ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

স্ক্রিনে বন্দি জীবন : আধুনিক সভ্যতার নতুন সংকট

জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন
স্ক্রিনে বন্দি জীবন : আধুনিক সভ্যতার নতুন সংকট

একবিংশ শতাব্দীর এই লগ্নে দাঁড়িয়ে মানবসভ্যতা যখন প্রযুক্তির চরম শিখরে, ঠিক তখনই আমাদের যাপিত জীবনে এক নীরব ঘাতক বাসা বেঁধেছে- যার নাম ‘স্ক্রিন অ্যাডিকশন’ বা ‘স্ক্রিন বন্দি’। সকালের ঘুম ভাঙা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত আমাদের চোখ আজ আটকে আছে স্মার্টফোন, ল্যাপটপ কিংবা টেলিভিশনের উজ্জ্বল নীল আলোয়। প্রযুক্তির এই অতি-নির্ভরতা আমাদের জীবনকে সহজ করলেও, কেড়ে নিচ্ছে স্বাভাবিক সামাজিকতা, শারীরিক সুস্থতা এবং মানসিক প্রশান্তি।

যান্ত্রিকতায় হারানো শৈশব ও কৈশোর : এক সময় বিকালের মাঠ মানেই ছিল শিশুদের কোলাহল আর দৌড়ঝাঁপ। কিন্তু বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আজকের শিশুরা মাঠের ধুলোবালির চেয়ে ট্যাবে ভিডিও গেম বা ইউটিউবে কার্টুন দেখতে বেশি আগ্রহী। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, শৈশবে স্ক্রিনের প্রতি এই আসক্তি শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। তারা বাস্তব জগতের আবেগ-অনুভূতি বুঝতে পারছে না, ফলে বাড়ছে একাকীত্ব এবং খিটখিটে মেজাজ। কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ার ‘লাইক-কমেন্টের’ নেশা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ভার্চুয়াল জগতের স্বীকৃতি না পেলে তারা চরম হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে।

সামাজিক বিচ্ছেদ ও পারিবারিক দূরত্ব : স্ক্রিনে বন্দি হওয়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে। ডাইনিং টেবিলে খাবার সময় কিংবা ড্রয়িং রুমে বসে কথা বলার সময়ও পরিবারের সদস্যরা একে অন্যের দিকে না তাকিয়ে নিজের ফোনে মগ্ন থাকছেন। একই ছাদের নিচে থেকেও মানুষ আজ যোজন যোজন দূরে। ‘ফবিং’ (Phubbing) বা সামনে থাকা মানুষকে গুরুত্ব না দিয়ে ফোনে ব্যস্ত থাকার প্রবণতা মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মমত্ববোধ কমিয়ে দিচ্ছে। উৎসব-অনুষ্ঠান এখন আনন্দ ভাগাভাগির চেয়ে ‘স্ট্যাটাস’ বা ‘সেলফি’ তোলার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মানসিক বিপর্যয় : দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে ‘কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম’ বা চোখের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। এর পাশাপাশি ঘাড় ব্যথা, পিঠ ব্যথা এবং স্থূলতা বা ওজন বৃদ্ধির মতো সমস্যা ঘরে ঘরে দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে রাতের বেলা ফোনের নীল আলো আমাদের মস্তিষ্কের মেলোটোনিন হরমোন নিঃসরণে বাধা দেয়, যা অনিদ্রার প্রধান কারণ। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে মানুষ বিষণ্ণতা, উদ্বেগ এবং মেমরি লস বা স্মৃতিভ্রমের মতো মানসিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। স্ক্রিনের ভার্চুয়াল জগত আমাদের এমন এক মোহে আটকে রাখছে যেখানে বাস্তব পৃথিবীটা ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে।

শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে প্রভাব : যদিও অনলাইন শিক্ষা ও ফ্রিল্যান্সিং আমাদের সামনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, কিন্তু এর অপব্যবহার কাজের মনোযোগ বা ‘কনসেন্ট্রেশন স্প্যান’ কমিয়ে দিচ্ছে। যেকোনো কাজ করার সময় বারবার নোটিফিকেশন চেক করার অভ্যাস আমাদের সৃজনশীলতা নষ্ট করছে। তরুণ প্রজন্ম আজ বই পড়ার অভ্যেস ছেড়ে দিয়ে স্ক্রল করে তথ্য খুঁজছে, যার ফলে গভীর জ্ঞান অর্জনের পথ রুদ্ধ হচ্ছে।

মুক্তির পথ ও আমাদের করণীয় : স্ক্রিন বা প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বর্জন করা সম্ভব নয়, তবে এর নিয়ন্ত্রণে আমাদের সচেতন হতে হবে। বিশেষজ্ঞরা ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ বা দিনের নির্দিষ্ট সময়ে প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। খাবার সময় বা ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগে ফোন ব্যবহার বন্ধ করা, সন্তানদের হাতে গ্যাজেট না দিয়ে মাঠে খেলতে উৎসাহিত করা এবং পরিবারকে গুণগত সময় দেওয়া জরুরি। স্ক্রিনের উজ্জ্বল আলো থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের আবার ফিরে যেতে হবে প্রকৃতির কাছে, বইয়ের পাতায় এবং মানুষের হাসিমুখের মধ্যে।

স্ক্রিন আমাদের দাস নয়, বরং আমরাই যেন স্ক্রিনের দাসে পরিণত না হই। যন্ত্র হোক আমাদের প্রয়োজনে, কিন্তু জীবনের নিয়ন্ত্রক যেন হয় আমাদের মানবিকতা ও সচেতনতা। বন্দি জীবন থেকে মুক্ত হয়ে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়াই হোক আগামীর অঙ্গীকার। প্রযুক্তির আলো যেন আমাদের অন্তরের আলোকে নিভিয়ে না দেয়, সেদিকেই এখন নজর দেওয়ার সময় এসেছে।

জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন

শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত