প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রাণভোমরা হলো নির্বাচন। আর এই নির্বাচনের মূল চালিকাশক্তি হলো প্রচারণা। প্রচারণা শুধু প্রার্থীদের পরিচিতি বা গালভরা প্রতিশ্রুতির মঞ্চ নয়, বরং এটি হওয়া উচিত একটি জাতির ভবিষ্যৎ রূপরেখা প্রণয়নের দর্পণ। তবে বর্তমান সময়ে নির্বাচনি প্রচারণার ধরন এবং তার সঙ্গে দেশ গঠন ও জাতির কল্যাণের সংঘাত বা সমন্বয় নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ রয়েছে।
তাত্ত্বিকভাবে, নির্বাচনি প্রচারণার মূল লক্ষ্য হলো ভোটারদের কাছে প্রার্থীর দর্শন, দলের ইশতেহার এবং আগামী দিনের পরিকল্পনা তুলে ধরা। এটি একটি সুস্থ রাজনৈতিক বিতর্কের ক্ষেত্র হওয়ার কথা ছিল, যেখানে উন্নয়নের তুলনামূলক চিত্র এবং জাতীয় সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই হতাশাজনক। অনেক সময় দেখা যায়, গঠনমূলক আলোচনার পরিবর্তে ব্যক্তিগত আক্রমণ, কাদা ছোড়াছুড়ি এবং সাম্প্রদায়িক বা আবেগীয় উস্কানি প্রচারণার মূল উপজীব্য হয়ে দাঁড়ায়। বিশাল জনসভা, মাইকের তীব্র আওয়াজ এবং প্লাস্টিকের পোস্টারে শহর ছেয়ে ফেলা- এসবই কি শুধু জনকল্যাণের বার্তা দেয়? নাকি এটি শুধু ক্ষমতার শক্তির মহড়া? দেশ গঠনে যখন আমরা পরিবেশবান্ধব অগ্রগতির কথা বলি, তখন প্রচারণার এই সনাতনী ও ক্ষতিকর পদ্ধতিগুলো বড় এক প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করে।
দেশ গঠন কোনো সাময়িক সংস্কার নয়, এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। একটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি ইশতেহার হওয়া উচিত সেই প্রক্রিয়ার একটি রোডম্যাপ। জাতির কল্যাণে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তির প্রসার নিয়ে সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা থাকা জরুরি।
প্রায়ই দেখা যায়, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো এমন সব আকাশকুসুম প্রতিশ্রুতি দেয়, যা দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। একে বলা হয় ‘পপুলিজম’ বা সস্তা জনপ্রিয়তা লাভের রাজনীতি। প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য হলো সত্য বলা। জাতির সামনে বর্তমান সংকটগুলো তুলে ধরা এবং তা থেকে উত্তরণের বাস্তবসম্মত পথ দেখানোই হলো প্রকৃত দেশপ্রেম। যদি প্রচারণায় স্বচ্ছতা না থাকে, তবে নির্বাচনের পর জনগণের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের অনীহা সৃষ্টি করে।
বর্তমানে আমাদের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ তরুণ। তাদের কাছে নির্বাচনি প্রচারণা মানে শুধু স্লোগান বা মিছিল নয়; তারা চায় এমন এক দেশ যেখানে মেধার মূল্যায়ন হবে, দুর্নীতি নির্মূল হবে এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে। দেশ গঠনে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে হলে প্রচারণার ভাষায় আধুনিকতা ও যৌক্তিকতা আনা প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন প্রচারণার অন্যতম বড় মাধ্যম। এর ইতিবাচক ব্যবহার যেমন তথ্যের দ্রুত আদান-প্রদান নিশ্চিত করে, তেমনি এর নেতিবাচক ব্যবহার বা ‘ফেক নিউজ’ জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে। জাতির কল্যাণ নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্বশীলতার সাথে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে হবে। সাইবার বুলিং বা অপপ্রচারের বদলে যদি তথ্যপ্রযুক্তিকে গঠনমূলক বিতর্কের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তবেই তা দেশ গঠনে সহায়ক হবে।
নির্বাচনি প্রচারণা চলাকালে জনভোগান্তি কমানো এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা জাতির কল্যাণেরই অংশ। গভীর রাত পর্যন্ত মাইকিং, রাস্তা বন্ধ করে সভা কিংবা দেয়ালে যত্রতত্র পোস্টার লাগানো- এগুলো নাগরিকদের মৌলিক অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে। যে দল বা প্রার্থী নির্বাচনের আগেই নাগরিক অধিকারের তোয়াক্কা করেন না, তারা নির্বাচনের পর জাতির কল্যাণ নিশ্চিত করবেন- এমনটা আশা করা কঠিন।
একটি সুস্থ নির্বাচনি সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা থাকা বাঞ্ছনীয়। বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা এবং গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ করার মানসিকতা না থাকলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে, নির্বাচনের পর জয়ী-বিজিত নির্বিশেষে সবাইকে দেশের মানুষের জন্যই কাজ করতে হবে। নির্বাচন আসে, নির্বাচন যায়। কিন্তু রাষ্ট্র থেকে যায়। তাই প্রচারণার সময় এমন কোনো বিভেদ সৃষ্টি করা উচিত নয়, যা নির্বাচনের পরেও সমাজকে বিষাক্ত করে রাখে। জাতির কল্যাণ নিহিত রয়েছে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায়। ধর্ম-বর্ণ-দল নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা এবং মর্যাদা রক্ষা করাই হওয়া উচিত যেকোনো প্রচারণার মূল সুর। দেশ গঠন মানে শুধু বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং একটি শিক্ষিত, নৈতিক এবং সচেতন জাতি গঠন করা। আর এই সচেতনতা তৈরির প্রাথমিক পাঠ শুরু হয় নির্বাচনের সময় থেকে। প্রার্থীরা যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের কথা বলেন এবং নিজেরা তা পালন করেন, তখনই জনগণের মধ্যে আস্থার জায়গা তৈরি হয়।
নির্বাচনি প্রচারণা শুধু ভোট পাওয়ার কৌশল হওয়া উচিত নয়, বরং এটি হওয়া উচিত জনগণের রাজনৈতিক শিক্ষার মাধ্যম। যখন প্রচারণা থেকে ব্যক্তিগত কুৎসা বাদ দিয়ে জাতীয় উন্নয়নের স্বপ্ন এবং তা বাস্তবায়নের রোডম্যাপ প্রধান হয়ে উঠবে, তখনই দেশ গঠনের পথ সুগম হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মনে রাখা প্রয়োজন যে, ক্ষমতা অর্জনের চেয়ে ক্ষমতা প্রয়োগ করে জাতির কল্যাণ নিশ্চিত করা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ এবং বৈষম্যহীন দেশ গড়তে হলে নির্বাচনি প্রচারণায় স্বচ্ছতা, নৈতিকতা এবং দেশপ্রেমের প্রতিফলন থাকা অপরিহার্য।