প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
একটি জাতির জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন হলো তার গণতান্ত্রিক অধিকার। আর এই অধিকার প্রয়োগের সবচেয়ে বড় মহোৎসব হলো নির্বাচন। তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ‘নির্বাচন’ বা ‘গণতান্ত্রিক রূপান্তর’ শব্দটি সামনে এলেই জনমনে আশার পাশাপাশি এক ধরনের অজানা শঙ্কাও দানা বাঁধে। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ক্ষমতার পরিবর্তন বা গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষার পথে বারবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সংঘাত, সহিংসতা আর অসহিষ্ণুতা। আজ সময় এসেছে সেই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার। আমাদের সম্মিলিত প্রার্থনা ও অঙ্গীকার হওয়া উচিত- ‘গণতন্ত্রের এই যাত্রা শান্তিপূর্ণ হোক’।
গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট দেওয়া নয়; গণতন্ত্র হলো ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন। একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আদর্শিক লড়াই থাকবে, কিন্তু তা যেন কখনোই ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা বা দাঙ্গা-হাঙ্গামায় রূপ না নেয়। যখন একটি পক্ষ অন্য পক্ষকে শত্রু হিসেবে গণ্য করতে শুরু করে, তখন গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিটিই নড়বড়ে হয়ে যায়। রাজনৈতিক দলগুলোকে বুঝতে হবে যে, প্রতিদ্বন্দ্বী মানেই শত্রু নয়। সুস্থ প্রতিযোগিতা ও রাজপথের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানই একটি রাষ্ট্রকে বিশ্বদরবারে মর্যাদাপূর্ণ করে তোলে।
সহিংস রাজনীতি শুধু মানুষের জানমালের ক্ষতি করে না, বরং দেশের অর্থনীতি ও তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দেয় এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিপন্ন করে তোলে। বিশেষ করে সাধারণ দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং শিক্ষার্থীরাই এই অস্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় শিকার হয়। রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যে ক্ষমতা অর্জিত হয়, তা কোনোদিন টেকসই শান্তি বয়ে আনতে পারে না। একটি শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক যাত্রার জন্য সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রধান দায়িত্ব হলো কর্মীদের মধ্যে উস্কানি না ছড়িয়ে শান্তির বার্তা পৌঁছে দেওয়া। রাজপথের শক্তি প্রদর্শন যেন জানমালের ক্ষতির কারণ না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। জনগণের আস্থা অর্জন করতে না পারলে কোনো প্রক্রিয়াই সম্পূর্ণভাবে সফল হয় না। সঠিক সংবাদ পরিবেশন এবং গুজব রোধে গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কোনো পক্ষকে অহেতুক সুবিধা না দিয়ে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মাধ্যমে শান্তির বাতাবরণ তৈরি করা তাদের দায়িত্ব। সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে। কোনো ধরনের প্ররোচনা বা উস্কানিতে কান না দিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় শান্তভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে হবে। আজকের তরুণ প্রজন্ম সংঘাতের রাজনীতি চায় না। তারা চায় কর্মসংস্থান, শিক্ষা এবং একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ। তাদের কাছে গণতন্ত্র মানে হলো কথা বলার স্বাধীনতা এবং মেধার মূল্যায়ন। যদি রাজনৈতিক ময়দান সহিংস থাকে, তবে মেধাবী তরুণরা রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের নেতৃত্বের জন্য বড় সংকট তৈরি করবে। তরুণদের এই আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান জানিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে সমঝোতা ও শান্তির পথে হাঁটতে হবে।
গণতন্ত্র কোনো গন্তব্য নয়, বরং এটি একটি নিরন্তর যাত্রা। এই যাত্রাপথ যত কণ্টকমুক্ত হবে, রাষ্ট্র হিসেবে আমরা তত বেশি শক্তিশালী হবো। অতীতে আমরা অনেক রক্ত ঝরতে দেখেছি, অনেক মা-বোনের আহাজারি শুনেছি। আমরা আর সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোতে ফিরে যেতে চাই না। ক্ষমতার পালাবদল বা রাজনৈতিক সংস্কার- সবই হোক নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে।
আসুন, আমরা একে অপরের প্রতি সহমর্মী হই। বিভেদ ভুলে সংলাপ এবং সহাবস্থানের সংস্কৃতি গড়ে তুলি। কারণ দিনশেষে আমাদের একটাই পরিচয়- আমরা বাংলাদেশি। দেশের স্বার্থকে ব্যক্তি বা দলের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়ে একটি সুন্দর, শান্তিময় এবং স্থিতিশীল গণতন্ত্র উপহার দেওয়াই হোক বর্তমান সময়ের প্রধান অঙ্গীকার। শান্তিপূর্ণ হোক গণতন্ত্রের এই যাত্রা, জয় হোক সাধারণ মানুষের।