ঢাকা সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬, ২ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ঢাকা কি ধীরে ধীরে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে

ওরাইনা খাঁন চৌধুরী
ঢাকা কি ধীরে ধীরে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে

বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। প্রতিদিনই বাড়ছে জনসংখ্যা, বাড়ছে শহরমুখী মানুষের ঢল। উন্নত জীবনযাত্রা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের আশায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ ছুটে আসে রাজধানী ঢাকায়। কিন্তু এই স্বপ্নের শহরই ধীরে ধীরে অনেকের কাছে পরিণত হচ্ছে এক ভয়ংকর বাস্তবতায়- ঢাকা যেন আজ এক মৃত্যুফাঁদ। জাতিসংঘের ২০২৫ সালের ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টস’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং বিশ্বের অন্যতম জনবহুল মেগাসিটি। বর্তমানে এখানে প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ বসবাস করছে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর চাপ বহন করতে গিয়ে শহরের অবকাঠামো অনেক আগেই সীমা ছাড়িয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো- এই বিপুল জনসংখ্যার নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রেই অবহেলিত রয়ে গেছে। ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়ক- সবখানেই যেন অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিত নগরায়নের চিত্র স্পষ্ট। বিশেষ করে আবাসিক এলাকাগুলোতে যেভাবে কলকারখানা গড়ে উঠছে, তা নগর জীবনের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনেক জায়গায় দেখা যায়, যে ভবনে একাধিক পরিবার বসবাস করে, সেই একই ভবনের নিচতলায় স্থাপন করা হয়েছে ছোট-বড় বিভিন্ন কারখানা। কোথাও গার্মেন্টস, কোথাও প্লাস্টিক কারখানা, কোথাও আবার কেমিক্যাল বা রং তৈরির কারখানা। বাড়ির মালিকরা অধিক লাভের আশায় এসব কারখানাকে ভাড়া দিয়ে দিচ্ছেন।

কিন্তু তারা হয়তো একবারও ভাবছেন না- যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তার দায় নেবে কে? একটি আবাসিক ভবনে যখন একই সঙ্গে শতাধিক মানুষ বসবাস করে, সেখানে দাহ্য পদার্থ বা বিপজ্জনক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে কারখানা পরিচালনা করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ- তা আমরা অতীতের বহু দুর্ঘটনা থেকেই বুঝতে পেরেছি। ঢাকার ইতিহাসে এমন অনেক দুর্ঘটনার নজির রয়েছে, যেখানে অপরিকল্পিত কারখানা বা গুদামঘরের কারণে ভয়াবহ প্রাণহানি ঘটেছে। অগ্নিকাণ্ড, বিস্ফোরণ কিংবা বিষাক্ত গ্যাসের কারণে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। তবুও যেন আমরা শিক্ষা নিতে পারিনি। একই ভুল বারবার করে যাচ্ছি আমরা। ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় শিল্পকারখানা স্থাপনের ফলে পরিবেশ দূষণও মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব কারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাস বাতাসকে দূষিত করে তুলছে। প্রতিদিন মানুষ সেই দূষিত বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে। শিশু, বয়স্ক ও রোগীদের জন্য এটি আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে। শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ফুসফুসের রোগসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে প্রতিনিয়ত।

শুধু বায়ুদূষণই নয়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক কারখানাই তাদের উৎপাদিত বর্জ্য যথাযথভাবে নিষ্কাশন করে না। ফলে সেগুলো সরাসরি নালা, খাল বা নদীতে গিয়ে মিশে পরিবেশকে আরও বিপর্যস্ত করে তুলছে। এর প্রভাব পড়ে পানির ওপর, মাটির ওপর এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনেই।রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের অঞ্চল- যেমন সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর- শিল্পকারখানার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।

সহজলভ্য শ্রমিক, যোগাযোগ সুবিধা এবং সরকারি নীতিসহায়তার কারণে এখানে তৈরি পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন ধরনের শিল্প দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। দেশের অর্থনীতিতে এসব শিল্পের অবদান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে এসব শিল্পের মাধ্যমে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- এই উন্নয়নের মূল্য কি মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা দিয়ে দিতে হবে? শিল্পায়ন অবশ্যই প্রয়োজন; কিন্তু তা হতে হবে পরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খল। আবাসিক এলাকার ভেতরে বিপজ্জনক বা দূষণকারী শিল্পকারখানা গড়ে উঠলে তা শুধু পরিবেশ নয়, মানুষের জীবনকেও হুমকির মুখে ঠেলে দেয়। নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন- ঢাকার মতো একটি ঘনবসতিপূর্ণ শহরে পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল তৈরি করা জরুরি। যেখানে কারখানা থাকবে, সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

একইসঙ্গে আবাসিক এলাকাকে শিল্পকারখানামুক্ত রাখতে হবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা তার উল্টো চিত্রই দেখতে পাই। অনেক ক্ষেত্রে আইন থাকলেও তার সঠিক প্রয়োগ নেই। প্রশাসনের নজরদারিও অনেক সময় দুর্বল। ফলে কেউ ইচ্ছা করলেই আবাসিক ভবনের নিচতলায় কারখানা বা গুদামঘর স্থাপন করে ফেলতে পারছে। এ অবস্থায় শুধু সরকার বা প্রশাসনের দিকে আঙুল তুললেই চলবে না। সচেতন হতে হবে আমাদের সবাইকেই।

বাড়ির মালিকদের বুঝতে হবে অতিরিক্ত লাভের আশায় যদি তারা মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেন, তবে সেটি শুধু অনৈতিকই নয়, অপরাধও বটে। একইভাবে নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে এবং প্রয়োজন হলে প্রতিবাদ করতে হবে। ঢাকাকে বাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। আবাসিক এলাকায় অবৈধ বা ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা বন্ধ করতে হবে। শিল্পকারখানাকে নির্দিষ্ট শিল্পাঞ্চলে স্থানান্তরের উদ্যোগ নিতে হবে। একইসঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষা ও নিরাপত্তাব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। রাজধানী ঢাকা আমাদের সবার। এই শহর শুধু অর্থনীতির কেন্দ্র নয়, লাখো মানুষের স্বপ্ন ও জীবনের প্রতীক। তাই এই শহরকে যদি আমরা সত্যিই ভালোবাসি, তাহলে এটিকে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হতে দেওয়া যায় না। আজ প্রয়োজন দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং সর্বোপরি নাগরিক সচেতনতা। তাহলেই হয়তো একদিন আমরা বলতে পারব- ঢাকা আর মৃত্যুফাঁদ নয়, বরং নিরাপদ ও বাসযোগ্য একটি নগরী।

ওরাইনা খাঁন চৌধুরী

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত