প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
সন্ধ্যার শহরে পুরুষেরা ঘরে ফেরে নীরব পায়ে। দিনের ক্লান্তি, ব্যর্থতার চাপ, দায়িত্বের বোঝা- সব মিলিয়ে তাদের কাঁধ ভারী হয়ে ওঠে। তবু সমাজ তাদের শিখিয়েছে, পুরুষ মানে শক্ত থাকা, কথা কম বলা, চোখের জল লুকিয়ে রাখা। দুর্বলতা এখানে অপরাধ, আবেগ এখানে বিলাসিতা। ঠিক এই নির্মিত পুরুষত্বের ভেতরেই ফেমিনিজমকে দাঁড় করানো হয় শত্রু হিসেবে- যেন নারীর অধিকার মানেই পুরুষের ক্ষতি।
এই ভুল বোঝাবুঝির মূলেই রয়েছে ‘ফেমিনিজম বনাম পুরুষত্ব’ নামের এক ভ্রান্ত ফ্রেম। ফেমিনিজম কোনো লিঙ্গের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়; এটি একটি সামাজিক আন্দোলন, যা ক্ষমতার অসম বণ্টন ও কাঠামোগত বৈষম্যের প্রশ্ন তোলে। কিন্তু আমাদের সমাজে ফেমিনিজমকে প্রায়ই এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন এটি পুরুষত্ব ভেঙে দেওয়ার ষড়যন্ত্র। ফলে অনেক পুরুষ স্বাভাবিকভাবেই আত্মরক্ষামূলক হয়ে ওঠে, যুক্তির জায়গা দখল করে নেয় ক্ষোভ ও ভয়।
বাস্তবতা হলো- পুরুষত্বের যে সংজ্ঞা সমাজ তৈরি করেছে, সেটাই পুরুষের সবচেয়ে বড় শত্রু। যে সংজ্ঞা বলে, পুরুষ মানেই উপার্জনের যন্ত্র, সিদ্ধান্তের ভারবাহক, আবেগহীন অভিভাবক। এই কাঠামো পুরুষকে সাহায্য চাইতে শেখায় না, মানসিক কষ্ট প্রকাশ করতে দেয় না। ফলে হতাশা, একাকিত্ব, মানসিক অবসাদ নীরবে জমতে থাকে। ফেমিনিজম যখন এই কাঠামোর সমালোচনা করে, তখন তা পুরুষকে আঘাত করতে নয়- বরং তাকে এই নীরব বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করতেই।
ফেমিনিজম পুরুষকে ক্ষমতা ছাড়তে নয়, বরং অমানবিক প্রত্যাশার বোঝা নামাতে বলে। এটি বলে- পুরুষও কাঁদতে পারে, ভয় পেতে পারে, ব্যর্থ হতে পারে। এসব স্বীকার করাই তাকে দুর্বল করে না; বরং মানুষ করে তোলে। কিন্তু আমরা যখন ফেমিনিজমকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার রিং বানাই, তখন সমতার ভাষা হারিয়ে যায়।
ফেমিনিজম বনাম পুরুষত্ব নয়- প্রয়োজন ফেমিনিজম ও মানবত্ব। কারণ সমতা কোনো পক্ষের পরাজয় নয়, বরং এমন এক সমাজের সম্ভাবনা, যেখানে নারী-পুরুষ উভয়েই একটু স্বস্তিতে মানুষ হয়ে বাঁচতে পারে।
ফেমিনিজমকে পুরুষের শত্রু হিসেবে দেখার প্রধান কারণ হলো ভুল ব্যাখ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভীতি তৈরি। আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে লিঙ্গসম্পর্কিত আলোচনা ‘জয়-পরাজয়’-এর ফ্রেমে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে নারীর অধিকার নিয়ে কথা উঠলেই অনেকের মনে হয়, পুরুষ বুঝি তার জায়গা হারাতে বসেছে। এই ভয়ের উৎস আসলে ফেমিনিজম নয়, বরং পুরুষত্ব নিয়ে সমাজে প্রচলিত একচেটিয়া ধারণা।
আরেকটি বড় কারণ হলো পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুবিধাভোগী কাঠামো। এই ব্যবস্থা পুরুষকে কিছু সামাজিক সুবিধা দিলেও তার বিনিময়ে চাপিয়ে দেয় কঠোর দায়িত্ব ও নীরবতা। ফেমিনিজম যখন এই কাঠামোর সমালোচনা করে, তখন সুবিধা হারানোর আশঙ্কা থেকেই অনেক পুরুষ একে ব্যক্তিগত আক্রমণ মনে করে। অথচ ফেমিনিজম মূলত সেই ব্যবস্থাকেই প্রশ্ন করে, যা নারীকে অবদমিত করে এবং পুরুষকে আবেগহীন যন্ত্রে পরিণত করে।
সোশ্যাল মিডিয়া ও চরমপন্থী বক্তব্যও এই ভুল ধারণাকে আরও উসকে দেয়। বিচ্ছিন্ন কিছু উগ্র বক্তব্য বা ‘সব পুরুষ খারাপ’ ধরনের মন্তব্যকে ফেমিনিজমের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরা হয়। ফলে আন্দোলনের মূল দর্শন আড়ালে পড়ে যায়। যুক্তিনির্ভর আলোচনা না হয়ে আবেগনির্ভর প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, যা বিভাজনকে আরও গভীর করে।
শিক্ষাব্যবস্থায় লিঙ্গসমতা ও ফেমিনিজম নিয়ে সুসংগঠিত আলোচনা না থাকাও একটি বড় কারণ। ফলে ফেমিনিজম অনেকের কাছে বইয়ের ধারণা নয়, বরং শোনা কথার ভীতিকর সংস্করণ হয়ে ওঠে। অজানা বিষয় নিয়ে ভয় তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
সবচেয়ে বড় কারণ হলো- আমরা এখনও পুরুষত্বকে মানবিকভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারিনি। শক্ত, কর্তৃত্বশীল ও আবেগহীন পুরুষের যে ধারণা সমাজ লালন করে, ফেমিনিজম সেটার বিপরীতে দাঁড়ায় বলেই একে শত্রু মনে হয়। অথচ ফেমিনিজম আসলে সেই ধারণাকেই ভাঙতে চায়, যা নারী ও পুরুষ- উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।
ফেমিনিজমকে ঘিরে সবচেয়ে বড় সমস্যাটি হলো- এটি এখনও সমাজে ভুলভাবে বোঝা ও উপস্থাপিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ফেমিনিজমকে সমতার আন্দোলন না ভেবে পুরুষবিরোধী মতাদর্শ হিসেবে চিত্রিত করা হয়। এই ভুল ধারণা সমাজে অকারণ বিভাজন সৃষ্টি করে, যেখানে নারী ও পুরুষ একে অপরকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শুরু করে।
আরেকটি গুরুতর সমস্যা হলো উগ্র ও অসম্পূর্ণ বক্তব্যের প্রাধান্য। কিছু চরমপন্থী মতামত বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো আক্রমণাত্মক ভাষা পুরো ফেমিনিস্ট আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করে বলে ধরে নেওয়া হয়। এতে ফেমিনিজমের মূল দর্শন- সমতা, ন্যায়বিচার ও মানবিকতা- আড়ালে পড়ে যায়। যুক্তিনির্ভর আলোচনা হারিয়ে গিয়ে জায়গা নেয় আবেগ ও বিদ্বেষ।
সমস্যার আরেক দিক হলো পুরুষদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও প্রতিরোধমূলক মানসিকতা। দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক সুবিধাভোগী অবস্থানে থাকার কারণে অনেক পুরুষ মনে করে, ফেমিনিজম তাদের অধিকার খর্ব করবে। এই ভয় থেকেই তারা আলোচনায় অংশ নেওয়ার বদলে দূরে সরে যায় বা প্রতিকূল অবস্থান নেয়। ফলে সংলাপের সুযোগ নষ্ট হয়।
শিক্ষা ও পারিবারিক পরিবেশেও লিঙ্গসমতা নিয়ে সুস্পষ্ট আলোচনা অনুপস্থিত। ছোটবেলা থেকেই ছেলে ও মেয়েদের আলাদা প্রত্যাশার মধ্যে বড় করা হয়। এই বিভাজিত সামাজিকীকরণ পরিণত বয়সে ভুল ধারণাকে আরও শক্ত করে তোলে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো- আমরা ফেমিনিজম ও পুরুষত্বকে একই মানবিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখতে শিখিনি। একটিকে অন্যটির বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার ফলে সমতার মূল লক্ষ্য হারিয়ে যাচ্ছে। এই সমস্যাগুলো সমাধান না হলে ফেমিনিজম ও পুরুষত্বের মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়বে, আর সমাজ ক্রমেই দ্বন্দ্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ফেমিনিজম ও পুরুষত্বকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর ভুল প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে প্রথমেই প্রয়োজন সঠিক ব্যাখ্যা ও সচেতন সংলাপ। ফেমিনিজমকে নারীবিরোধী বা পুরুষবিরোধী নয়, বরং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। গণমাধ্যম, লেখালেখি ও সামাজিক আলোচনায় দায়িত্বশীল ভাষার ব্যবহার এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শিক্ষাব্যবস্থায় লিঙ্গসমতা ও জেন্ডার স্টাডিজকে আরও বাস্তব ও মানবিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। পাঠ্যবইয়ে শুধু তাত্ত্বিক সংজ্ঞা নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে হবে- কীভাবে পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো নারী ও পুরুষ উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। এতে ফেমিনিজম ভয় নয়, বোঝাপড়ার বিষয় হয়ে উঠবে।
পুরুষদের আলোচনায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধান। ফেমিনিজমের আলোচনাকে যদি শুধু নারীর বিষয় হিসেবে দেখা হয়, তবে পুরুষদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হবে। পুরুষদের অভিজ্ঞতা, মানসিক চাপ ও সামাজিক প্রত্যাশার কথাও আলোচনায় আনতে হবে। এতে তারা প্রতিপক্ষ নয়, বরং সহযোদ্ধা হিসেবে নিজেদের দেখতে শিখবে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় উগ্র ও বিভাজনমূলক ভাষার বদলে যুক্তিনির্ভর ও সহানুভূতিশীল কথাবার্তা প্রয়োজন। মতভেদ থাকলেও ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, সমস্যার কাঠামোগত দিক নিয়ে আলোচনা করতে হবে। একই সঙ্গে চরমপন্থী বক্তব্যকে পুরো আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করতে না দেওয়ার সামাজিক সচেতনতাও গড়ে তুলতে হবে।
সবশেষে, পুরুষত্বের সংজ্ঞাকে মানবিকভাবে পুননির্মাণ করা জরুরি। শক্তির সঙ্গে সংবেদনশীলতা, দায়িত্বের সঙ্গে সহমর্মিতা যুক্ত হলেই সমতার পথ প্রশস্ত হবে। ফেমিনিজম ও পুরুষত্ব তখন আর প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে না, বরং একটি ন্যায্য সমাজ গঠনের যৌথ ভাষা হয়ে উঠবে।
ফেমিনিজম ও পুরুষত্বকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখার প্রবণতা আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটগুলোর একটি। এই বিতর্কে আমরা বারবার ভুল প্রশ্ন করি- কে জিতবে, কে হারবে। অথচ আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত- এই কাঠামো কাদের ক্ষতি করছে, আর কাদের মুক্তি দিতে পারে। আমার মতে, ফেমিনিজমকে যদি পুরুষের শত্রু ভাবা হয়, তবে তা শুধু আন্দোলনের ভুল ব্যাখ্যাই নয়, বরং পুরুষত্বের প্রতি গভীর অনাস্থারও প্রকাশ।
ফেমিনিজম পুরুষকে তার মানবিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায় না; বরং সমাজ যে অমানবিক প্রত্যাশার বোঝা তার কাঁধে চাপিয়েছে, তা নামিয়ে দিতে চায়। পুরুষকে সবসময় শক্ত, কর্তৃত্বশীল ও আবেগহীন থাকার যে চাপ দেওয়া হয়, সেটি যেমন নারীর স্বাধীনতার পথে বাধা, তেমনি পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর। এই সত্য অস্বীকার করে ফেমিনিজমকে শত্রু বানানো মানে সমস্যার মূল থেকে চোখ সরিয়ে নেওয়া।
ফেমিনিজমকে বুঝতে হলে আগে পুরুষত্বকে প্রশ্ন করতে হবে। প্রশ্ন করতে হবে- কেন পুরুষ কাঁদতে পারবে না, কেন সাহায্য চাওয়া লজ্জার, কেন ব্যর্থতা মানেই পুরুষত্ব হারানো। এই প্রশ্নগুলো নারীর বিরুদ্ধে নয়, পুরুষের বিরুদ্ধেও নয়; এগুলো এক বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। ফেমিনিজম সেই ব্যবস্থাকেই চ্যালেঞ্জ করে।
ফেমিনিজম বনাম পুরুষত্ব নয়- প্রয়োজন ফেমিনিজম ও মানবিক পুরুষত্বের সহাবস্থান। সমতা কোনো শূন্য-সম খেলা নয়, যেখানে এক পক্ষ জিতলে অন্য পক্ষ হারবে। বরং এটি এমন একটি সামাজিক রূপান্তর, যেখানে নারী ও পুরুষ উভয়েই আরও স্বাধীনভাবে, আরও মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার সুযোগ পায়। এই সত্য যত দ্রুত আমরা মেনে নেব, তত দ্রুত ভুল ফ্রেমের বিতর্ক ভেঙে পড়বে, আর জায়গা করে নেবে সংলাপ, সহমর্মিতা ও সমতার ভাষা।
সানিয়া তাসনিম লামিয়া
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়