প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০২ এপ্রিল, ২০২৬
বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার মধ্যেই এক গভীর বৈপরীত্য চোখে পড়ে শিক্ষিত বেকারত্বের ক্রমবর্ধমান চাপ। উচ্চশিক্ষা অর্জনের হার বাড়ছে, কিন্তু কর্মসংস্থানের সুযোগ সেই হারে তৈরি হচ্ছে না। ফলে দেশের বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত তরুণ আজ অনিশ্চয়তার এক কঠিন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ (Labour Force Survey 2023) অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১৯.৪ লাখ যুবক-যুবতী বেকার, যা মোট যুব শ্রমশক্তির প্রায় ৭ শতাংশের বেশি। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দেশের মোট বেকারের প্রায় ৭৮ থেকে ৭৯ শতাংশই তরুণ। অর্থাৎ, বেকারত্বের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছে শিক্ষিত যুবসমাজ। এই সংকটের গভীরতা আরও স্পষ্ট হয় যখন শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। একই জরিপ অনুযায়ী, মোট বেকারদের মধ্যে প্রায় ৩০ থেকে ৩২ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত, অর্থাৎ স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। দেশে বর্তমানে প্রায় ৮ থেকে ৯ লাখ বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক বেকার রয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিবছর প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ নতুন তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, কিন্তু কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে তার তুলনায় অনেক কম। ফলে প্রতি বছরই বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে যুব বেকারত্বের হার প্রায় ১০.৬ শতাংশ, যা জাতীয় গড়ের তুলনায় দ্বিগুণের কাছাকাছি। একইসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের প্রায় ১৮ থেকে ১৯ শতাংশ যুবক-যুবতী NEET অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ তারা না কোনো শিক্ষায়, না কোনো চাকরিতে, না কোনো প্রশিক্ষণে যুক্ত। এই শ্রেণির মধ্যে নারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি, যা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যেরও ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (BIDS)-এর এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৪৭ শতাংশ স্নাতক তাদের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চাকরি পাচ্ছে না। অর্থাৎ, যারা কাজ পাচ্ছেন, তাদের অনেকেই নিজের যোগ্যতার চেয়ে নিচের স্তরের কাজে যুক্ত হচ্ছেন। এই “underemployment” সমস্যাটিও সমানভাবে উদ্বেগজনক।
এই পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্ট করে দেয় সমস্যাটি শুধু বেকারত্ব নয়, বরং একটি কাঠামোগত অসামঞ্জস্য। শিক্ষাব্যবস্থা এবং কর্মবাজারের চাহিদার মধ্যে একটি বড় ধরনের ফাঁক তৈরি হয়েছে যা স্কিল গ্যাপ নামে পরিচিত । আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাত্ত্বিক জ্ঞানের ওপর জোর দেওয়া হলেও বাস্তব দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি অর্জন করলেও তারা কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। অন্যদিকে, সরকারি চাকরির প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সীমিত সংখ্যক সরকারি পদের জন্য লাখ লাখ প্রার্থী প্রতিযোগিতা করছে। অনেক তরুণ বছরের পর বছর ধরে শুধুমাত্র সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিতে গিয়ে সময় ও সম্ভাবনা হারাচ্ছেন। শিক্ষিত বেকারত্বের এই সংকটের সামাজিক প্রভাবও গভীর। দীর্ঘদিন বেকার থাকার ফলে তরুণদের মধ্যে হতাশা ও মানসিক চাপ বাড়ছে। পরিবারে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক অস্থিরতাও বাড়ছে। একইসঙ্গে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশমুখী হয়ে পড়ছে, যা দেশের জন্য মেধাপাচারের ঝুঁকি তৈরি করছে।
এই বাস্তবতায় সমাধানের পথ খুঁজে বের করা জরুরি। প্রথমত, শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করতে হবে। কারিগরি ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিল্পখাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তৃতীয়ত, তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা ও প্রণোদনা দিতে হবে। সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের শিক্ষিত যুবসমাজ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তারা যেমন দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ, তেমনি অবহেলিত হলে সবচেয়ে বড় সংকটেও পরিণত হতে পারে।
তৌসিফ রেজা আশরাফী
লেখক, শিক্ষার্থী ও কলামিস্ট, দিনাজপুর আইন কলেজ