওঠার আগেই জীবন থেমে যায়।
ছিন্নমূল মানুষের এই মানবেতর জীবনযাপনের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের অভাব। কাজ না থাকলে আয় নেই, আয় না থাকলে বাসস্থান নেই। এ নীতির ফলে তারা বাধ্য হয়ে রাস্তার ধারে বসবাস করে। সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা। শীত এলেই ত্রাণ কার্যক্রম চোখে পড়ে, কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয় এবং সবার কাছে পৌঁছায় না। দেখা যায়, ফুটপাতে বসবাসরত মানুষের কিছু সংখ্যক মানুষ ত্রানের কারণে কিছুটা শীত নিবারণ করতে পারলেও অধিকাংশ শীতে কষ্ট করে। মানসিক ও পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এর আরেকটি কারণ। অনেক ছিন্নমূল মানুষ পরিবারহীন বা পরিবার থেকে বিতাড়িত, ফলে তাদের দেখভালের কেউ নেই। নগর ব্যবস্থাপনার অমানবিকতাও দায়ী। ফুটপাত, স্টেশন বা উন্মুক্ত স্থানে থাকা মানুষগুলোকে প্রায়ই উচ্ছেদ করা হয়, কিন্তু বিকল্প আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয় না। ফলে শীতে তারা আরও অনিরাপদ হয়ে পড়ে।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয়ভাবে স্থায়ী শীত আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা জরুরি, যেখানে ছিন্নমূল মানুষ রাত কাটাতে পারবে নিরাপদে। শীতবস্ত্র বিতরণকে হতে হবে পরিকল্পিত ও নিয়মিত। শুধু কম্বল নয় গরম কাপড়, মোজা, শিশুদের জন্য আলাদা পোশাক নিশ্চিত করতে হবে। ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা সেবা চালু করা দরকার, যাতে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত মানুষগুলো প্রাথমিক চিকিৎসা পায়। ব্যক্তি ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। অপ্রয়োজনীয় কাপড় জমিয়ে না রেখে তা ছিন্নমূল মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই মানুষগুলোকে দয়ার বস্তু নয়, মানুষ হিসেবে দেখা।
শীত আমাদের জন্য সাময়িক কষ্ট, কিন্তু ছিন্নমূল মানুষের জন্য তা বেঁচে থাকার প্রশ্ন। সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষগুলোর প্রতি আমাদের দায়িত্ব শুধু উৎসবের দিনে নয়, প্রতিদিনের মানবিকতায় প্রকাশ পাওয়া উচিত। আমরা যদি একটু সংবেদনশীল হই, একটু এগিয়ে আসি, তাহলে হয়তো কোনো এক রাতে আরেকটি জীবন হারাবে না ঠান্ডার কাছে। একটি কম্বল, একটি গরম খাবার, কিংবা একটি সহানুভূতিশীল দৃষ্টি এই ছোট কাজগুলোই শীতের অন্ধকারে তাদের জন্য হয়ে উঠতে পারে জীবনের আলো।
নুসরাত জাহান (স্মরনীকা)
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা