ঢাকা শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৮ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ভূমিকম্পের অদৃশ্য হুমকিতে বাংলাদেশ

রাহমান তৈয়ব
ভূমিকম্পের অদৃশ্য হুমকিতে বাংলাদেশ

বাংলাদেশকে আমরা সাধারণত বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবেই বেশি জানি। কিন্তু সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বলছে, বাংলাদেশ ভূমিকম্পের দিক থেকেও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। ভূতাত্ত্বিক অবস্থান, ভূগর্ভস্থ সক্রিয় ফল্ট লাইন, ঘনবসতি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দুর্বল অবকাঠামো- এসব মিলিয়ে দেশটি একটি সম্ভাব্য বড় ভূমিকম্পের জন্য সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে। ফলে এখনই যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে বাংলাদেশ।

প্রথমত, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানই দেশটিকে ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। পৃথিবীর ভূত্বক মূলত কয়েকটি টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত। বাংলাদেশ অবস্থিত ভারতীয় প্লেট, ইউরেশীয় প্লেট এবং বার্মা মাইক্রোপ্লেটের সংযোগস্থলের কাছে। এই প্লেটগুলোর পারস্পরিক সংঘর্ষ ও গতিশীলতার ফলে ভূগর্ভে বিপুল শক্তি জমা হতে থাকে, যা একসময় ভূমিকম্প হিসেবে মুক্তি পায়। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত সক্রিয় ফল্ট লাইনগুলো বাংলাদেশের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের চারপাশে বেশ কয়েকটি বড় ভূতাত্ত্বিক ফল্ট লাইন রয়েছে। এর মধ্যে ডাউকি ফল্ট, মধুপুর ফল্ট এবং চট্টগ্রাম-ত্রিপুরা ফল্ট উল্লেখযোগ্য। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব ফল্ট লাইন দীর্ঘদিন ধরে শক্তি সঞ্চয় করে আছে এবং যেকোনো সময় বড় ধরনের ভূমিকম্পের কারণ হতে পারে। ১৮৯৭ সালের শিলং ভূমিকম্প কিংবা ১৯১৮ সালের শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প এই অঞ্চলের ভূমিকম্পীয় সক্রিয়তার ঐতিহাসিক উদাহরণ। এই ধরনের শক্তিশালী ভূমিকম্প পুনরাবৃত্তি হলে বাংলাদেশের বড় শহরগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশের মাটি ও ভূগঠনও ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। দেশের অধিকাংশ অঞ্চলই নদীবাহিত নরম পলিমাটি দ্বারা গঠিত। ভূমিকম্পের সময় এই ধরনের মাটি সহজেই দুলে ওঠে এবং অনেক ক্ষেত্রে ‘লিকুইফ্যাকশন’ নামক বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার সৃষ্টি হয়, যেখানে মাটি তরলের মতো আচরণ করতে শুরু করে। ফলে ভবন, সেতু কিংবা অন্যান্য অবকাঠামো সহজেই ধসে পড়তে পারে। ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে এই ঝুঁকি বিশেষভাবে বেশি।

চতুর্থত, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দুর্বল নির্মাণব্যবস্থা ভূমিকম্পের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে প্রতিনিয়ত বহুতল ভবন নির্মিত হচ্ছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ভূমিকম্প সহনশীল নকশা বা বিল্ডিং কোড যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, প্রকৌশল তদারকির অভাব এবং অনুমোদনহীন ভবন নির্মাণের ফলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প ঘটলে এসব ভবন ধসে পড়ে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি করতে পারে। পঞ্চমত, বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম বেশি। সীমিত জায়গার মধ্যে বিপুল সংখ্যক মানুষের বসবাসের কারণে যেকোনো বড় দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি দ্রুত বেড়ে যায়। বিশেষ করে পুরান ঢাকা, চট্টগ্রামের পুরনো এলাকা কিংবা সিলেটের ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে সরু রাস্তা ও অপরিকল্পিত অবকাঠামোর কারণে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়বে।

এছাড়া দুর্যোগ সম্পর্কে জনসচেতনতার ঘাটতিও একটি বড় সমস্যা। অনেক মানুষই জানেন না ভূমিকম্পের সময় কীভাবে নিরাপদে থাকতে হয় বা কী ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। বিদ্যালয়, অফিস বা আবাসিক ভবনে নিয়মিত মহড়া বা প্রশিক্ষণের অভাব থাকায় জরুরি পরিস্থিতিতে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এতসব ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করলে বাংলাদেশ এই বিপদের প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারে।

প্রথমত, দেশের সব অঞ্চলে কঠোরভাবে জাতীয় বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন করা জরুরি। প্রতিটি নতুন ভবন নির্মাণে ভূমিকম্প-সহনশীল নকশা বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং প্রকৌশল তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো ভবনগুলোকে ধীরে ধীরে সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, নগর পরিকল্পনায় বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। শহরের ভেতরে পর্যাপ্ত খোলা জায়গা, প্রশস্ত সড়ক এবং জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভূমিকম্পের পর দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়। অপরিকল্পিত ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নতুন বসতি বা স্থাপনা নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয়ত, ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আধুনিক সিসমোগ্রাফ নেটওয়ার্ক স্থাপন, ভূতাত্ত্বিক জরিপ এবং তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে এই বিষয়ে আরও গবেষণা পরিচালনা করা দরকার। চতুর্থত, জনসচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। স্কুল, কলেজ, অফিস ও কমিউনিটিতে নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া আয়োজন করা হলে মানুষ জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে নিজেকে রক্ষা করতে হবে তা শিখতে পারবে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমেও সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব। পঞ্চমত, জরুরি সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ফায়ার সার্ভিস, সিভিল ডিফেন্স এবং অন্যান্য উদ্ধারকারী সংস্থাকে আধুনিক সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ ও পর্যাপ্ত জনবল দিয়ে শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোকেও বড় দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন।

সর্বশেষে বলা যায়, ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক ঘটনা- এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, শক্তিশালী অবকাঠামো এবং সচেতন জনগোষ্ঠী থাকলে এর ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা যায়। বাংলাদেশের জন্য এখনই সময় বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার।

নইলে একটি বড় ভূমিকম্প দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে গুরুতরভাবে ব্যাহত করতে পারে। তাই সরকার, বিশেষজ্ঞ, নগর পরিকল্পনাবিদ এবং সাধারণ জনগণ- সবার সম্মিলিত উদ্যোগেই শুধু ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

রাহমান তৈয়ব

শিক্ষক, সাংবাদিক সোশ্যাল এক্টিভিস্ট ও এনালিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত