প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ৩০ মার্চ, ২০২৬
স্বাধীনতার পরবর্তী কয়েক দশকে আমাদের জাতীয় উন্নয়নের একটি রৈখিক ও যান্ত্রিক সংজ্ঞা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। সেই সময় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে উন্নয়ন বলতে আমরা বুঝেছি স্রেফ ভৌত অবকাঠামো, অর্থাৎ চওড়া রাস্তা, জলাশয় ভরাট করে দালানকোঠা নির্মাণ আর চতুর্দিকে ধূসর কংক্রিটের বিস্তার। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে শুরু হওয়া সেই অপরিকল্পিত নগরায়ণের ধারা আজ একবিংশ শতাব্দীতে আমাদের জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের যে মহাসড়কে অবস্থান করছে, তার প্রাণকেন্দ্র হলো আমাদের শহরগুলো। কিন্তু ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্সে ঢাকার অবস্থান যখন ধারাবাহিকভাবে তলানিতে থাকে, তখন জিডিপির প্রবৃদ্ধি নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্যের নিশ্চয়তা নিয়ে গভীর শঙ্কা জাগায় বটে। এখন সময় এসেছে প্রকৃতিকে ধারণ করে উন্নয়নের নতুন বয়ান তৈরি করার।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বাড়লেও আমাদের শহরগুলো উত্তপ্ত হচ্ছে বিশ্বগড় হারের চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে। এই সংকটকে বিজ্ঞানীরা বলছেন আরবান হিট আইল্যান্ড প্রভাব। তথ্যমতে, গত দুই দশকে ঢাকার সবুজ এলাকা আশঙ্কাজনকভাবে প্রায় ৬০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। কংক্রিটের অবকাঠামো দিনের বেলা তাপ শোষণ করে এবং রাতে তা বিকিরণ করে, ফলে স্বভাবতই শহরের তাপমাত্রা পার্শ্ববর্তী গ্রামীণ এলাকার চেয়ে ৫ থেকে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকে।
তাপমাত্রার এই ঊর্ধ্বগতি কেবল পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, বরং এটি জনস্বাস্থ্য ও সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর কার্যকর সমাধান হিসেবে আমাদের প্রয়োজন সবুজ করিডোর। প্রতিটি প্রধান সড়কের দুই পাশে এবং মিডিয়ানে দেশি প্রজাতির গাছ লাগানো নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বহুতল ভবনের দেওয়ালে ও ছাদে বনায়ন পদ্ধতি অর্থাৎ ভার্টিক্যাল ফরেস্ট্রির প্রবর্তন করতে হবে। সিঙ্গাপুরের আদলে এটি শহরের তাপমাত্রা ২-৩ ডিগ্রি কমিয়ে আনার একটি পরীক্ষিত বৈজ্ঞানিক সমাধান।
শহরের এই তপ্ত আবহাওয়া যেমন অসহনীয়, তেমনি ?যাতায়াত ব্যবস্থার স্থবিরতাও আজ চরমে। বুয়েটের এআরআই-এর তথ্যমতে, যানজটে জনগণের প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ লক্ষ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যা এক প্রকার সামষ্টিক অর্থনৈতিক অপচয়-এর টেকসই সমাধান হলো ট্রানজিট ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট (টিওডি)। অর্থাৎ মেট্রোরেল বা বিআরটি স্টেশনগুলোকে কেন্দ্র করে একটি নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধের মধ্যে স্কুল, অফিস, বাজার এবং আবাসন নিশ্চিত করা। যখন মানুষের প্রয়োজনীয় সবকিছু হাতের নাগালে থাকবে এবং স্টেশনগুলোতে পায়ে হেঁটে পৌঁছানো যাবে, তখন যাতায়াতের গড় দূরত্ব কমবে এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাবে। আমাদের নীতি হতে হবে মুভ পিপল, নট কারস (মানুষের চলাচল নিশ্চিত করুন, গাড়ির নয়)। আমস্টারডাম বা কোপেনহেগেনের মতো শহরগুলো যেভাবে ব্যক্তিগত গাড়িকে নিরুউৎসাহিত করে সাইকেল ও গণপরিবহনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, তা আমাদের জন্য বড় উদাহরণ।
?এর পাশাপাশি যাতায়াত ব্যবস্থার শৃঙ্খলা ফেরাতে ঢাকার মূল ধমনী সদৃশ প্রধান রাস্তাগুলোতে অটোরিকশা বা ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। তবে এই রূপান্তর হতে হবে মানবিক। অটোরিকশা চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে সুশৃঙ্খল বাস সার্ভিসের চালক হিসেবে পুনর্বাসন করতে হবে এবং এসব বাহনকে শুধু পাড়া-মহল্লার ফিডার রোডে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
?আমরা যখন যানজট নিরসনে শুধু রাস্তার ওপর ফ্লাইওভার খুঁজি, তখন ইউরোপের দেশগুলো দেখাচ্ছে কীভাবে প্রকৃতিকে যাতায়াতের মাধ্যম বানানো যায়। সুইজারল্যান্ডের বাসেল ও বার্ন শহরের দিকে তাকালে এক বিস্ময়কর দৃশ্য দেখা যায়। সেখানে অফিসপাড়ার পাশ দিয়ে বয়ে চলা রাইন ও আরে নদীকে নাগরিক যাতায়াতের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তোলা হয়েছে।
গ্রীষ্মকালে দেখা যায়, শত শত মানুষ অফিস শেষ করে গাড়ির বদলে নদীতে সাঁতরে বা বিশেষায়িত ফ্লোটিং ব্যাগ (যাতে প্রয়োজনীয় পোশাক ও ল্যাপটপ থাকে) নিয়ে ভেসে ভেসে বাড়ি ফিরছেন। সরকার সেখানে নদীর পানির মান নিয়মিত পরীক্ষা করে এবং তীরে তীরে চেঞ্জিং রুম ও স্নানঘর তৈরি করে দিয়েছে। স্বল্প সময়ের এই জলযাত্রা শুধু যানজট আর কার্বন নিঃসরণই কমাচ্ছে না, বরং নাগরিকদের শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তিরও বড় উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের বুড়িগঙ্গাকে ঘিরেও কি এমন স্বপ্ন দেখা অসম্ভব? অবশ্য এর জন্য প্রয়োজন একটি কঠোর রোডম্যাপ। প্রথমত, জিরো ডিসচার্জ পলিসি’র মাধ্যমে শিল্পবর্জ্য নদীতে পড়া বন্ধ করতে হবে এবং আধুনিক ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর তলদেশ পরিষ্কার করতে হবে। যদি বুড়িগঙ্গার দূষণ রোধ করে একে যাতায়াত উপযোগী করা যেত, তবে সদরঘাট থেকে গাবতলী পর্যন্ত নৌ-পথ রাস্তার ওপর চাপ অর্ধেক কমিয়ে দিত।
পাশাপাশি ঢাকার জনসংখ্যা বিকেন্দ্রীকরণে সরকারি আবাসিক কোয়ার্টারগুলোকে শহরের মূল কেন্দ্রের বাইরে নদীর কাছাকাছি এলাকায় সরিয়ে নেওয়া যেতে পারে। এতে যেমন মূল শহরের ওপর মানুষের চাপ কমবে, তেমনি নাগরিকরা একটি স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাসের সুযোগ পাবে। সেক্ষেত্রে সর্বপ্রথম নদী ব্যবস্থাপনায় একটি সমন্বিত ও শক্তিশালী ‘রিভার অথরিটি’ গঠন করতে হবে, যারা আইনি ক্ষমতাবলে শিল্পবর্জ্য নিঃসরণ স্থায়ীভাবে বন্ধ এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করবে।
তবে জলাবদ্ধতা আমাদের একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। এর মূল কারণ অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতা। আমাদের টেকসই পরিকল্পনায় স্পঞ্জ সিটি ধারণা গ্রহণ করতে হবে। এর মূলে রয়েছে ব্লু-গ্রিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার। অর্থ্যাৎ একটি স্পঞ্জ যেমন পানি শুষে নেয়, একটি পরিকল্পিত শহরকেও তেমন হতে হবে। পার্কের নিচে বড় জলাধার রাখা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং রাস্তা তৈরিতে পানি শোষণকারী ইট ব্যবহার করা প্রয়োজন। চীনে অনেক শহরকে এখন এই মডেলে সাজানো হচ্ছে। এতে বৃষ্টির পানি সরাসরি ভূগর্ভে চলে যাবে, ফলে একদিকে যেমন জলাবদ্ধতা দূর হবে, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রিচার্জ হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ঢাকা একসময় খাল আর নদীর শহর ছিল; সেই নীল শিরা-উপশিরাগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা ছাড়া বিকল্প নেই।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও আমাদের নগর প্রশাসনের জন্য একটি বিশাল বোঝা। আমারা পণ্য কিনছি, ব্যবহার করছি এবং প্রয়োজন শেষে ডাস্টবিন কিংবা যত্রতত্র ফেলে দিচ্ছি। এই ময়লাগুলো শেষ পর্যন্ত আমিনবাজার বা মাতুয়াইলের মতো ভাগাড়ে গিয়ে পরিবেশ বিষাক্ত করছে। কিন্তু টেকসই পরিকল্পনা বলে সার্কুলার ইকোনমি বা বৃত্তাকার অর্থনীতির কথা।
ঢাকায় প্রতিদিন উৎপাদিত প্রায় ৭,০০০ টন বর্জ্যরে ৭০ শতাংশই জৈব বা পচনশীল। এই বিশাল সম্পদকে আমরা কাজে লাগাতে পারছি না। সুইডেন আজ বিশ্বের এমন এক দেশ যারা নিজেদের বর্জ্য তো বটেই, এমনকি বিদেশ থেকে ময়লা আমদানি করে তা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। আমরা যদি অ্যানারোবিক ডাইজেশন বা বায়ো-গ্যাস প্ল্যান্টের মাধ্যমে এই জৈব বর্জ্য থেকে মিথেন গ্যাস সংগ্রহ করতে পারি, তবে তা জাতীয় গ্রিডে হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ করতে পারে।
পাশাপাশি আমাদের ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) অনুযায়ী ফ্লোর এরিয়া রেশিও নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি। একটি নির্দিষ্ট এলাকায় কতজন মানুষ থাকবে, তার ওপর ভিত্তি করে রাস্তা, পার্ক এবং ইউটিলিটি (গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ) সংযোগ দিতে হবে। অতিরিক্ত জনঘনত্ব যে কোনো পরিকল্পিত এলাকাকেও বস্তিতে রূপান্তর করতে পারে। রাজউকের মতো সংস্থাগুলোকে কেবল প্লট বরাদ্দের প্রতিষ্ঠান না হয়ে প্রকৃত অর্থে পরিকল্পনাকারী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর হতে হবে।
আমাদের নগর পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় শত্রু হলো প্রাতিষ্ঠানিক খণ্ডবিখণ্ডতা। ৫৪টি সংস্থার সমন্বয়হীনতার বলি হয় জনগণের ট্যাক্সের টাকা। কারিগরি সমাধান আমাদের হাতে থাকলেও এর সফল বাস্তবায়ন আটকে আছে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবের বেড়াজালে। কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা না করে, সাধারণ মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন নগর কাউন্সিল গঠন করা এখন সময়ের দাবি।
টেকসই নগর পরিকল্পনা এখন আর কোনো তত্ত্ব কথা নয়; এটি আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন। প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে যে উন্নয়ন, তা তাসের ঘরের মতো ভঙ্গুর। আমরা যদি আজ আমাদের শেষ হয়ে আসা জলাশয় ও অবশিষ্ট গাছপালা রক্ষা করতে না পারি, তবে আগামী প্রজন্মের কাছে আমরা এক বিষাক্ত মৃত নগরী রেখে যাব। সময় থাকতে আমাদের জেগে উঠতে হবে, নতুবা উন্নয়নের এই মহাসড়ক শেষ পর্যন্ত এক অন্ধগলিতে গিয়ে ঠেকবে।
মো. শাহিন আলম
কলাম লেখক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়