প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
রমজান এলে ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ আসে। সন্ধ্যার আজান, ইফতারের টেবিলে খেজুর আর পানির গ্লাস, পরিবারের মুখে অপেক্ষার হাসি; সব মিলিয়ে এক প্রশান্তির মাস। অথচ এই পবিত্র মাসেই প্রতিবছর এক অদ্ভুত অস্থিরতা আমাদের সমাজকে গ্রাস করে। বাজারের থলেতে হাত ঢোকাতে গেলে বুকের ভেতর ধকধক করে ওঠে; নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম যেন নীরবে, কিন্তু নির্মমভাবে, মানুষের সাধ্যের সীমানা অতিক্রম করে যায়। রমজানের সংযম তখন কেবল ধর্মীয় অনুশাসন নয়, অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতাও হয়ে দাঁড়ায়।
এমনই এক বিকালে শহরের কোনো এক মোড়ে দেখা যায় লম্বা লাইন। মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, কারও হাতে ছেঁড়া ব্যাগ, কারও কাঁধে দিনের ক্লান্তি। সরকারি ভর্তুকির পণ্য নিতে আসা সেই ভিড়ে হঠাৎ অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে; সামনে থাকা ট্রাকটি একটু নড়তেই পেছন থেকে কেউ দৌড় দেয়, কেউ হাত বাড়ায়, কেউ পিছলে পড়ে যায়। কেউ হয়তো উঠে দাঁড়ায়, কেউ আঘাত পায়; দৃশ্যটি দ্রুত মিলিয়ে যায় শহরের কোলাহলে। কিন্তু প্রশ্নটি থেকে যায়; কেন একজন মানুষকে একটি ট্রাকের পেছনে এমন দৌড়াতে হয়? এই দৌড় কি শুধু কয়েক কেজি চাল-ডালের জন্য, নাকি এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আমাদের সময়ের গভীর অর্থনৈতিক অসাম্য!
রমজানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আমাদের দেশে নতুন নয়। চাহিদা বাড়ে, এটি অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু এই চাহিদাকে পুঁজি করে যদি কৃত্রিমসংকট তৈরি হয়, মজুতদারি বাড়ে, বাজারে নজরদারির ঘাটতি থাকে, তবে সেই নিয়ম নিষ্ঠুর রূপ নেয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়া, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির মূল্য সমন্বয়- এসব বাস্তব কারণ অবশ্যই আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন সেই চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে সবচেয়ে বেশি পড়ে দিনমজুর, রিকশাচালক, নিম্নমধ্যবিত্ত চাকরিজীবীর ঘাড়ে। কেন বাজারে গিয়ে তারা হিসাব মিলাতে পারেন না!
একজন নিম্ন আয়ের মানুষ যখন রোজার মাসে বাড়তি খরচের চাপ সামলায়, তখন সে শুধু খাবারের দামই মেটায় না; সে সামাজিক মর্যাদারও হিসাব রাখে। ইফতারের টেবিলে অন্তত সামান্য বৈচিত্র্য রাখতে চায়, সন্তানদের মুখে হাসি দেখতে চায়। কিন্তু যখন পেঁয়াজ, তেল, ডাল, চিনি- সবকিছুর দাম একসাথে বাড়তে থাকে, তখন তার ভেতরের আত্মসম্মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করা, অল্প মূল্যে কিছু পাওয়ার আশায় ভিড়ের মধ্যে ঠেলাঠেলি। এসব শুধু অর্থনৈতিক ঘটনা নয়; এগুলো মানুষের ভেতরের অস্বস্তি ও বঞ্চনার প্রকাশ। সমস্যার মূলে রয়েছে বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। নিয়মিত মনিটরিংয়ের অভাব, পর্যাপ্ত শাস্তির অনুপস্থিতি, তথ্যের অস্বচ্ছতাণ্ড সব মিলিয়ে একটি অস্থির পরিবেশ তৈরি হয়। যখন সরকার ভর্তুকি দিয়ে পণ্য সরবরাহ করে, তা নিঃসন্দেহে স্বস্তি আনে। কিন্তু যদি সেই সরবরাহ সীমিত হয়, আর চাহিদা বিপুল, তবে সেখানে বিশৃঙ্খলার ঝুঁকি থেকেই যায়। মানুষ তখন ভিড় করে, কারণ তার ভেতরে অনিশ্চয়তা কাজ করে, আজ না পেলে কাল হয়তো আর পাবে না।
এ অবস্থায় করণীয় কী? প্রথমত, বাজারে কার্যকর নজরদারি জোরদার করা জরুরি। মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট তৈরির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও বিকেন্দ্রীকরণ করা প্রয়োজন, যাতে একটি নির্দিষ্ট স্থানে অতিরিক্ত ভিড় না হয়। তৃতীয়ত, স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য টার্গেটেড সহায়তা, ডিজিটাল কার্ড বা নির্দিষ্ট নিবন্ধনের মাধ্যমে দেওয়া গেলে বিশৃঙ্খলা কমানো সম্ভব। চতুর্থত, দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সংরক্ষণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও আমদানি নীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, রমজানের চেতনা কেবল ব্যক্তিগত সংযমে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; এটি সামাজিক ন্যায়ের আহ্বানও। ব্যবসায়ীদের দায়িত্ব আছে নৈতিকতার, প্রশাসনের দায়িত্ব আছে কার্যকারিতার, আর আমাদের সবার দায়িত্ব আছে সহমর্মিতার। যে মানুষটি লাইনে দাঁড়িয়ে আছে, সে ভিক্ষা চাইছে না; সে তার ন্যায্য অধিকার চায়, সামর্থ্যরে মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনার অধিকার। একটি ট্রাকের পেছনে দৌড়ে পড়ে যাওয়ার দৃশ্য হয়তো ক্ষণিকের; কিন্তু সেটি আমাদের সময়ের এক নির্মম প্রতীক। আমরা যদি চাই, এই প্রতীকটিকে বদলে দিতে পারি। সুশাসন, ন্যায্য বাজারব্যবস্থা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি একসঙ্গে কাজ করলে রমজান আবার সত্যিকার অর্থেই প্রশান্তির মাস হয়ে উঠতে পারে; যেখানে সংযম থাকবে; কিন্তু অপমান থাকবে না; ভিড় থাকবে, কিন্তু আতঙ্ক থাকবে না; অপেক্ষা থাকবে, কিন্তু নাভিশ্বাস থাকবে না।
আরিফুল ইসলাম রাফি
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়