ঢাকা সোমবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

তথ্য সুরক্ষা ও উন্নত প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য

মো. নূর হামজা পিয়াস
তথ্য সুরক্ষা ও উন্নত প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য

আধুনিক বিশ্বে তথ্যের অবাধ প্রবাহ মানুষের জীবনযাত্রাকে বদলে দিয়েছে। এক সময় জমি বা প্রাকৃতিক সম্পদকে শক্তির উৎস মনে করা হলেও বর্তমান ডিজিটাল যুগে সেই স্থান দখল করেছে ডেটা বা উপাত্ত। বর্তমানের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর অভাবনীয় উৎকর্ষ ডেটাকে শুধুই তথ্যের সমষ্টির বেড়াজাল থেকে বের করে এক শক্তিশালী ‘বুদ্ধিবৃত্তিক জ্বালানিতে’ রূপান্তর করেছে। এআই-এর অ্যালগরিদমগুলো মূলত ডেটা সংগ্রহ করেই সমৃদ্ধ হয়। যত বেশি এবং বৈচিত্র্যময় ডেটা একটি এআই মডেলকে দেওয়া হয়, তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তত নির্ভুল ও শক্তিশালী হয়।

এআই-এর অ্যালগরিদমগুলো মূলত ডেটা সংগ্রহ করেই বড় হয় এবং নিজেদের শিক্ষিত করে তোলে। একে বলা হয় মেশিন লার্নিং। যত বেশি এবং বৈচিত্র্যময় ডেটা একটি এআই মডেলকে দেওয়া হয়, তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তত নির্ভুল ও শক্তিশালী হয়। সহজ কথায়, ডেটা হলো এআই-এর জন্য কাঁচামাল। যদি আমাদের দেশের মানুষের পছন্দ, অপছন্দ, স্বাস্থ্য বা আর্থিক লেনদেনের ডেটা বিদেশি এআই কোম্পানির হাতে থাকে, তবে তারা আমাদের চেয়েও আমাদের সমাজকে ভালো বুঝতে পারবে এবং নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।

আমাদের দেশের জাতীয় নিরাপত্তার সমান্তরালে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে, তা হলো ডেটা সার্বভৌমত্ব। সহজ কথায়, আমাদের দেশের নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত তথ্যের ওপর আমাদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ কতটুকু, তা নিরূপণ করাই এর মূল লক্ষ্য। ডেটা সার্বভৌমত্বের ধারণাটি মূলত এমন এক আইনি ও প্রযুক্তিগত কাঠামোকে নির্দেশ করে, যা নিশ্চিত করে যে একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে উৎপাদিত ডিজিটাল উপাত্ত সেই দেশের আইন ও শাসনতন্ত্রের অধীনে থাকবে এবং বিদেশের সার্ভারে পাচার হবে না।

আমাদের তথ্য কি আমাদেরই সম্পদ, নাকি এটি উত্তর-আধুনিক ডিজিটাল উপনিবেশবাদের সস্তা কাঁচামালে পরিণত হয়েছে তা জানা প্রয়োজন। ইন্টারনেটের প্রাথমিক যুগে একে একটি সীমানাহীন বিশ্ব হিসেবে কল্পনা করা হলেও বর্তমানের সার্ভেইল্যান্স ক্যাপিটালিজম বা নজরদারি পুঁজিবাদের যুগে সেই রোমান্টিক ধারণার অবসান ঘটেছে। বড় বড় টেক জায়ান্ট কোম্পানিগুলো আমাদের ব্যক্তিগত ডেটা বিনা মূল্যে সংগ্রহ করে তা কোটি কোটি ডলারে বিক্রি করছে অথবা আমাদের মনস্তত্ত্ব পরিবর্তনের জন্য ব্যবহার করছে। এটি আধুনিক বিশ্বের এক নতুন ধরনের শোষণ।

ডেটা সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার প্রথম ধাপ হলো ডেটা লোকালইজেশন। এর অর্থ হলো দেশের নাগরিকদের স্পর্শকাতর তথ্য দেশের ভেতরেই অবস্থিত সার্ভারে সংরক্ষণ করতে হবে। বর্তমানে আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট থেকে শুরু করে সরকারি তথ্যও অনেক সময় বিদেশি ক্লাউড সার্ভারে জমা থাকে। যদি কোনো কারণে সেই দেশের সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হয়, তবে তারা আমাদের ডেটা এক্সেস বন্ধ করে দিতে পারে। এতে জাতীয় নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, যা মোকাবিলা করা কঠিন হবে।

একটি দেশের সামরিক কৌশলের চেয়েও বর্তমানে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে ডেটা কৌশল। যদি কোনো বিদেশি শক্তি আমাদের দেশের মানুষের অবস্থান, যাতায়াত এবং ডিজিটাল আচরণের ডেটা বিশ্লেষণ করতে পারে, তবে তারা খুব সহজেই সমাজে অস্থিরতা তৈরি করতে পারবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ‘ডিপফেক’ ভিডিও বা গুজব ছড়িয়ে নির্বাচন বা জাতীয় স্থিতিশীলতা নষ্ট করা সম্ভব। তাই দেশের ডেটা দেশের ভেতরে রাখা শুধু গোপনীয়তার বিষয় নয়, এটি সরাসরি জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াই।

বাংলাদেশ এখন ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ব্যাংক ব্যবস্থা দ্রুত ডিজিটাল হচ্ছে। প্রতি মুহূর্তে বিপুল পরিমাণ ডেটা তৈরি হচ্ছে। এই বিশাল ডেটা সেট যদি আমরা নিজেরা প্রসেস করতে না পারি এবং বিদেশের ওপর নির্ভর করি, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি হবে অন্যের নিয়ন্ত্রণে। স্মার্ট বাংলাদেশের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত ‘দেশি ডেটায় দেশি এআই’। এতে যেমন কর্মসংস্থান বাড়বে, তেমনি আমাদের তথ্যগত নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে শতভাগ।

ডেটা সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে উপাত্ত সুরক্ষা আইন বা উধঃধ চৎড়ঃবপঃরড়হ অপঃ নিয়ে কাজ চলছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিডিপিআর (এউচজ)-এর আদলে একটি শক্তিশালী আইন আমাদের সময়ের দাবি। এই আইনে নাগরিকদের তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার পাশাপাশি ডেটা সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি অনুমতি ছাড়া ডেটা বিদেশে পাঠায়, তবে তাদের কঠোর শাস্তির বিধান থাকতে হবে। আইনটি এমন হতে হবে যাতে উদ্ভাবন বাধাগ্রস্ত না হয়, আবার নিরাপত্তাও বজায় থাকে। ডেটা সার্বভৌমত্ব রক্ষার পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অবকাঠামো। বিশাল পরিমাণ ডেটা সংরক্ষণের জন্য শক্তিশালী ডেটা সেন্টার এবং ক্লাউড কম্পিউটিং ব্যবস্থা প্রয়োজন। বর্তমানে বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক এবং কালিয়াকৈরে জাতীয় ডেটা সেন্টার স্থাপন করেছে, যা একটি ভালো উদ্যোগ। তবে বেসরকারি খাতকেও নিজস্ব ডেটা সেন্টার স্থাপনেশনে উৎসাহিত করতে হবে। বিদেশের ক্লাউড সার্ভারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আমাদের নিজস্ব ‘ন্যাশনাল ক্লাউড’ গড়ে তুলতে হবে, যা হবে নিরাপদ এবং সাশ্রয়ী। গুগল, মেটা (ফেসবুক), আমাজন বা মাইক্রোসফটের মতো কোম্পানিগুলো সারা বিশ্বের ডেটা নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা প্রায়ই বিভিন্ন দেশের ডেটা সার্বভৌমত্বের আইনকে নিজেদের ব্যবসার অন্তরায় মনে করে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ব্যবসার চেয়ে দেশের স্বার্থ বড়। অনেক দেশ এখন এই কোম্পানিগুলোকে বাধ্য করছে তাদের দেশে অফিস খুলতে এবং স্থানীয় সার্ভার ব্যবহার করতে। বাংলাদেশকেও এই বৈশ্বিক দর কষাকষিতে শক্তিশালী ভূমিকা নিতে হবে যাতে টেক জায়ান্টরা আমাদের সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানাতে বাধ্য হয়।

বর্তমান যুগে যারা এআই-তে এগিয়ে থাকবে, তারাই বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেবে। কিন্তু এআই মডেল ট্রেইন করার জন্য প্রয়োজন বিপুল ডেটা। আমাদের বাংলা ভাষা এবং দেশীয় সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে এআই গড়ে তুলতে হলে আমাদের নিজস্ব ডেটা সেট প্রয়োজন। যদি আমরা আমাদের ডেটা রক্ষা করতে না পারি, তবে ভবিষ্যতে আমাদের এআই মডেলগুলো বিদেশি সংস্কৃতি ও চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হবে। এতে আমাদের জাতীয় স্বকীয়তা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি।

ভবিষ্যতের যুদ্ধগুলো আর স্থল বা আকাশে হবে না, বরং হবে সাইবার স্পেসে। সাইবার যুদ্ধে সবচেয়ে বড় লক্ষ্যবস্তু হলো ডেটা। হ্যাকাররা যদি কোনো দেশের স্বাস্থ্য বা ব্যাংক ব্যবস্থার ডেটা হাইজ্যাক করতে পারে, তবে পুরো দেশ অচল হয়ে যেতে পারে। ডেটা সার্বভৌমত্ব থাকলে আমাদের কাছে প্রতিকারের সুযোগ থাকে। কিন্তু ডেটা যদি বিদেশে থাকে, তবে সেই হ্যাকিং উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই প্রতিটি ডিজিটাল সেবার পেছনে শক্তিশালী সাইবার প্রতিরক্ষা দেয়াল থাকতে হবে।

ডেটা সার্বভৌমত্ব কেবল রাষ্ট্রের বিষয় নয়, এটি ব্যক্তির মৌলিক অধিকার। একজন নাগরিক ডিজিটাল জগতে কী করছেন, কী কিনছেন বা কার সঙ্গে কথা বলছেন, তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। কোনো তৃতীয় পক্ষ বা রাষ্ট্রও যেন বিনা অনুমতিতে এই তথ্যে প্রবেশ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করাই সার্বভৌমত্বের লক্ষ্য। নাগরিকরা যখন জানবে যে তাদের তথ্য নিরাপদ, তখন তারা ডিজিটাল সেবার ওপর আরও বেশি আস্থা পাবে। এটি একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ডিজিটাল সমাজ গঠনের অন্যতম শর্ত।

ডেটা এখন একুশ শতকের সোনা। সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করলে ডেটা থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করা সম্ভব। যদি আমাদের ডেটা আমরা প্রসেস করি, তবে দেশে বড় বড় এনালিটিক্স কোম্পানি গড়ে উঠবে। এটি নতুন প্রজন্মের জন্য হাজার হাজার কর্মসংস্থান তৈরি করবে। বিদেশি কোম্পানিগুলো আমাদের ডেটা নিয়ে আমাদেরই কাছে পণ্য বিক্রি করছে। ডেটা সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত হলে এই লভ্যাংশ আমাদের দেশেই থাকবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে। এটি আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তির নতুন পথ।

ডেটা সার্বভৌমত্ব কেবল আইন বা সার্ভার দিয়ে সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষিত জনবল। আমাদের শিক্ষার্থীদের ডেটা লিটারেসি বা ডেটা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে কীভাবে ব্যক্তিগত তথ্য রক্ষা করতে হয় এবং ডিজিটাল জগতে নিরাপদ থাকতে হয়। স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে ডেটা সায়েন্স এবং সাইবার নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। জনসচেতনতা না বাড়লে কোনো আইনই তথ্যের অপব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করতে পারবে না। সচেতন নাগরিকই হলো ডেটা সার্বভৌমত্বের প্রথম প্রহরী।

ডেটা সার্বভৌমত্ব মানে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়। এটি মূলত সমমর্যাদার ভিত্তিতে তথ্য আদান-প্রদান। অন্যান্য বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সঙ্গে ‘ডেটা শেয়ারিং অ্যাগ্রিমেন্ট’ করা যেতে পারে যেখানে উভয়ের স্বার্থ সংরক্ষিত থাকবে। ইন্টারনেটের শাসন ব্যবস্থায় বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর কণ্ঠস্বর আরও জোরালো করতে হবে। আন্তর্জাতিক সাইবার আইন ও ফোরামে আমাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে যাতে ডেটা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমরা বৈশ্বিক সমর্থন পাই। এটি একটি সমন্বিত আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার অংশ হওয়া উচিত।

ডেটা সার্বভৌমত্ব শুধু একটি প্রযুক্তিগত পরিভাষা নয়, বরং এটি একটি ডিজিটাল বিপ্লবের যুগে আত্মপরিচয় ও অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মানসিকতা ও আইনি কাঠামোকেও স্মার্ট করতে হবে।

মো. নূর হামজা পিয়াস

শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত