প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে জ্বালানি খাত বিশেষ করে প্রাকৃতিক গ্যাস নিয়ে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একদিকে তীব্র গ্যাস সংকট, অন্যদিকে সিন্ডিকেটের কারসাজিতে মূল্যবৃদ্ধি- সব মিলিয়ে জনজীবন আজ এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে। রান্নার চুলা থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার চাকা, সবখানেই হাহাকার। এই সংকট যতটা না প্রাকৃতিক বা যান্ত্রিক, তারচেয়েও বেশি মানবসৃষ্ট এবং অব্যবস্থাপনার ফসল।
শহরাঞ্চলের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের সকাল শুরু হয় চুলা জ্বলবে কি জ্বলবে না- এই আশঙ্কা নিয়ে। অনেক এলাকায় সূর্য ওঠার আগেই গ্যাসের চাপ কমে যায়, যা আর ফিরে আসে না গভীর রাতের আগে। ফলে বাধ্য হয়ে মানুষকে বিকল্প হিসেবে এলপিজি সিলিন্ডার বা ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করতে হচ্ছে।
এতে পরিবারের মাসিক বাজেটের ওপর পড়ছে প্রচণ্ড চাপ। যারা সিলিন্ডার কেনার সামর্থ্য রাখেন না, তাদের অনেক সময় অভুক্ত থাকতে হচ্ছে অথবা হোটেলের অস্বাস্থ্যকর খাবারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এই হাহাকার শুধু একবেলা খাবারের নয়, বরং এটি একটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রতিচ্ছবি।
গ্যাস সংকটের নেতিবাচক প্রভাব শুধু ঘরোয়া রান্নায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত পোশাক খাতসহ বিভিন্ন শিল্প কারখানাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। পর্যাপ্ত চাপের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। ফলে সময়মতো পণ্য রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে না, যা দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শিল্পমালিকদের মতে, গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে, যার চূড়ান্ত মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাকে চড়া মূল্যের পণ্যের মাধ্যমে।
এই সংকটের পেছনে সবচেয়ে বড় খলনায়ক হিসেবে কাজ করছে শক্তিশালী এক ‘গ্যাস সিন্ডিকেট’। অভিযোগ রয়েছে যে, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অবৈধ সংযোগ প্রদান এবং এলপিজি ব্যবসার বাজার বড় করার জন্য একটি অসাধু চক্র নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বৈধ গ্রাহকরা গ্যাস না পেলেও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অবৈধ সংযোগকারীরা দিব্যি গ্যাস ব্যবহার করছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সুবিধা সাধারণ মানুষকে না দিয়ে সিন্ডিকেটের পকেট ভারী করার প্রবণতাও স্পষ্ট। এই সিন্ডিকেট এতটাই প্রভাবশালী যে, এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের এক ধরনের শৈথিল্য লক্ষ্য করা যায়।
গ্যাস সংকটের আরেকটি বড় কারণ হলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব। গত এক দশকে অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধানে জোরাল কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং আমদানিনির্ভর এলএনজির (LNG) ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যখনই দাম বাড়ে, তখনই দেশের অভ্যন্তরে হাহাকার শুরু হয়। নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণে এই অনীহা এবং আমদানির কমিশন-বাণিজ্যের প্রতি ঝোঁক আজ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
এই শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন কঠোর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। শুধু আশ্বাস দিয়ে মানুষের পেট ভরানো সম্ভব নয়। গ্যাস খাতের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকা অসাধু কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার অভিযানকে শুধু লোকদেখানো নয়, বরং ফলপ্রসূ করতে হবে। এলএনজি আমদানির চেয়ে নিজস্ব গ্যাস ফিল্ডগুলো থেকে গ্যাস উত্তোলনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
বাপেক্সকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। সৌরশক্তি ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর চাপ কমানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থায় ডিজিটাল মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে যাতে কোথায়, কেন গ্যাসের অপচয় বা চুরি হচ্ছে তা দ্রুত ধরা যায়।
সাধারণ মানুষের হাহাকার যখন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছায়, তখন সেটি সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দেয়। জ্বালানি নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার। রাষ্ট্রকে অবশ্যই সিন্ডিকেটের হাত থেকে গ্যাস খাতকে মুক্ত করতে হবে। আমরা চাই না চুলা না জ্বলার কষ্টে কোনো মায়ের চোখে জল আসুক, কিংবা কোনো শ্রমিকের কর্মসংস্থান বন্ধ হোক। সরকারের উচিত এখনই কঠোর অবস্থান নিয়ে এই ‘গ্যাস সিন্ডিকেট’ ভেঙে দেওয়া এবং সাধারণ মানুষের ঘরে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা।