ঢাকা শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

আলুচাষিদের আর্তনাদ শুনবে কে

মো. শাহিন আলম
আলুচাষিদের আর্তনাদ শুনবে কে

উত্তরাঞ্চলের আলুচাষিদের জন্য চলতি মৌসুম যেন একের পর এক দুঃসংবাদ নিয়ে হাজির হয়েছে। এরমধ্যেই বাজারে আলুর দাম তলানিতে, তার ওপর সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে বগুড়া, জয়পুরহাট ও রংপুরসহ আশপাশের কয়েকটি জেলায় আলুখেত পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক মাঠে এখনও আলু তোলা শেষ হয়নি। ফলে জমিতে পানি জমে থাকায় আলু পচে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যারা আলু তুলে ফেলেছেন, তাদেরও সমস্যার শেষ নেই, বৈরী আবহাওয়ায় আলু শুকানো ও সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন বাস্তবতায় লোকসানে থাকা কৃষকদের জন্য এই বৃষ্টি যেন সত্যিই ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে এসেছে।

বাংলাদেশের আলু উৎপাদনের সামগ্রিক চিত্র এই সংকটকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। গত এক দশকে আলু উৎপাদনে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দেশে প্রতিবছর এত পরিমাণ আলু উৎপাদিত হয় যে অনেক সময় তা অভ্যন্তরীণ চাহিদাকেও ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু উৎপাদনের এই সাফল্য কৃষকের জীবনে স্থিতি আনতে পারেনি। বরং অধিক উৎপাদন অনেক সময় উল্টো বাজারে মূল্যপতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বর্তমান মৌসুমে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা বাজারে আলুর দাম এতটাই কমে গেছে যে ভোক্তার জন্য এটি স্বস্তিদায়ক হলেও কৃষকদের জন্য তা উৎপাদন খরচের তুলনায় অত্যন্ত হতাশাজনক। মাঠপর্যায়ে আলু চাষে যে ব্যয় হয়, সেই তুলনায় বর্তমান বাজারদর কোনোভাবেই লাভজনক নয়। জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ এবং শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে বিঘা প্রতি জমিতে আলু চাষে মোটা অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। সরকারিভাবে কিছু ক্ষেত্রে ভর্তুকি থাকলেও অনেক কৃষক মৌসুমে নির্ধারিত দামে সার পাননি; বাধ্য হয়ে স্থানীয় ডিলারের কাছ থেকে বাড়তি খরচে কিনতে হয়েছে। অধিকাংশ কৃষক নিজের সঞ্চয়ের ওপর নির্ভর করতে পারেন না; তাই এনজিও ঋণ, দাদন কিংবা ধারদেনার ওপরই তাদের ভরসা রাখতে হয়। মৌসুম শেষে ফসল বিক্রি করে সেই ঋণ শোধ করার প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু বাজারদর যদি উৎপাদন খরচের কাছাকাছিও না যায়, তাহলে কৃষকের সামনে এক ধরনের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

বাজার কাঠামোর দুর্বলতা এখানে বড় ফ্যাক্টর। ঘাম ঝরিয়ে কৃষক উৎপাদনের মূল দায়িত্ব পালন করলেও বাজারে মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা থাকে মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে। আড়তদার, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতাদের দীর্ঘ শৃঙ্খলে কৃষকের অংশটাই সবচেয়ে কম। মৌসুমে বাজারে আলুর সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম দ্রুত পড়ে যায়; কিন্তু অফ সিজনে যখন দাম বাড়ে তখন কৃষকের ঘরে আর সেই আলু থাকে না। ফলে লাভের অংশটুকু অন্য স্তরে চলে যায়।

রপ্তানি ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত হলে এই সংকট কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব। বাংলাদেশের আলু এরইমধ্যে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, নেপাল ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে রপ্তানির অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬০ হাজারের বেশি মেট্রিক টন আলু রপ্তানি হয়েছে, যার বড় অংশ গেছে নেপালে। তবু স্থানীয় বাজারের চাপ কমানো ও কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এই পরিমাণ যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে কোল্ড স্টোরেজে আলু সংরক্ষণ করাও সব কৃষকের পক্ষে সহজ নয়। ­

মো. শাহিন আলম

কলাম লেখক, বগুড়া সাবেক শিক্ষার্থী, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত