প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৪ জুলাই, ২০২৬
দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখন আর শুধু বর্ষা মৌসুমের সাময়িক কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি রূপ নিয়েছে এক ভয়াবহ রূপী জাতীয় সংকটে। প্রতি বছরই আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আগের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন কোনো না কোনো হতভাগ্য মানুষ, যার মধ্যে শিশুদের সংখ্যাই উদ্বেগজনকভাবে বেশি। ঢাকার নামকরা হাসপাতালগুলো থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স- সবখানেই আজ ডেঙ্গু রোগীর উপচেপড়া ভিড়। চিকিৎসকরা হিমশিম খাচ্ছেন, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) জন্য চলছে হাহাকার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতি বছর এই একই চিত্র আমরা কেন দেখব? কেন একটি মশাবাহিত রোগকে নিয়ন্ত্রণ করতে আমরা বারবার এভাবে ব্যর্থ হচ্ছি?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর এই মহামারি রূপধারণ করার পেছনে মূল কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সবচেয়ে বড় কথা- সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর চরম উদাসীনতা ও সমন্বয়হীনতা। অতীতে ডেঙ্গুকে শুধু বর্ষাকালের রোগ মনে করা হলেও, এখন এর চরিত্র বদলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এখন অসময়েও বৃষ্টি হচ্ছে, তাপমাত্রা বাড়ছে, যা এডিস মশার প্রজননের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। কিন্তু প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনাকে আমরা দায়ী করে নিজেদের দায় এড়াতে পারি না। আমাদের নগর কর্তৃপক্ষগুলো বছরের পর বছর ধরে মশা নিধনের সনাতন ও অকার্যকর পদ্ধতি ব্যবহার করে আসছে। যে ওষুধ ছিটানো হয়, তার কার্যকারিতা নিয়ে খোদ নগরবাসীর মনেই তীব্র সংশয় রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে এডিস মশা প্রচলিত কীটনাশকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলেছে। অথচ নতুন ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রয়োগে আমাদের সিটি কর্পোরেশনগুলোর অনীহা বা ধীরগতি সত্যিই হতাশাজনক।
এডিসের লার্ভা ধ্বংসের জন্য শুধু ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ বা মৌসুমি অভিযান কোনো টেকসই সমাধান নয়। এর জন্য প্রয়োজন বছরব্যাপী সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা (ওহঃবমৎধঃবফ গড়ংয়ঁরঃড় গধহধমবসবহঃ)। ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোর ড্রেনেজব্যবস্থা, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র এবং ছাদবাগানগুলো এডিস মশার স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। আইন অনুযায়ী, ভবনে এডিসের লার্ভা পাওয়া গেলে জরিমানার বিধান থাকলেও তার প্রয়োগ নামমাত্র। নিয়মিত তদারকির অভাব এবং জবাবদিহিতা না থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও এক ধরনের সচেতনতার অভাব দেখা যাচ্ছে।
তবে শুধু মশা নিধনেই নয়, আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্বলতাও এই সংকটে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। ঢাকার বাইরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট, স্যালাইন এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট নিত্যদিনের ঘটনা। আইসিইউ বা প্লাটিলেট দেওয়ার পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকায় গুরুতর রোগীদের ঢাকামুখী হতে হচ্ছে। ফলে পথেই অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ছে এবং মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। স্বাস্থ্য খাতের এই বিকেন্দ্রীকরণের অভাব ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে আরও বেশি প্রাণঘাতী করে তুলেছে।
এক নজরে বর্তমান সংকট ও করণীয়-
বছরের ৩৬৫ দিনই মশক নিধন : শুধু বর্ষায় নয়, বছরজুড়ে বৈজ্ঞানিক উপায়ে লার্ভা ধ্বংসের কার্যক্রম চালাতে হবে।
চিকিৎসা ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ : ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত আইসিইউ, স্যালাইন ও পরীক্ষার কিট নিশ্চিত করতে হবে।
আইনের কঠোর প্রয়োগ : এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরিকারী ভবন মালিকদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা (তবৎড় ঞড়ষবৎধহপব) নীতি গ্রহণ করতে হবে।
সামাজিক আন্দোলন : প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় জনগণকে সম্পৃক্ত করে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে হবে।
এখন আর একে অপরকে দোষারোপ করার বা পুরোনো ব্যর্থতার খতিয়ান খতিয়ে দেখার সময় নেই। ডেঙ্গুর এই মরণকামড় থেকে বাঁচতে হলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, সিটি কর্পোরেশন এবং সাধারণ জনগণকে একযোগে মাঠে নামতে হবে। মশা নিধনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন মেনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ডেঙ্গুর কোনো লক্ষণ দেখামাত্রই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং ঘরে বসে অবহেলা না করার বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে সামান্য মশার কামড়ে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমাদের অবহেলা আর উদাসীনতার চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুদের। আমরা আশা করি, সরকার ও নগর কর্তৃপক্ষ এই বিপর্যয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে জরুরি অবস্থা বিবেচনায় কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। ডেঙ্গুমুক্ত বাংলাদেশ গড়া এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, এটি বেঁচে থাকার লড়াই। আর এই লড়াইয়ে আমাদের জিততেই হবে।