প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০২ এপ্রিল, ২০২৬
দেশের জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্য তামাক এক ভয়াবহ অভিশাপ। কিন্তু এই অভিশাপের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে তামাকপণ্যের অবৈধ বাণিজ্য বা চোরাচালান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তামাকের কর বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনার সমান্তরালে একটি গৎবাঁধা বয়ান বারবার সামনে আনা হচ্ছে- ‘কর বাড়লে চোরাচালান বাড়ে’। অত্যন্ত সুকৌশলে তামাক কোম্পানিগুলো এই প্রচারণাকে জনমনে এবং নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই তথ্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বিশাল কারসাজি, যার মূল লক্ষ্য জনস্বাস্থ্য রক্ষা নয়, বরং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মুনাফা সুরক্ষা। বাংলাদেশে তামাকপণ্যের ওপর যখনই কর বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়, তখনই তামাক কোম্পানিগুলো দাবি করে যে, এতে বিড়ি-সিগারেটের দাম বাড়বে এবং প্রতিবেশী দেশ থেকে সস্তা সিগারেট অবৈধভাবে দেশের বাজারে প্রবেশ করবে। এর ফলে সরকার রাজস্ব হারাবে। আপাতদৃষ্টিতে এই যুক্তিকে যৌক্তিক মনে হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা এবং বিশ্বব্যাংকের গবেষণা বলছে, তামাকের উচ্চমূল্যের চেয়েও চোরাচালানের প্রধান কারণ হলো দুর্বল সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক দুর্নীতি এবং তামাক কোম্পানিগুলোর নিজস্ব সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে অনীহা।
প্রকৃতপক্ষে, তামাক কোম্পানিগুলো নিজেরাই অনেক সময় পরোক্ষভাবে চোরাচালানকে উৎসাহিত করে। ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি)সহ বড় কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে অতীতে বিভিন্ন দেশে অবৈধ বাণিজ্যে লিপ্ত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। চোরাচালানের দোহাই দিয়ে তারা মূলত সরকারকে উচ্চ কর আরোপ থেকে বিরত রাখতে চায়। যখন কর কম থাকে, তখন তাদের মুনাফা বাড়ে, আর সাধারণ মানুষের জন্য তামাকজাত পণ্য সহজলভ্য থেকে যায়।
তামাক কোম্পানিগুলোর একটি বড় দাবি হলো- অবৈধ সিগারেটের কারণে সরকার শত শত কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। অথচ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য এবং স্বাধীন গবেষকদের জরিপ বলছে, বাংলাদেশে অবৈধ সিগারেটের বাজার মাত্র ১ শতাংশ থেকে ২ শতাংশ। এই নগণ্য পরিমাণকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তামাক কোম্পানিগুলো একটি ‘রাজস্ব সংকটের’ ভীতি তৈরি করে। লক্ষ্য একটাই- সরকার যেন তামাকের দাম না বাড়ায়।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, তামাকের দাম বাড়লে যদি ব্যবহার কমে, তবে জনস্বাস্থ্যের উন্নতি হয়। চিকিৎসা খাতে সরকারের যে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ সাশ্রয় হয়, সেই সত্যটি তামাক কোম্পানিগুলো কৌশলে এড়িয়ে যায়। তামাকজনিত রোগে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষ মারা যায় এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই বিশাল ক্ষতির তুলনায় তথাকথিত ‘রাজস্ব হানির’ যুক্তি অত্যন্ত ঠুনকো।
তামাক চোরাচালান প্রতিরোধের জন্য আন্তর্জাতিক চুক্তি ‘প্রটোকল টু এলিমিনেট ইলিসিট ট্রেড ইন টোব্যাকো প্রোডাক্টস’ (FCTC Protocol) রয়েছে। বাংলাদেশ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও এর বাস্তবায়নে ধীরগতি লক্ষ্য করা যায়। তামাক পণ্যের উৎপাদন থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও ট্রেসিং সিস্টেম চালু করা গেলে সহজেই অবৈধ বাণিজ্য রোধ করা সম্ভব। কিন্তু তামাক কোম্পানিগুলোর জোরালো লবিংয়ের কারণে এই ব্যবস্থাগুলো বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি করা হয়।
এছাড়া, দেশের অভ্যন্তরে নিম্নস্তরের সিগারেটের মূল্য এতটাই কম যে, বাইরে থেকে সিগারেট স্মাগলিং করে নিয়ে আসা খুব একটা লাভজনক নয়। ফলে চোরাচালানের ভয় দেখিয়ে কর ফাঁকি দেওয়া আসলে একটি সুসংগঠিত ‘মিথ্যা প্রচারণা’ বা প্রোপাগান্ডা ছাড়া আর কিছুই নয়।
তামাক চোরাচালানের প্রকৃত সত্য হলো- এটি তামাক কোম্পানিগুলোর একটি ঢাল। তারা এই ঢাল ব্যবহার করে টেকসই কর কাঠামো প্রণয়নে বাধা দেয়। তামাকের বর্তমান জটিল কর কাঠামো (চারটি স্তর) নিজেই একটি বড় সমস্যা। এই স্তরীভূত কর কাঠামোর কারণে ভোক্তারা উচ্চস্তর থেকে নিম্নস্তরে স্থানান্তরিত হওয়ার সুযোগ পায়, ফলে তামাকের ব্যবহার কমে না। কর কাঠামো সহজ করে সব সিগারেটের ওপর অভিন্ন উচ্চ করারোপ করলে তামাকের ব্যবহার যেমন কমত, তেমনি সরকারের রাজস্বও বাড়ত। কিন্তু চোরাচালানের ‘জুজু’ দেখিয়ে এই প্রক্রিয়াকে বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে। তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার পথে তামাক চোরাচালানের এই অপপ্রচার রুখতে সিগারেটের জটিল স্তরভিত্তিক কর পদ্ধতি বাতিল করে একটি সুনির্দিষ্ট (Specific) কর ব্যবস্থা চালু করা। উৎপাদিত প্রতিটি তামাক পণ্যের গায়ে ডিজিটাল স্ট্যাম্প এবং ট্র্যাকিং কোড নিশ্চিত করা। বিজিবি এবং কাস্টমস কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়িয়ে চোরাচালান জিরো টলারেন্সে নামিয়ে আনা। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনে তামাক কোম্পানিগুলোর অযাচিত হস্তক্ষেপ এবং মিথ্যা প্রচারণা রুখতে কঠোর অবস্থান নেওয়া।
তামাক চোরাচালান একটি সমস্যা হতে পারে; কিন্তু এটি তামাকের কর বৃদ্ধির পথে কোনো বাধা হওয়া উচিত নয়। প্রকৃত সত্য হলো, তামাক কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসার স্বার্থে মিথ্যা ভীতি ছড়ায়। জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে এই কুয়াশাচ্ছন্ন প্রচারণার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তামাকের ওপর উচ্চহারে করারোপ এবং চোরাচালান রোধের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার- এই দুইয়ের সমন্বয়েই সম্ভব একটি সুস্থ ও তামাকমুক্ত প্রজন্ম গড়ে তোলা। মনে রাখতে হবে, মানুষের জীবনের মূল্য কোনোভাবেই তামাক কোম্পানির মুনাফার চেয়ে কম হতে পারে না।