প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
‘এত কষ্ট করেও চান্স হলো না কেন?’- এই একটি প্রশ্নই অনেক শিক্ষার্থীর কাছে হয়ে ওঠে তীরের মতো ধারালো। বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার মৌসুম এলেই বাংলাদেশে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়- কখনও আত্মীয়ের কাছ থেকে, কখনও প্রতিবেশীর, কখনও নিজের পরিবারের ভেতর থেকেই। অথচ কেউ জানতে চায় না, সেই কষ্টের ওজন কতটা, কিংবা একটি পরীক্ষার ফলই কি একজন মানুষের সামগ্রিক মূল্য নির্ধারণ করে দিতে পারে?
বাংলাদেশে প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয় কয়েক লাখ শিক্ষার্থী। কিন্তু আসনসংখ্যা তার তুলনায় অত্যন্ত সীমিত। ফলাফল ঘোষণার পরপরই দেখা যায়- হতাশা, অবসাদ, আত্মদোষারোপ এবং ভয়ংকরভাবে আত্মহত্যার খবর। সংবাদপত্রে ছোট্ট একটি খবর হয়তো ছাপা হয়- ভর্তি পরীক্ষায় ফেল করায় শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা; কিন্তু সেই লাইনের আড়ালে চাপা পড়ে যায় একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন আর একটি সম্ভাবনার মৃত্যু।
সমস্যাটি শুধু শিক্ষার্থীর নয়, এটি আমাদের সামাজিক মানসিকতারও প্রতিফলন। আমরা এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করেছি, যেখানে সফলতা মানে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে চান্স পাওয়া, আর ব্যর্থতা মানে জীবনের সব দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া। বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন, এমনকি শিক্ষকরাও অনেক সময় অজান্তেই শিক্ষার্থীর ওপর এমন চাপ তৈরি করেন, যা সে বইয়ের চেয়ে বেশি ভারী মনে করে। ‘অমুকের ছেলে মেডিকেলে চান্স পেয়েছে’, ‘তুমি না পারলে আমরা মুখ দেখাব কীভাবে’ এই কথাগুলো পরীক্ষার হলের চেয়েও ভয়ানক হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে মেডিকেল ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা এখন আর শুধু পরীক্ষা নয়, এটি এক ধরনের মানসিক যুদ্ধ। কোচিং সেন্টারনির্ভর প্রস্তুতি, আর্থিক চাপ, রাত জেগে পড়াশোনা, সামাজিক প্রত্যাশা- সব মিলিয়ে একজন শিক্ষার্থী ধীরে ধীরে নিজের স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলাফল প্রত্যাশা মতো না হলে তার মনে হয়- সে ব্যর্থ, সে অযোগ্য, সে বোঝা। এই অনুভূতিই অনেক সময় তাকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো- একটি ভর্তি পরীক্ষা কখনোই একজন মানুষের সক্ষমতা বা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা তথাকথিত ‘চান্স’ পাননি, কিন্তু পরবর্তীতে নিজেদের জায়গা তৈরি করেছেন দক্ষতা, পরিশ্রম ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমরা সেই গল্পগুলো খুব কমই বলি। আমরা ব্যর্থতার গল্পকে লজ্জা বানাই, আর সফলতাকে অস্বাভাবিক উচ্চতায় তুলে ধরি।
এখানে রাষ্ট্র ও শিক্ষাব্যবস্থার দায়ও কম নয়। উচ্চশিক্ষার সুযোগ সীমিত রেখে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, বিকল্প পথ সম্পর্কে পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনা না দেওয়া, মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে অবহেলা করা—সবকিছু মিলিয়ে আমরা নিজেরাই এই সংকট তৈরি করছি। একটি দেশে যদি হাজারো শিক্ষার্থী চান্স না পেয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেয়, তবে সেটি ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; সেটি একটি সামাজিক ব্যর্থতা।
এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রথমেই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। অভিভাবকদের বুঝতে হবে- সন্তানের জীবন কোনো পরীক্ষার ফলের চেয়েও মূল্যবান। শিক্ষকদের ভূমিকা হতে হবে সহানুভূতিশীল ও বাস্তবমুখী। আর সমাজকে শিখতে হবে প্রশ্ন করার আগে অনুভব করতে- একটি প্রশ্নও যে কারও জীবনের শেষ প্রশ্ন হয়ে যেতে পারে।
সবচেয়ে জরুরি হলো- শিক্ষার্থীদের জানানো, ‘তুমি একা নও।’ ব্যর্থতা মানেই শেষ নয়, বরং এটি নতুন পথ খোঁজার সুযোগ। প্রয়োজন মানসিক সমর্থন, কথা বলার জায়গা এবং এমন একটি পরিবেশ, যেখানে ব্যথা লুকাতে নয়- ভাগ করতে শেখানো হয়। এই সময় অভিভাবকদের উচিত তুলনার সংস্কৃতি থেকে সরে আসা। আত্মীয়স্বজনের সন্তানের সঙ্গে তুলনা, সামাজিক চাপের কথা তুলে ধরা কিংবা কোচিংনির্ভর সাফল্যকে একমাত্র মানদণ্ড বানানো শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়। মনে রাখতে হবে, প্রতিটি সন্তান আলাদা, তার সক্ষমতা, আগ্রহ ও সময়রেখাও আলাদা। একটি ভর্তি পরীক্ষা কখনোই সন্তানের ভবিষ্যৎ কিংবা চরিত্র নির্ধারণ করে না।
প্রতিবছরের ন্যায় এবছর ও শুরু হয়ে গেছে ভর্তি পরীক্ষার যুদ্ধ। কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও নার্সিং প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা এরই মধ্যে শেষ হয়েছে, সামনে রয়েছে আরও বহু প্রতিযোগিতামূলক ধাপ। এই সময়টাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন পিতা-মাতা। কারণ একজন শিক্ষার্থী শুধু প্রশ্নপত্রের সঙ্গে লড়াই করে না; সে লড়াই করে ভয়, প্রত্যাশা, তুলনা আর ব্যর্থতার আশঙ্কার সঙ্গেও। পরীক্ষার ফল যাই হোক না কেন, সন্তানের পাশে দাঁড়ানোই এই সময়ের প্রধান অভিভাবকীয় দায়িত্ব।
ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার দিনে আমাদের উচিত আনন্দের পাশাপাশি সংযমী হওয়া, আর যারা পারেনি- তাদের জন্য নীরব সমর্থন রাখা। এই সময় অভিভাবকদের উচিত তুলনার সংস্কৃতি থেকে সরে আসা। আত্মীয়স্বজনের সন্তানের সঙ্গে তুলনা, সামাজিক চাপের কথা তুলে ধরা কিংবা কোচিংনির্ভর সাফল্যকে একমাত্র মানদণ্ড বানানো শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়। মনে রাখতে হবে, প্রতিটি সন্তান আলাদা, তার সক্ষমতা, আগ্রহ ও সময়রেখাও আলাদা। একটি ভর্তি পরীক্ষা কখনোই সন্তানের ভবিষ্যৎ কিংবা চরিত্র নির্ধারণ করে না। সর্বোপরি মনে রাখতে হবে- একটি জীবন হারিয়ে গেলে, কোনো চান্সই আর মূল্য রাখে না। একটি জীবন বাঁচানো, একটি পরীক্ষায় চান্স পাওয়ার চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সুমাইয়া সিরাজ সিমি
শিক্ষার্থী : গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়