প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
দীঘ প্রতীক্ষা আর নাটকীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অবশেষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল আমাদের সামনে। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের মানুষ শুধু তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেনি, বরং একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠনের পথে রয়েছে। একই সঙ্গে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন নিয়ে প্রধান বিরোধীদল হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচনের এই ফল এবং পরবর্তী সরকার গঠনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ।
যেকোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনই হলো জনমতের প্রধান প্রতিফলন। এবারের নির্বাচনে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং ফলাফলের বৈচিত্র্য প্রমাণ করে যে, দেশের মানুষ রাষ্ট্রব্যবস্থায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও কার্যকর সংসদ দেখতে চায়। বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পাওয়ায় তাদের ওপর জনগণের প্রত্যাশার পাহাড়সম চাপ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর শক্তিশালী অবস্থান সংসদে গঠনমূলক সমালোচনার পথ প্রশস্ত করবে বলে আশা করা যায়। তবে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় দ্রুততম সময়ে একটি স্থিতিশীল ও কার্যকর সরকার গঠন করা।
আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ এবং ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের সম্ভাবনা রয়েছে। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এই দ্রুততা অত্যন্ত জরুরি। একটি রাষ্ট্র যখন অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায় থেকে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে, তখন প্রশাসনিক ও আইনি কিছু জটিলতা দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে, বর্তমানে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পদ নিয়ে যে সাংবিধানিক ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে সংবিধানের বিশেষ বিধান অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তির মাধ্যমে শপথ পাঠ করানোর যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা সময়োপযোগী। রাষ্ট্রের কোনো অঙ্গ যেন মুহূর্তের জন্যও নেতৃত্বহীন না থাকে, সেটি নিশ্চিত করাই এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
নতুন সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে রাষ্ট্র সংস্কার এবং ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরায় সচল করা। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পটপরিবর্তনের প্রভাবে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় যে স্থবিরতা নেমে এসেছিল, তা কাটিয়ে উঠতে হলে একটি শক্তিশালী মন্ত্রিসভার বিকল্প নেই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের মধ্য দিয়ে উপদেষ্টা পরিষদের দায়িত্ব শেষ হবে। এই উত্তরণ যেন মসৃণ হয়, সেদিকে রাজনৈতিক দলগুলোকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, সরকার গঠন করা যতটা না রাজনৈতিক বিজয়, তার চেয়ে অনেক বেশি বড় দায়িত্ব হলো জনগণের আমানত রক্ষা করা।
বিগত বছরগুলোতে দেশের মানুষ সুশাসন ও জবাবদিহিতার যে অভাব বোধ করেছে, নতুন সরকারের কাছে তাদের প্রথম দাবি হবে একটি স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থা। বিএনপি যেহেতু একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, তাই তাদের কাঁধে দায়িত্ব অনেক বেশি। বিশেষ করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে সম্ভাব্য নতুন সরকার কীভাবে বিরোধী দলগুলোকে আস্থায় নিয়ে সংসদ পরিচালনা করে, সেটিই হবে তাদের রাজনৈতিক পরিপক্কতার পরীক্ষা। একটি শক্তিশালী বিরোধীদল ছাড়া সংসদ কখনও প্রাণবন্ত হয় না। জামায়াতে ইসলামী যদি প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা পায়, তবে তাদের দায়িত্ব হবে শুধু বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা না করে জাতীয় স্বার্থে সরকারকে সঠিক পথে রাখা।
নতুন সরকার গঠনের এই ক্ষণটি শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং এটি রাষ্ট্র মেরামতের এক সুবর্ণ সুযোগ। মন্ত্রিসভার আকার কত বড় হবে বা কারা মন্ত্রী হবেন- তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তারা কতটা দেশপ্রেম ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন। যানবাহন প্রস্তুত রাখা বা বঙ্গভবনের জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের চেয়েও জরুরি হলো সাধারণ মানুষের ডাল-ভাতের সংস্থান এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা। আমরা আশা করি, আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে একটি দক্ষ ও যোগ্যতাসম্পন্ন মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করবে এবং বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে। জনগণের রায়কে সম্মান জানিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনই হোক নতুন সরকারের মূল অঙ্গীকার।