ঢাকা শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

মেধা পাচার : দেশের অপূরণীয় ক্ষতি

মো. আমিনুর রহমান
মেধা পাচার : দেশের অপূরণীয় ক্ষতি

মেধা পাচার বা Brain Drain বলতে বোঝায়- একটি দেশের শিক্ষিত, দক্ষ ও মেধাবী মানুষ যখন উন্নত শিক্ষা, গবেষণা বা উন্নত কর্মসংস্থানের আশায় বিদেশে চলে যায়। ফলে যে মেধা ও দক্ষতা দেশের উন্নয়নে কাজে লাগার কথা ছিল, তা অন্য দেশের উন্নয়নে ব্যবহার হয়। ধীরে ধীরে দেশ তার মূল্যবান মানবসম্পদ হারায়। বর্তমান সময়ে মেধা পাচার বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশে মেধা পাচারের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। স্বাধীনতার পর থেকে এই প্রবণতা শুরু হলেও, শেষ দুই দশকে তা দ্রুত বেড়েছে। আজকাল অনেক মেধাবী তরুণ বিদেশমুখী হয়ে পড়ছে। এর পেছনে রয়েছে নানা কারণ- উন্নত দেশগুলোতে উচ্চ শিক্ষার মান, গবেষণার সুযোগ, আধুনিক প্রযুক্তি, উচ্চ বেতন এবং উন্নত জীবনযাত্রা। অন্যদিকে, দেশে কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, গবেষণার সুযোগের অভাব, যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়নের ঘাটতি, স্বজনপ্রীতি এবং অনিশ্চিত কর্মপরিবেশ তরুণদের হতাশ করে। ২০২৩ সালে প্রায় ৫২,৭৯৯ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বিদেশে গেছেন। যা খুবেই হতাশাজনক।

মেধা পাচারের ফলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদ বিদেশে চলে যায়। যারা দেশের শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি ও অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারত, তারা অন্য দেশে কাজে লাগছে। এতে দেশের উন্নয়ন ধীর হয়ে যায়, দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি দেখা দেয় এবং অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে।

বর্তমানে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত গবেষণার সুযোগ নেই। প্রয়োজনীয় ল্যাব, সরঞ্জাম এবং আর্থিক সহায়তার অভাব গবেষণার মান কমিয়ে দিয়েছে। UNESCO -এর ২০২১ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গবেষণায় বিনিয়োগের ঘাটতি মেধাবী শিক্ষার্থী ও গবেষকদের বিদেশমুখী করছে। গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি করলে শিক্ষার্থীরা দেশে থেকেই নতুন উদ্ভাবন ও উন্নত গবেষণা করতে পারবে। ২০১৯ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ তার জিডিপির মাত্র ০.০৩ শতাংশ গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ করে, যেখানে উন্নত দেশগুলো এই খাতে জিডিপির ২ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশ বিনিয়োগ করে থাকে। এই বিনিয়োগের অভাব গবেষণায় আগ্রহী মেধাবীদের বিদেশমুখী করছে।

দেশে অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং গবেষক প্রাপ্য সম্মান পান না। উদাহরণস্বরূপ, যোগ্য ব্যক্তিকে সামাজিক ও সরকারি স্বীকৃতি না দিলে তার অবদান উপেক্ষিত হয়। এতে তাদের দেশে থেকে কাজ করার আগ্রহ কমে যায়। বাংলাদেশে চাকরির অভাব প্রকট। ২০২৪-২৫ সালের BBS -এর ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী দেশে প্রায় ২৭ লাখ ৪০ হাজার বেকার। এরমধ্যে প্রতি তিনজনের একজন স্নাতক ডিগ্রিধারী। OECD -এর ২০২৩ সালের গবেষণা অনুযায়ী, কর্পোরেট এবং সরকারি খাতের সীমাবদ্ধতা মেধাবী পেশাজীবীদের বিদেশে নতুন সুযোগ খোঁজার দিকে ধাবিত করে। দেশে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত চাকরির সুযোগ না থাকায় মেধাবীরা বিদেশে যাওয়ার পথ খুঁজছে।

সরকারি ও বেসরকারি খাতে নিয়োগে স্বচ্ছতা ও মেধার ভিত্তিতে মূল্যায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। যোগ্যতা ও মেধা অনুযায়ী কর্মসংস্থান করলে শিক্ষিতরা দেশে থাকার আগ্রহী হবে এবং মেধা পাচার কমে যাবে।

নবম গ্রেডের বেতন ২২,০০০-৫৩,০৬০ টাকা। এই বেতন দিয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারকে জীবনধারণ করা কঠিন।

বাস্তবসম্মত বেতন, প্রণোদনা এবং কর্মক্ষেত্রে সুযোগ দিলে মেধাবীরা দেশে থাকতে উৎসাহিত হবে।

রাজনৈতিক সহিংসতা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতি মেধাবীদের দেশে থাকার নিরাপত্তা হ্রাস করে।

Transparency International -এর ২০২২ সালের রিপোর্টেও বিষয়টি উঠে এসেছে। স্থিতিশীল পরিবেশ ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করলে তরুণরা দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে উৎসাহিত হবে। উন্নত দেশের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার মান এবং জীবনযাত্রার সুবিধা বাংলাদেশের তরুণদের বিদেশমুখী করছে।

মেধা পাচার শুধু মানবসম্পদ হ্রাস করে না, বরং দেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করে। শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, স্বচ্ছ নিয়োগ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করলে তরুণরা দেশে থেকে তাদের দক্ষতা ও জ্ঞান দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাবে।

একটি দেশের প্রকৃত শক্তি তার মেধাবী মানবসম্পদে নিহিত। মেধা পাচার রোধ করতে হলে দরকার দূরদর্শী নীতি, সুষ্ঠু পরিবেশ এবং মেধার প্রতি যথাযথ সম্মান। তখনই দেশের তরুণরা দেশেই থেকে দেশের অগ্রগতিতে অবদান রাখবে। এভাবেই দেশ সমৃদ্ধ, স্থিতিশীল এবং উন্নত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হবে।

মো. আমিনুর রহমান

শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত