ঢাকা শনিবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি ইশতেহারে জনগণের প্রত্যাশা

মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি ইশতেহারে জনগণের প্রত্যাশা

নির্বাচন এলেই রাজনৈতিক অঙ্গন সরব হয়ে ওঠে রাজনেতিক দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহার নিয়ে। নির্বাচনি ইশতেহার হলো দেশের মানুষের কাছে আগামী দিনগুলোর জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি, যে প্রতিশ্রুতি তারা নির্বাচনে জয়ী হলে বাস্তবায়ন করবে। ইশতেহার মূলত একটি রাজনৈতিক দলের রাষ্ট্রচিন্তার লিখিত রূপ। এটি বলে দেয় দলটি ক্ষমতায় গেলে কী করবে, কোন সমস্যাকে কীভাবে সমাধান করতে চায় এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কী। নির্বাচনি ইশতেহার জাতীয়ভাবে ইতিবাচক জনমত গড়ে তোলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর বিগত সময়ের ইশতেহারগুলো যদি আমরা পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখতে পাই যে বেশির ভাগই অবাস্তবায়িত থেকে যায়, যা আদতে গণমানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারেনি। আমরা এমনটাও দেখি যে ইশতেহার গণমানুষের জীবনমান উন্নয়নে কতটা ভূমিকা রাখবে, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মনোযোগ না দেওয়ার কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর আগ্রহ থাকে ‘মেগা প্রজেক্ট’-এর দিকে। আর এমন নানাবিধ মেগা প্রজেক্টের আড়ালে গণমানুষের স্বপ্নও ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।

উন্নয়নকে মেগা প্রজেক্টের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার প্রবণতার কারণে আমরা দেখতে পাই, নগরের বুক চিরে গড়ে ওঠা প্রকল্পগুলো ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে উন্নয়নের তথাকথিত প্রতীক, যা আমরা বিগত আওয়ামী আমলে দেখেছি। সেই উন্নয়ন পরবর্তী সময়ে মুখ থুবড়ে পড়লেও তা তাদের সমর্থকদের মধ্যে থেকে যায় উন্নয়নের এক ‘মেগা বয়ান’ হিসেবে। তাই হয়তো নির্বাচনি ইশতেহারে নানা রকম মুখরোচক উন্নয়নের বয়ান থাকে, যেখানে জনবান্ধব উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষিত থেকে যায়, যা শুধু একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর স্বার্থই রক্ষা করে।

এর মধ্য দিয়ে শোষণমূলক একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। তাই এ ধরনের শোষণমূলক ব্যবস্থা তৈরির প্রবণতা থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে বের হয়ে আসতে হবে এবং সাম্য ও ইনসাফের বাংলাদেশ বিনির্মান করতে হবে।

রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি ইশতিহারে সাধারণ জনগণের প্রত্যাশাগুলো:- সর্বপ্রথম আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও অগাধ বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। জনগণের জানমালের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ধনী-গরিব সবার জন্য সমান আইন প্রয়োগ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ক্ষমতাকে বাপ-দাদার উত্তরাধিকার সম্পত্তি মনে করা যাবে না। রাষ্ট্রীয় কোষাগারকে আমানত মনে করতে হবে, গনিমতের মাল মনে করা যাবে না। শাসক নয়, আল্লাহর প্রতিনিধি গোলাম হিসেবে দেশ শাসন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে সরাসরি সাধারণ মানুষের নালিশ ও অভিযোগ প্রেরণ করার অধিকার প্রদান করতে হবে। মানুষের জাতীয় মৌলিক অধিকারের ব্যবস্থা নিশ্চত করতে হবে। ক্ষমতায় গেলে সুদ, ঘুষ, মাদক, যৌতুক, দুর্নীতি, অবৈধ ব্যবসা ও টাকা পাঁচার বন্ধ করার উদ্যোগ দিতে হবে। কোরআন-সুন্নার শরীয়া আইন চালু করে, ব্রিটিশ আইন সমুদ্রে নিক্ষেপ করতে হবে। ইসলামী শরীয়া আইন অনুযায়ী বিচারকাজ সম্পন্ন করতে হবে। বিচারব্যবস্থায় ইসলামের বিধান অনুসরণ করতে হবে। সর্বপরি সাম্য-ন্যায় ও ইনসাফ ভিত্তিকভিত্তিক সমাজ এবং বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ইসলামি জাকাতভিত্তিক শোষনমুক্ত অর্থনীতি চালু করতে হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে সুদ নিষিদ্ধ এবং জাকাতভিত্তিক অর্থনীতি চালু করতে হবে।

রাষ্ট্রের প্রত্যেক কাজের জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। রাষ্ট্রের কোন কর্মকর্তার দুর্নীতির জন্য তৎক্ষণাৎ শাস্তি প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। প্রত্যেক বেকারের জন্য সরকারি উদ্যোগে কলকারখানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। কর্ম ছাড়া কোনো তরুণ ঘরের বাইরে বেকার ঘোরাফেরা করতে পারবে না। সরকারি বন্ধ কারখানাগুলোকে সচল করে সৎ ও দক্ষ জনবল নিয়োগের মাধ্যমে বেকারত্ব মোচন করতে হবে। শিক্ষিত বেকার তরুণদের জিরো পারসেন্ট ইন্টারেস্টে ব্যাংক লোন প্রদান করতে হবে।

ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাট সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। এসব কাজে জড়িত অপরাধী এবং সহায়তাকারী উভয়কে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং দুর্নীতিমুক্ত বিচারব্যবস্থা সৃষ্টি করতে হবে। সরকারি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি বন্ধ করতে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। প্রশাসনে একতরফাভাবে দলীয় লোক নিয়োগ বন্ধ করতে হবে। দ্রব্যমূল্যের দাম কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। সব রকম অবৈধ সিন্ডিকেট (ব্যবসায়ী-মন্ত্রী) বন্ধ করতে হবে। বন্দর ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের সিন্ডিকেটের কারসাজি বন্ধ করার ওয়াদা করতে হবে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আঁতাত ও সিন্ডিকেট সৃষ্টি করে জিনিষপত্রের দাম বৃদ্ধি করার রাস্তা বন্ধ করতে হবে। অবৈধ পন্তায় জুলুম করে আরেকজনের সম্পদ জবর দখল করা যাবে না। অন্যের সম্পদ আত্মসাৎকারীকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তৈল, গ্যাস, বিদেশি ফল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরকারি কর-শুল্ক সর্বনিম্ন কমাতে হবে। দেশের স্বার্থ পরিপন্থি কোনো কাজ ও চুক্তি না করার ওয়াদা প্রদান করতে হবে। ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করে স্কুল-কলেজ ইউনিভার্সিটির পরা লেখার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। স্কুল-কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে কোরআন-হাদিস শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। মাদকদ্রব্য ক্রয়-বিক্রয় সরকারি ও বেসরকারিভাবে বন্ধ ঘোষণা করতে হবে। এ কাজে জড়িত ব্যক্তিকে ইসলামি আইন অনুযায়ী সর্বোচ্ছ শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নারীকে তার নিজ নিজ শালীনতা বজায় রাখতে হবে। অশ্লীল, বেহায়াপনা, যৌনাচার বন্ধ করতে হবে।

আবাসিক হোটেলে পতিতাবৃত্তি বন্ধ করার ওয়াদা দিতে হবে। ধর্ষণকারীকে শরীয়া আইন অনুযায়ী শাস্তি প্রদান করতে হবে। বিচারের নামে দীর্ঘসূত্রতা বা সময়ক্ষেপণ বন্ধ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা ১ বছরের কম সময়ের মধ্য বিচার খালাস, নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। থানায় থানায় পুলিশের ঘুষ, চাঁদাবাজি বন্ধ করতে কঠোর আইন তৈরি করতে হবে।

বিচারকরা অন্যায়ভাবে, অবৈধ উপায়ে, পক্ষপাত মূলক বিচার করলে তাদের ফাঁসিতে ঝুলাতে হবে। জায়গা জমিন নিয়ে মানুষ মারাত্মক জামেলায় লিপ্ত আছে। প্রয়োজনে আইন করে, জমির ন্যায্য দাবিদারকে তার মালিকানা প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ও প্রতিবন্ধী ভাতার পরিমাণ আরও বৃদ্ধি করতে হবে।

বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে অন্যতম বাস্তবতা হলো- নির্বাচনের পূর্বে অনেক প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে থাকলেও পরবর্তীতে তার বাস্তবায়ন বা মূল্যায়ন করা হয় না।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত