প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৪ মার্চ, ২০২৬
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মহান আত্মত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ করে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে অনুষ্ঠিত হয় বাঙালির প্রাণের উৎসব অমর একুশে গ্রন্থমেলা। এটি শুধু বই কেনাবেচার স্থান নয়; বরং বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি, চিন্তা ও সৃজনশীলতার এক মহামিলনক্ষেত্র।
একুশে বইমেলার সূচনা হয় ১৯৭২ সালে। মহান মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জাগরণকে সামনে রেখে চিত্রশিল্পী চিত্তরঞ্জন সাহা প্রথমবারের মতো বইয়ের একটি ক্ষুদ্র প্রদর্শনী আয়োজন করেন বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। সেই ছোট্ট উদ্যোগই আজ বিস্তৃত হয়েছে এক বিশাল সাংস্কৃতিক উৎসবে। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে বইপ্রেমীদের ঢল নামে, আর বইয়ের গন্ধে ভরে ওঠে চারপাশ। তবে এবার কিছুটা ব্যতিক্রম রমজানের জন্য এবার একটু দেরিতে শুরু হয়েছে বইমেলা।
একুশে বইমেলা বাঙালির এক আবেগের নাম। বছরজুড়ে সাহিত্যপ্রেমীরা অপেক্ষায় থাকে কবে বইমেলা শুরু হবে।
এবারের মেলার প্রতিপাদ্য ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’ অত্যন্ত সময়োপযোগী। এই মেলা নতুন প্রজন্মকে বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করে এবং জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ জাগিয়ে তোলে। বই হলো এমন এক জাহাজ যা সময়ের সমুদ্র পাড়ি দিয়ে জ্ঞানকে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে পৌঁছে দেয়।
বইমেলা আমাদের সেই জাহাজের নোঙর ফেলার ঘাট। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বর্তমানের ডিজিটাল প্লাবনে বই বিক্রির সংখ্যা আর বই পড়ার হার কি সমান্তরালে চলছে? বই মেলা প্রাঙ্গণে সেলফি তোলার ভিড় যতটা বাড়ছে, মলাট উল্টে কয়েক পৃষ্ঠা পড়ার ধৈর্য কি ততটা থাকছে?
ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা আমাদের ভাষার গৌরব আর চেতনার রঙে উজ্জ্বল হয়ে উঠি। কিন্তু এই উৎসবের আবহে আমাদের মনন আর মেধার প্রকৃত মানচিত্রটি আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে? আন্তর্জাতিক এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১০২টি দেশের মধ্যে পাঠাভ্যাসে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম। এ দেশের একজন মানুষ বছরে গড়ে মাত্র ৩টি বই পড়েন। আমাদের দেশে পাঠকের অভাবে শতশত পাঠাগার যেনো পরিণত হচ্ছে জাদুঘরে। আমাদের আগের প্রজন্মের দিকে তাকালে একটি দৃশ্য চিরচেনা ছিল বিকালে বারান্দায় বসে বা রাতে শোবার আগে বই হাতে নিয়ে ডুবে যাওয়া। তখন বিনোদনের মাধ্যম ছিল সীমিত, কিন্তু কল্পনার আকাশ ছিল অসীম।
জীবনানন্দ দাসের বনলতা সেন কিংবা শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত ছিল তাদের কৈশোরের সঙ্গী। বর্তমানে স্মার্টফোন আর সোশ্যাল মিডিয়ার ছোট ছোট ক্লিপ আমাদের মনোযোগের সময় (Attention Span) কমিয়ে দিয়েছে। কয়েক সেকেন্ডের রিলস দেখে অভ্যস্ত মস্তিস্ক এখন তিনশ পৃষ্ঠার উপন্যাসে মনোনিবেশ করতে হাঁপিয়ে ওঠে।
বর্তমান শিক্ষার্থীদের জীবন সিজিপিএ আর বিসিএস এর গোলকধাঁধায় বন্দি। পাঠ্যবইয়ের পাহাড় ডিঙিয়ে তারা যখন অবসরে যায়, তখন তাদের মস্তিস্ক এতটাই ক্লান্ত থাকে যে তারা সহজ বিনোদন হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রলিং বা গেমিং বেছে নেয়। বই পড়ার অভ্যাস এখন বিলুপ্তপ্রায়। আজকের শিক্ষা ব্যবস্থা অনেকটাই চাকরি-কেন্দ্রিক। ‘পড়াশোনা করে যে, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে’- এই প্রবাদটিকে আমরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে গিয়ে শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য অর্থাৎ ‘মননশীলতা’ ভুলে গেছি। একাডেমিক সিলেবাসের বাইরে বই পড়াকে অনেক অভিভাবক সময়ের অপচয় বলে মনে করেন। বই পড়া শুধু সময় কাটানো নয়, এটি একটি মানসিক ব্যায়াম। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস আলজাইমার বা ডিমেনশিয়ার মতো জটিল রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়। বই পড়লে মানুষ অন্যের জুতোয় পা গলাতে শেখে। একটি গল্পের চরিত্রের বেদনা যখন পাঠককে স্পর্শ করে, তখন সে বাস্তব জীবনেও মানুষের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়। ডিজিটাল স্ক্রিন যেখানে মস্তিস্ককে উত্তেজিত করে, সেখানে বই পড়ার অভ্যাস রক্তচাপ কমায় এবং মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দেয়।
একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজকে আলোকিত করতে বইয়ের চেয়ে বড় হাতিয়ার আর নেই। কুসংস্কার আর সংকীর্ণতা দূর করতে হলে বইয়ের বিকল্প নেই। একুশে বইমেলা বাঙালির গর্ব, আবেগ ও সংস্কৃতির প্রতীক। যতদিন বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি বেঁচে থাকবে, ততদিন একুশে বইমেলা আমাদের হৃদয়ে আলোকিত হয়ে থাকবে ভাষা শহিদদের অমর স্মৃতির মতোই চিরজাগরুক ও অনির্বাণ।
নায়িমা আখতার
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়