প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬
মানুষের মনস্তত্ত্বের এক অদ্ভুত ও জটিল গহ্বরে জনপ্রিয়তার আকর্ষণ এমনভাবে জন্মায় যে তা শুধু সামাজিক বাস্তবতার অংশ নয়; বরং মানুষের আচরণ, ক্ষমতা এবং সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামোর গভীরে গেঁথে আছে। জনপ্রিয়তা একদিকে প্রশংসার, প্রশস্তির ও স্বীকৃতির প্রতীক; অন্যদিকে বাজার, ক্ষমতা, মর্যাদা ও সুযোগের প্রবেশদ্বার। সমসাময়িক সমাজে এটি তীব্র, দৃশ্যমান এবং ব্যবসায়িক। কারণ আধুনিক যুগে জনপ্রিয়তার মোহ শুধু মনস্তাত্ত্বিক নয়; এটি একটি সম্পদ এবং এক প্রকার কর্পোরেট উপকরণ। ফলে প্রশ্ন জন্ম নেয়, কিভাবে জনপ্রিয়তা এত বড় এক শক্তি হলো? কেন মানুষ জনপ্রিয় হতে চায়? কেন সমাজ জনপ্রিয়তাকে এত গুরুত্ব দেয়? এবং কেন জনপ্রিয়তার মোহ এত বিপজ্জনক ব্যক্তি, সমাজ ও রাজনীতির জন্য?
জনপ্রিয়তার মোহ মানব স্বভাবের গভীরে বিদ্যমান। আদিম সমাজে নেতৃত্ব ও মর্যাদার লড়াই ছিল বেঁচে থাকার কৌশল। জনপ্রিয় হওয়া মানেই ছিল সম্মান, রক্ষা এবং খাদ্য বা সম্পদ পাবার সুযোগ। আজকের জটিল আধুনিক সমাজে সেই আদিম প্রবৃত্তি নতুন রূপ পেয়েছে। ডিজিটাল যুগে মানুষ জনপ্রিয় হয় লাইক, ফলোয়ার, ভিউ বা শেয়ারের মাধ্যমে। এই সংখ্যাগুলো এখন সামাজিক মর্যাদার সংখ্যাতাত্ত্বিক সূচক। জনপ্রিয়তার এই পরিমাণগত ব্যবস্থা একদিকে সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে সৃষ্টি করছে প্রতিযোগিতা ও অসন্তোষ। ফলে জনপ্রিয়তার মোহ একপ্রকার গাণিতিক কাঠামোতে পরিণত হয়েছে, যেখানে মানুষের মূল্য মাপা হয় ডিজিটাল গণনায়।
সমসাময়িক মিডিয়া প্রযুক্তি জনপ্রিয়তার এই আকর্ষণ ও মোহকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। আগে জনপ্রিয়তা ছিল মূলত প্রাতিষ্ঠানিক : চলচ্চিত্র, নাটক, সংগীত, রাজনীতি বা ক্রীড়াঙ্গনের মতো ক্ষেত্রের লোকেরা জনপ্রিয়তা পেত। আজ জনপ্রিয়তা গণতান্ত্রিক; যে কেউ ভিডিও বানিয়ে, ছবি তুলে, টিকটক ও ইন্সটাগ্রামে পোস্ট করে বা মতামত লিখে জনপ্রিয় হতে পারে। ফলে জনপ্রিয়তা আর বন্ধ দরজার বিষয় নয়; এটি একটি খোলা বাজার। তবে এই বাজারে যোগ্যতা বা প্রতিভা নয়, অ্যালগরিদম ও দর্শকের মনস্তত্ত্ব নির্ধারণ করে কে জনপ্রিয় হবে। অর্থাৎ জনপ্রিয়তা এখন শুধু সমাজের মূল্যায়নের বিষয় নয়; প্রযুক্তি ও অ্যালগরিদমিক ইকোসিস্টেমের সিদ্ধান্ত।
এই অ্যালগরিদমিক ইকোসিস্টেম জনপ্রিয়তাকে একটি ব্যবসায়িক পণ্যতে রূপান্তর করেছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো বিজ্ঞাপন আয়ের ওপর নির্ভরশীল, আর বিজ্ঞাপন নির্ভর করে দৃষ্টি আকর্ষণের ওপর। ফলে প্ল্যাটফর্মগুলো এমন কনটেন্ট সামনে আনে, যা মানুষ বেশি দেখবে, বেশি প্রতিক্রিয়া দেবে এবং বেশি শেয়ার করবে। এর ফলে জনপ্রিয়তার সংজ্ঞা পাল্টে গেছে; সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত, সুন্দর নয়, সবচেয়ে মনোহরণকারীই জনপ্রিয়। ফলে সমাজে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব তৈরি হয়েছে; শ্রেষ্ঠ হওয়ার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে দেখা হওয়া। এই দৃষ্টিমুখী সংস্কৃতি অদ্ভুত এক বাস্তবতা সৃষ্টি করেছে।
এই প্রতিযোগিতা শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সংস্কৃতিগত। জনপ্রিয়তার অর্থনীতি এখন সমাজে নানাভাবে প্রভাব ফেলছে। রাজনীতিতে জনপ্রিয়তা ভোট ও ক্ষমতার উপাদান; ব্যবসায়ে এটি বাজার ও বিক্রির হাতিয়ার; সংস্কৃতিতে এটি প্রভাব ও মানদ-; আর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জ্ঞানভিত্তিক স্থানে এটি গবেষণা ও তহবিলের সূচক। এমনকি ধর্মীয় ক্ষেত্রেও জনপ্রিয়তার প্রশ্ন দেখা যায়; কে বেশি অনুসারী পেল, কার অনুষ্ঠান বেশি জমল, কার ওয়াজ বা বক্তৃতা ভাইরাল হলো। ফলে জনপ্রিয়তার মোহ এক বহুভুজে পরিণত হয়েছে, যার ছায়া সমাজের প্রায় সব স্তরেই।
জনপ্রিয়তার মোহের আরেকটি দিক হলো নিজেকে দেখানোর আকাঙ্ক্ষা। আধুনিক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ মানুষকে কেন্দ্র করে ক্ষমতা ও পরিচয়ের নতুন ধারণা তৈরি করেছে। আজ নিজের ভাবমূর্তি একটি প্রকল্প। সামাজিক মাধ্যমে নিজের জীবনের ছবিগুলো কিউরেট করা, নিজের সাফল্যগুলো তুলে ধরা, নিজের কণ্ঠকে শোনানো; এগুলো সমাজে পরিচয়ের নির্মাণে সহায়ক। কিন্তু একই সঙ্গে এগুলো এক ধরনের প্রতিযোগিতা ও চাপ তৈরি করে। কারণ পরিচয় যতই ব্যক্তিগত মনে হোক, তা সামাজিকভাবে মূল্যায়িত হয় অন্যদের প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে। ফলে জনপ্রিয়তা শুধু চাহিদা নয়, এটি হয়ে ওঠে পরিচয়ের গ্যারান্টি।
ব্যক্তিগত সুখের ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তার মোহ যে কতটা বিপজ্জনক, তা মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় স্পষ্ট দেখা যায়। যারা অন্যদের মূল্যায়নের ওপর নির্ভরশীল জীবনযাপন করে, তাদের মানসিক স্থিতিশীলতা কম থাকে। জনপ্রিয়তা স্থায়ী নয়, এটি পরিবর্তনশীল। আজ যে জনপ্রিয়, কাল সে ভুলে যাওয়া হতে পারে। ফলে জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করে পরিচয় তৈরি করলে ব্যক্তির নিজের অস্তিত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে। আত্মবিশ্বাস আক্রান্ত হয়, মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা জন্ম নেয়; বিশেষ করে হতাশা, উদ্বেগ, তুলনামূলক অসন্তোষ তৈরি হয় মনে। ডিজিটাল প্রজন্মের মধ্যে এই প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, কারণ তাদের জীবনের অনেক অংশই ভার্চুয়াল স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল।
জনপ্রিয়তার মোহের অর্থনৈতিক দিকটি বুঝতে গেলে প্রথমেই স্বীকার করতে হবে যে জনপ্রিয়তা নিজের একটি বাজারমূল্য ধারণ করে। সমসাময়িক পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে জনপ্রিয়তা শুধু সাংস্কৃতিক মর্যাদা নয়, এটি এক ধরনের বিনিময়যোগ্য সম্পদ। অর্থনীতিবিদ থর্স্টেইন ভেবলেন ভোক্তাবাদের ক্ষেত্রে দেখিয়েছিলেন কিভাবে সমাজে মর্যাদা একটি প্রদর্শনযোগ্য ফ্যাক্টর হয়ে ওঠে। আজ ডিজিটাল যুগে জনপ্রিয়তা এমনই এক প্রদর্শনযোগ্য সম্পদ, যার মাধ্যমে প্রভাব, সম্পর্ক, সুযোগ এবং অবশেষে অর্থ সৃষ্টি হয়। ফলে জনপ্রিয়তা শুধু মনস্তাত্ত্বিক চাহিদা পূরণ করে না, এটি অর্থনৈতিক লেনদেনের ভিত্তিও গড়ে তোলে।
রাজনীতিতে জনপ্রিয়তার মোহ সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ গণতন্ত্র সংখ্যার ওপর দাঁড়ানো বলে জনপ্রিয়তা ক্ষমতার লেজিটিমেসি তৈরি করে। জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা নির্মাণ করাই ক্ষমতার সংগ্রামের প্রধান কৌশল। রাজনীতিতে পপুলিজম জনতার আবেগকে উত্তেজিত করে ক্ষমতা অর্জনের কৌশল। ডিজিটাল যুগে পপুলিজম প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদমিক লজিকের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ পপুলিস্ট বার্তা সাধারণত সরল, আবেগী, নাটকীয়, যা মানুষকে দ্রুত উত্তেজিত করে, আর জনপ্রিয়তা তৈরি করে ক্ষমতা। ফলে রাজনীতি এখন নীতি বা ধারণার নয়; এটি দৃষ্টির প্রতিযোগিতা।
এই দর্শক সমাজে সাংবাদিকতা ও মিডিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম জনপ্রিয়তার মোহকে বৃদ্ধি, প্রচার ও পরিচালনা করে। মিডিয়া ট্রাফিক চায়, আর ট্রাফিক আসে সংঘর্ষ, নাটক ও বিনোদন থেকে। জনপ্রিয়তা এখন মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিকে এমনভাবে চালিত করছে, যেখানে সংবাদ মাধ্যমও এখন প্ল্যাটফর্মের অর্থনীতি অনুসরণ করে। ফলে তারা উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা, নাটকীয়তা, সংঘর্ষ, স্ক্যান্ডাল ও বিতর্ককে অগ্রাধিকার দেয়, কারণ এগুলো জনপ্রিয়। এই প্রক্রিয়া সত্যকে ধীরে ধীরে কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেয়। মিডিয়া তাই তথ্যের ভান্ডার নয়; মনোযোগের থিয়েটার। ফলে জনপ্রিয়তা তৈরির একটি কৃত্রিম মেশিন তৈরি হয়েছে, যেখানে বিতর্ক, হইচই, উত্তেজনা ও স্ক্যান্ডাল জনপ্রিয়তা উৎপাদনের কাঁচামাল। এতে সমাজের গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার জায়গা সঙ্কুচিত হয়। বুদ্ধিবৃত্তিকতার চেয়ে উত্তেজনা বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে।
সংস্কৃতির দিক থেকে জনপ্রিয়তার মোহ একধরনের মানমূল্য সংকট তৈরি করছে। আগে সংস্কৃতি মানে ছিল শিক্ষা, বিজ্ঞান, ঐতিহ্য, অভিজ্ঞতা ও চিন্তার সংমিশ্রণ। এখন জনপ্রিয় সংস্কৃতি মানে ভিউ সংখ্যা, স্ট্রিম সংখ্যা, ট্রেন্ডিং টপিক এবং ভাইরাল কনটেন্ট। এতে শিল্প ও জ্ঞান উভয়ই বাজারের অনুগত হতে বাধ্য হয়। শিল্পীরাও এখন অ্যালগরিদমিক পছন্দ অনুযায়ী কাজ করেন, কারণ বাজার চায় জনপ্রিয়তা। এর ফলে শিল্পের স্বাধীনতা কমে যায়; শিল্প হয়ে ওঠে পণ্যের মতো।
ব্যবসায়িক অর্থনীতিতে জনপ্রিয়তার গুরুত্ব আরও পরিষ্কার। জনপ্রিয়তা এখন বিনিয়োগের ক্ষেত্র। ইন্টারনেটের জগতে মানুষের মনোযোগই প্রধান সম্পদ; বিজ্ঞাপনদাতারা সেই মনোযোগ কেনে, প্ল্যাটফর্মগুলো তা নিয়ন্ত্রণ করে, এবং কনটেন্ট নির্মাতারা তা অর্জনের চেষ্টা করে। জনপ্রিয়তার মোহ এই মনোযোগ অর্থনীতির প্রধান ইঞ্জিন। যদি কেউ মনে করে জনপ্রিয়তা শুধু সামাজিক রুচির প্রতিফলন, তবে তা ভুল; বাস্তবে জনপ্রিয়তা হয়ে দাঁড়িয়েছে মনোযোগের বণ্টন কাঠামো। ফলে সমাজে নতুন এক অসমতা জন্ম নিয়েছে: কেউ কেউ পায় বিপুল মনোযোগ, আর কেউ থাকে তথ্যের অন্ধকারে
একজন ইনফ্লুয়েন্সার বা সেলিব্রিটির অনুসারী সংখ্যা তার বাণিজ্যিক মূল্য নির্ধারণ করে। ফলে জনপ্রিয়তা অর্থ উপার্জনের সরঞ্জাম। এই নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো সমাজে শ্রেণিবিভাগও বদলে দিয়েছে, এখন সামাজিক মর্যাদার এক নতুন শ্রেণি তৈরি হচ্ছে :
attention-wealth। যারা অর্থ না থাকলেও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, তাদের প্রভাব অর্থনৈতিক শক্তির সমতুল্য। এখন প্রশ্ন হলো, জনপ্রিয়তার মোহ কি নিছক ক্ষতিকর? উত্তর সোজা নয়। জনপ্রিয়তা সামাজিক যোগাযোগ বাড়ায়, নতুন সুযোগ তৈরি করে, সৃজনশীলতাকে সামনে নিয়ে আসে, এবং গণতন্ত্রে কণ্ঠ দেয়। অনেক প্রান্তিক মানুষের জন্য জনপ্রিয়তা এক ধরনের ক্ষমতায়নও বটে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন জনপ্রিয়তা নিজেই লক্ষ্য হয়ে যায়, অর্থাৎ জনপ্রিয় হওয়ার জন্য মানুষ কাজ করে, কাজ করার জন্য জনপ্রিয় হয় না। তখনই সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়।
এত কিছু বলার পরও বাস্তবতা রয়ে যায় : জনপ্রিয়তা এই যুগের অবধারিত সামাজিক সত্য। এটি অস্বীকার করা যায় না, পালানোও যায় না। কিন্তু এর মোহকে বুঝতে হবে, নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এর সীমা জানতে হবে। নাহলে ব্যক্তি হারায় নিজেকে, সমাজ হারায় ভারসাম্যকে, আর রাজনীতি হারায় নীতি ও যুক্তিকে।
আরিফুল ইসলাম রাফি
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ