প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০২ এপ্রিল, ২০২৬
বাংলাদেশের ইতিহাস, ভূগোল ও অর্থনীতির গভীরে প্রোথিত রয়েছে নদী ও হাওরের অস্তিত্ব। এই দেশকে ‘নদীমাতৃক’ বলা হয় শুধু আবেগের বশে নয়; বরং বাস্তবতার নিরিখেই- কারণ নদী ও হাওরই এ দেশের প্রাণপ্রবাহ। কৃষি, মৎস্য, নৌপথ, জীববৈচিত্র্য, এমনকি গ্রামীণ সংস্কৃতির ভিত্তিও গড়ে উঠেছে এই জলভূমিকে কেন্দ্র করে। কিন্তু আজ সেই নদী ও হাওরই ক্রমাগত ভরাট হয়ে তাদের স্বাভাবিক রূপ হারাচ্ছে। এর ফলে বর্ষা মৌসুম, যা একসময় ছিল উর্বরতা ও জীবনের প্রতীক, এখন ক্রমেই পরিণত হচ্ছে আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা ও বিপর্যয়ের পূর্বাভাসে।
বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোর নাব্য হ্রাসের বিষয়টি দীর্ঘদিনের, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এর গতি উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। উজান থেকে নেমে আসা বিপুল পরিমাণ পলি ও বালু নদীর তলদেশে জমা হয়ে নদীগুলোকে অগভীর করে তুলছে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অঞ্চল যেখানে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে আসা পলি দ্রুত জমে হাওরের তলদেশ ভরাট করে ফেলে- সেখানে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি নাজুক। একসময় যেসব হাওর বিশাল জলাধার হিসেবে কাজ করত, বর্ষার অতিরিক্ত পানি ধারণ করে রাখত, সেগুলো এখন আর সেই সক্ষমতা ধরে রাখতে পারছে না। ফলে অল্প সময়ের অতিবৃষ্টিতেই পানি উপচে পড়ে এবং দ্রুত প্লাবিত হয় বিস্তীর্ণ এলাকা।
এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানুষের অপরিকল্পিত ও দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ড, যা সমস্যাকে বহুগুণে বাড়িয়ে তুলেছে। নদী দখল এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে। প্রভাবশালী মহল ও অসাধু ব্যবসায়ীরা নদীর তীর দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করছে, খাল ভরাট করে আবাসন ও বাণিজ্যিক প্রকল্প গড়ে তুলছে। এতে নদীর প্রস্থ সংকুচিত হচ্ছে এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
অবৈধ বালু উত্তোলনও নদী ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। অপরিকল্পিতভাবে নদী থেকে বালু তোলার ফলে তলদেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, কোথাও গভীর গর্ত তৈরি হচ্ছে আবার কোথাও পলি জমে নদী ভরাট হচ্ছে। এতে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা বন্যার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
অন্যদিকে, শিল্প ও গৃহস্থালি বর্জ্যরে নির্বিচার ফেলা নদী ও খালকে ধীরে ধীরে মৃতপ্রায় করে তুলছে। প্লাস্টিক, পলিথিন, রাসায়নিক বর্জ্য- সবকিছু মিলে পানি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি পানি প্রবাহের পথও সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। নগর এলাকায় এই সমস্যা আরও প্রকট; অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং জলাধার ধ্বংসের ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে, যা শহরগুলোকে বসবাসের অনুপযোগী করে তুলছে।
হাওর অঞ্চলে সংকট আরও গভীর। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে জমির ওপর চাপ বেড়েছে এবং এই চাপ সামাল দিতে মানুষ হাওরের ভেতরে প্রবেশ করছে। আবাদি জমি বাড়ানোর জন্য হাওরের ভেতর মাটি ফেলে জমি তৈরি করা হচ্ছে, যা প্রাকৃতিক জলাধারের পরিসর কমিয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে বসতি স্থাপনও বাড়ছে হাওরপাড়ে, যা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও বিকল্পের অভাবে মানুষকে এই পথ বেছে নিতে হচ্ছে।
অপরিকল্পিত ও নিম্নমানের বাঁধ নির্মাণ এই অঞ্চলের দুর্ভোগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। অনেক ক্ষেত্রে বাঁধ নির্মাণের সময় পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ বিবেচনায় নেওয়া হয় না। ফলে কোথাও পানি আটকে থাকে, আবার কোথাও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়ে বাঁধ ভেঙে যায়। একটি বাঁধ ভেঙে গেলে তার প্রভাব হয় ভয়াবহ- মুহূর্তের মধ্যে ফসল, ঘরবাড়ি এবং অবকাঠামো পানির নিচে তলিয়ে যায়।
জলবায়ু পরিবর্তন এই সংকটকে বহুগুণে জটিল করে তুলেছে। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশে বিশেষভাবে অনুভূত হচ্ছে। বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে গেছে- আগে যেখানে দীর্ঘসময় ধরে মাঝারি বৃষ্টি হতো, এখন সেখানে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি হচ্ছে। উজান থেকে আকস্মিক ঢল নেমে আসছে, যা পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন। ফলে বন্যা আরও অনিশ্চিত ও তীব্র হয়ে উঠছে।
২০২২ সালের বন্যা এই বাস্তবতার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। খুব অল্প সময়ের মধ্যে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। ফসলহানি, ঘরবাড়ি ধ্বংস, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা- সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। এই ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আগামী দিনের চিত্র তাই উদ্বেগজনক। নদী ও হাওরের ধারণক্ষমতা যদি ক্রমাগত কমতে থাকে, তবে বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি ধারণের কোনো প্রাকৃতিক ব্যবস্থা অবশিষ্ট থাকবে না। এর ফলে শহর ও গ্রাম উভয়ই নিয়মিত প্লাবিত হবে। কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে, যা খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে। গ্রামীণ অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়বে, এবং মানুষ জীবিকার সন্ধানে শহরমুখী হবে- যা নগরায়নের চাপ আরও বাড়াবে।
এই পরিস্থিতির জনস্বাস্থ্যগত প্রভাবও গভীর। বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে পানিবাহিত রোগ যেমন ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েডের প্রকোপ বৃদ্ধি পায়। নিরাপদ পানীয় জলের অভাব, স্যানিটেশন ব্যবস্থার ভাঙন এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। শিশু, নারী ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে।
এই বহুমাত্রিক সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন সুসংগঠিত, সমন্বিত এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। প্রথমত, নদী ও হাওর দখলমুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। এটি শুধু প্রশাসনিক অভিযান দিয়ে সম্ভব নয়; বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সামাজিক আন্দোলন এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের সমন্বয় প্রয়োজন। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ এবং জলাধার পুনরুদ্ধারে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সমন্বিত নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা (Integrated River Basin Management) চালু করা জরুরি। নদীর উজান থেকে ভাটি পর্যন্ত একটি সামগ্রিক পরিকল্পনার আওতায় এনে পানি প্রবাহ, পলি ব্যবস্থাপনা এবং নাব্যতা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে। নিয়মিত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে, যাতে নদীগুলো তাদের স্বাভাবিক গভীরতা ফিরে পায়।
তৃতীয়ত, হাওর অঞ্চলের জন্য পৃথক উন্নয়ন নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। টেকসই বাঁধ নির্মাণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং আধুনিক পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। একই সঙ্গে, প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ অবাধ রাখতে হবে, যাতে পানি সহজে প্রবেশ ও নির্গমন করতে পারে।
চতুর্থত, নগর পরিকল্পনায় জলাধার সংরক্ষণকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। শহরের খাল, বিল ও জলাশয় পুনরুদ্ধার এবং আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অপরিকল্পিত নগরায়ন বন্ধ না করলে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি সম্ভব নয়।
পঞ্চমত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজন কৌশল জোরদার করতে হবে। আগাম বন্যা সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, বন্যা সহনশীল ফসলের চাষ, বিকল্প জীবিকা এবং দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জলবায়ু তহবিলের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
ষষ্ঠত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় মৌলিক পরিবর্তন আনা জরুরি। নদী ও খালে বর্জ্য ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে এবং আধুনিক বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতি গ্রহণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য।
সপ্তমত, স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে অংশগ্রহণমূলক পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। হাওর ও নদী ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে কাজে লাগাতে হবে। এতে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন আরও কার্যকর ও টেকসই হবে।
সবশেষে, এই সংকটকে শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। নদী ও হাওর রক্ষা করা মানে দেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনমান রক্ষা করা। বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে অব্যবস্থাপনা, লোভ ও পরিবেশ ধ্বংসের পথ; অন্যদিকে টেকসই উন্নয়ন, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা এবং প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের পথ।
আমাদের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ। যদি আমরা এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিই, তবে খুব শিগগিরই বর্ষা মৌসুম আমাদের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং এক অবিরাম দুর্ভোগের প্রতীক হয়ে উঠবে। নদী ও হাওর বাঁচানো আর বিলাসিতা নয়-এটি এখন বেঁচে থাকার প্রশ্ন। কারণ, নদী ও হাওর বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে; আর এগুলো ধ্বংস হলে আমাদের উন্নয়নের সব স্বপ্নই একসময় পানির স্রোতে ভেসে যাবে।
তৈয়বুর রহমান
শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট