প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৫ মার্চ, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বা রেমিট্যান্স। স্বাধীনতার পর থেকে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা এই শ্রমবাজার আজ দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ২৩ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে আসে, যা দীর্ঘদিন ধরে রপ্তানি আয়ের পর বৈদেশিক মুদ্রার দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস হিসেবে বিবেচিত। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৬ থেকে ৭ শতাংশই এই প্রবাসী আয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। পরিসংখ্যান বলছে, চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) জুলাই থেকে ১১ মার্চ পর্যন্ত সময়ে দেশে মোট ২,৪৩৭ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১,৯৮২ কোটি মার্কিন ডলার। এ হিসাবে রেমিট্যান্স প্রবাহ ২২.৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু জাতীয় অর্থনীতিই নয়, গ্রামীণ অর্থনীতি, পারিবারিক ব্যয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে প্রবাসী শ্রমবাজারের স্থিতিশীলতা বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
কিন্তু এই শ্রমবাজারের বড় বাস্তবতা হলো, বিদেশগামী শ্রমিকদের অধিকাংশই নির্ভরশীল মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের উপর। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার হিসেবে পরিচিত। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিজিটাল মার্কেটিং সংস্থা গ্লোবাল মিডিয়া ইনসাইট অনুসারে, এই ছয়টি জিসিসি দেশে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। এই মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ভবিষ্যতে যে কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক অস্থিরতায় বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে প্রভাবিত করতে পারে, তা পূর্বেই অনুমেয় ছিল।
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা, আঞ্চলিক সংঘাত ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর হার কমে যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। একই সঙ্গে অনেক শ্রমিকের কর্মসংস্থানও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ কি অতিরিক্তভাবে একটি অঞ্চলের উপর নির্ভর করে কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করেছে?
বাংলাদেশের শ্রমবাজারের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমশক্তি রপ্তানির ধারা শুরু হয়। সেই সময় তেলসমৃদ্ধ আরব দেশগুলোতে ব্যাপক অবকাঠামো উন্নয়ন শুরু হয় এবং বিপুল শ্রমশক্তির প্রয়োজন দেখা দেয়। বাংলাদেশের বিপুল জনসংখ্যা ও কম মজুরির শ্রমশক্তি দ্রুতই সেই বাজারে জায়গা করে নেয়। অল্প সময়ের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজারে পরিণত হয় এবং কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রবণতা এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে বিদেশগামী শ্রমিকদের বড় অংশই এই অঞ্চলে যেতে থাকে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিও এখন একটি বড় রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বের হয়ে অনেক দেশ এখন বহুমুখী অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ নীতির লক্ষ্যই হলো তেলনির্ভরতা কমিয়ে প্রযুক্তি, পর্যটন ও সেবা খাতকে শক্তিশালী করা। এই পরিবর্তনের ফলে শ্রমবাজারের চাহিদাতেও পরিবর্তন আসছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় নাগরিকদের কর্মসংস্থান অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং বিদেশি শ্রমিকের উপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা চলছে।
এই প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে লোকালাইজেশন বা স্থানীয়করণ নীতিও জোরদার করা হয়েছে। সৌদি আরবে ‘সৌদাইজেশন’, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ‘এমিরাটাইজেশন’ এবং ওমানে ‘ওমানাইজেশন’ নীতির মাধ্যমে বিভিন্ন খাতে স্থানীয় নাগরিকদের চাকরির সুযোগ বাড়ানো হচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই বিদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতিও শ্রমবাজারে নতুন পরিবর্তন নিয়ে আসছে। অটোমেশন, রোবোটিক নির্মাণ প্রযুক্তি এবং স্মার্ট সিটি প্রকল্পের মতো উদ্যোগের ফলে অনেক ক্ষেত্রে কম দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় নির্মাণ খাতে আউটডোর শ্রমের সময় সীমিত করা হচ্ছে। এসব পরিবর্তন ভবিষ্যতে শ্রমনির্ভর খাতে বিদেশি শ্রমিকের চাহিদা কমিয়ে দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে যে, কোনো দেশের শ্রমবাজার যদি একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ ভূরাজনৈতিক সংঘাত, অর্থনৈতিক মন্দা কিংবা অভিবাসন নীতির পরিবর্তন মুহূর্তের মধ্যেই সেই বাজারকে সংকুচিত করে দিতে পারে। সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকট এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। বাংলাদেশের শ্রমবাজারের আরেকটি বড় সমস্যা হলো অভিবাসন ব্যয়ের উচ্চমাত্রা। অনেক শ্রমিক বিদেশে যাওয়ার জন্য ক্ষেত্রবিশেষ চার থেকে আট লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে বাধ্য হন। ফলে বিদেশে গিয়ে উপার্জনের বড় অংশই প্রথম দিকে ঋণ পরিশোধে চলে যায়। এতে শ্রমিকদের আর্থিক নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হন।
শ্রমিকদের অধিকার ও সুরক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন দেশে অনেক সময় শ্রমিকদের পাসপোর্ট জব্দ করা, চুক্তি অনুযায়ী বেতন না পাওয়া বা অনিরাপদ কর্মপরিবেশের অভিযোগ শোনা যায়। এসব সমস্যা সমাধানে প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষায় কূটনৈতিক মিশনগুলোর সক্রিয় ভূমিকা এবং দ্বিপক্ষীয় শ্রমচুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। রেমিট্যান্সের ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, প্রবাসী আয়ের বড় অংশই ভোগ ব্যয়, বাড়ি নির্মাণ বা সামাজিক খাতে ব্যয় হয়। কিন্তু উৎপাদনশীল বিনিয়োগে এই অর্থের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম। যদি এই অর্থ শিল্প, কৃষি কিংবা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিনিয়োগ করা যায়, তাহলে তা দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের শ্রমনীতিতে দক্ষতা কূটনীতি বা স্কিল ডিপ্লোম্যাসি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শুধু শ্রমিক পাঠানো নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রবেশের কৌশল তৈরি করা প্রয়োজন। বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও সরকারের সঙ্গে যৌথ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি শিক্ষা এবং দক্ষতা সার্টিফিকেশনের মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন করা যেতে পারে। বিশ্বের অন্যান্য শ্রম রপ্তানিকারক দেশের অভিজ্ঞতা এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। ফিলিপাইন দীর্ঘদিন ধরে বহুমুখী শ্রমবাজার তৈরির কৌশল অনুসরণ করছে। তারা মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতেও দক্ষ কর্মী পাঠাচ্ছে। একইভাবে ভিয়েতনাম জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রশিক্ষিত শ্রমিক পাঠানোর মাধ্যমে তাদের শ্রমবাজারকে বৈচিত্র্যময় করেছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, জার্মানি, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত অর্থনীতিতে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা বাড়ছে। তবে এসব বাজারে প্রবেশের জন্য আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। নারী শ্রম অভিবাসনের বিষয়টিও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে গৃহসেবা, স্বাস্থ্যসেবা ও কেয়ার সেক্টরে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে। তবে এই ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড। বর্তমানে দেশের একটি বড় অংশ তরুণ জনগোষ্ঠী, যা শ্রমবাজারের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই সুযোগ চিরস্থায়ী নয়। আগামী কয়েক দশকের মধ্যে এই জনমিতিক সুবিধা ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে। তাই এখনই দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
অতএব বাংলাদেশের শ্রমনীতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বহুমুখী শ্রমবাজার তৈরি, আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা উন্নয়ন, অভিবাসন ব্যয় কমানো, শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা এবং রেমিট্যান্সকে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে ব্যবহার প্রভৃতি কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার প্রবাসী শ্রমবাজারকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করে তুলতে পারে। অন্যথায় মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মতো ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন ভবিষ্যতে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মো. শাহিন আলম
কলাম লেখক, সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়