প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৪ মার্চ, ২০২৬
প্রেম মানব জীবনের একটি স্বাভাবিক অনুভূতি। কিন্তু বর্তমান সমাজে তরুণদের মধ্যে প্রেমের প্রকাশ প্রায়ই উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। পড়াশোনা, পরিবার কিংবা ভবিষ্যৎ ভাবনার চেয়ে অনেকের কাছে প্রেমই হয়ে উঠছে জীবনের প্রধান বিষয়। এর ফলে ব্যক্তিগত জীবন, শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রেম স্বাভাবিক ও সুন্দর- কিন্তু বিবাহবহির্ভূত প্রেম যখন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায়, তা সমাজ ও ব্যক্তি জীবনের জন্য বিপদ ডেকে আনে।
বর্তমানে মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তরুণদের জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। অল্প পরিচয়েই দ্রুত ঘনিষ্ঠতা তৈরি হচ্ছে, আর সেই সম্পর্ক অনেক সময় আবেগের বশে গভীর হয়ে উঠছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্পর্কের ভিত্তি দুর্বল। বাস্তবতা, দায়িত্ববোধ বা ভবিষ্যতের পরিকল্পনার চেয়ে তাৎক্ষণিক আবেগই বড় হয়ে ওঠে। প্রেম সুন্দরভাবে চললেও পরিবারিক বাস্তবতার কারণে সম্পর্ক ভাঙন, মানসিক অস্থিরতা ও হতাশার মতো সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
প্রেমের কারণে শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় মনোযোগ হারানো, ক্লাস ফাঁকি দেওয়া, পরিবারের সঙ্গে গোপনীয়তা তৈরি করা বা অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রেমঘটিত দ্বন্দ্ব থেকে মারামারি, সামাজিকবিরোধ বা গুরুতর অপরাধও ঘটছে। এগুলো শুধু ব্যক্তিগত নয়, পুরো সমাজের জন্যও উদ্বেগের কারণ। বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো- অনেক তরুণ-তরুণী আবেগের বশে শারীরিক সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে, যা পরে বড় সংকট সৃষ্টি করছে। পত্র-পত্রিকায় প্রেমিকের বাড়িতে প্রেমিকার বিয়ের দাবিতে অনশন, প্রেমঘটিত মানসিক বিপর্যয় ইত্যাদির ঘটনা আমরা প্রায়শই দেখি। আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে দেশে ৪০৩ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে; তার মধ্যে প্রেম বিষয়ক জটিলতা থেকে মৃত্যু ১৩.১৫%। এটি স্পষ্ট করে যে, প্রেমের বর্তমান পরিস্থিতি কতটা ভয়ঙ্কর।
প্রেমের মাত্রাতিরিক্ত ছড়িয়ে পড়ার কারণগুলো হলো- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ছেলে-মেয়েদের অবাধ মেলামেশা, অ্যান্ড্রয়েড ফোনের সহজলভ্যতা, পারিবারিক অসচেতনতা, নৈতিক অবক্ষয় ও পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাব। প্রেম থেকে বাঁচাতে প্রয়োজন জনসচেতনতা বৃদ্ধি। প্রেমকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য না বানিয়ে শিক্ষা, আত্মগঠন ও নৈতিক মূল্যবোধে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ যদি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে, তবে তরুণদের আবেগপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। প্রয়োজন- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবাধ মেলামেশা নিয়ন্ত্রণ, পারিবারিক সচেতনতা, মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা, প্রযুক্তি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ।
প্রেম তখনই সুন্দর, যখন তা দায়িত্ববোধ ও পরিণত চিন্তার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিবাহের মধ্যে আসে। অন্ধ মোহে পড়ে জীবনকে বিপথে ঠেলা মানে- ব্যক্তিগত ও সামাজিক উভয় দিকেই ভয়াবহ পরিণতি। তাই সময় এসেছে তরুণ প্রজন্মকে বাস্তবতা অনুধাবন করার এবং প্রেমকে সুন্দর ও দায়বদ্ধ পথে পরিচালনার।
মো. আমিনুর রহমান
শিক্ষার্থী, বিভাগ বাংলা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়