প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ৩০ মার্চ, ২০২৬
বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে ভৌগোলিক অবস্থান শুধু মানচিত্রে আঁকা একটি বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, কূটনীতি ও কৌশলগত শক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে যে নতুন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। জাপানের ইরম-ই Initiative, চীনের Belt and Road Initiative (BRI), ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের Indo-Pacific Strategy-সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের ভূগোল একটি বিশেষ কৌশলগত গুরুত্ব বহন করছে।
জাপানের ইরম-ই Initiative মূলত বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে শিল্প, বাণিজ্য ও অবকাঠামো উন্নয়নের একটি কৌশলগত উদ্যোগ। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়ানো এবং নতুন শিল্পভিত্তিক অঞ্চল গড়ে তোলা এবং জাপানের শক্তিশালী বাজার গড়ে তোলা। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, সমুদ্রবন্দর এবং তুলনামূলক কম খরচের শ্রমশক্তি জাপানের কাছে বাংলাদেশকে একটি আকর্ষণীয় ও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরিণত করেছে। জাপান বাংলাদেশের মাধ্যমে নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে, কম খরচে উৎপাদনের সুবিধা পাবে এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ করতে পারে। এর পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় তার কৌশলগত উপস্থিতিও শক্তিশালী হয়। ফলে জাপানের কাছে বাংলাদেশের ভৌগোলিক গুরুত্ব পাবে।
অন্যদিকে চীনের Belt and Road Initiative বা BRI-তেও বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চীনের এই বৃহৎ অবকাঠামো ও সংযোগ প্রকল্পের লক্ষ্য হলো এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার মধ্যে বাণিজ্য ও যোগাযোগের নতুন নেটওয়ার্ক তৈরি করা। দক্ষিণ এশিয়ার কেন্দ্রস্থলে এবং বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত হওয়ায় বাংলাদেশ চীনের জন্য সমুদ্রপথ ও আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেয়। চট্টগ্রাম, মোংলা এবং মাতারবাড়ি বন্দরের মতো অবকাঠামো চীনের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে প্রবেশকে সহজ করতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে বিনিয়োগের মাধ্যমে চীন শিল্প, বাণিজ্য ও পরিবহন খাতে তার প্রভাব বাড়াতে সক্ষম হয়।
ভারতের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের গুরুত্ব কম নয়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্য- যা ‘Seven Sisters’ নামে পরিচিত- দেশটির মূল ভূখণ্ড থেকে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন। পাহাড়ি ও দুর্গম ভূখণ্ডের কারণে এই অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ব্যবহার করে ভারত সহজেই এই রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ, পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। ফলে বাংলাদেশ ভারতের আঞ্চলিক সংযোগ, অর্থনৈতিক কার্যক্রম এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের Indo-Pacific Strategy-তেও বাংলাদেশ ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে। বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ সামুদ্রিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি কৌশলগত অবস্থান দখল করে আছে। যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং চীনের ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক প্রভাবের ভারসাম্য রক্ষার জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী।
এই প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট যে, বাংলাদেশকে ঘিরে বড় শক্তিগুলোর আগ্রহ শুধু অর্থনৈতিক নয় বরং এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে আঞ্চলিক কৌশলগত হিসাব-নিকাশও। তবে এই প্রতিযোগিতার মধ্যেই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা ও দক্ষ কূটনৈতিক কৌশল প্রয়োগ করতে পারলে বাংলাদেশ নিজের bargaining power কে কাজে লাগিয়ে এই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের শক্তিতে পরিণত করতে পারে। bargaining power বলতে বোঝায় নিজের গুরুত্বটা বুঝিয়ে অন্যের কাছে দরকষাকষি করা মানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি দেশ অন্যদের জন্য গুরুত্বপূর্ন হলে, সে অন্যদেশ গুলোকে সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে নিজের লাভকে সর্বোচ্চ করে। এমতাবস্থায়, বাংলাদেশও এই সুযোগটি কাজে লাগাতে পারে।
প্রথমত, বন্দর, সড়ক, রেলপথ, বিদ্যুৎ ও শিল্পাঞ্চলসহ অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। দ্বিতীয়ত, জাপান, চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের মতো দেশগুলোর বিনিয়োগকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে শিল্পায়ন ও প্রযুক্তির প্রসার করতে পারে।
তাছাড়া, দক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রেখে সব পক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা করা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে উন্নয়নের সুযোগগুলো কাজে লাগানো যায়। বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ শক্তিগুলো যেমন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান ও ভারত এদের সবার কাছেই বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কোন পাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করলে তা দেশের জন্য অলাভজনকই হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। তবে কোন ধরনের নতজানু কূটনীতিও দেশের মঙ্গল বয়ে আনবে না। কোন রাষ্ট্রের একাধিপত্য না মেনে বরং নিজের সম্পদকে অন্যদের কাছে আকর্ষনীয় করে কূটনৈতিক সম্পর্ক পরিচালনা করতে হবে।
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে তাই একদিকে যেমন চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তেমনি বিরাট সম্ভাবনাও রয়েছে। যদি বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক অবস্থানকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে এবং পরাশক্তি দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে, তবে বাংলাদেশ শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয় বরং পুরো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তিতে পরিণত হবে।
হুমায়ুন আহমেদ নাইম
শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়