ঢাকা সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ২৩ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

মৃত্যুর উপত্যকায় তারুণ্য

মো. বাইজিদ শেখ
মৃত্যুর উপত্যকায় তারুণ্য

একটি গভীর দীর্ঘশ্বাস, একটি অভিমানী চিরকুট, আর চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া একটি স্পন্দন- এভাবেই কি একটি সম্ভাবনাময় জীবনের গল্প শেষ হওয়ার কথা ছিল? যে বয়সে তরুণদের চোখে থাকার কথা ভবিষ্যৎ গড়ার রঙিন স্বপ্ন, সে বয়সেই তারা বেছে নিচ্ছে নিকষ কালো অন্ধকার। আজকাল খবরের পাতা বা নিউজফিডে চোখ রাখলেই বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার খবরগুলো বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। সম্ভাবনাময় একেকটি প্রাণ নীরবে, সবার অলক্ষ্যে ঝরে যাচ্ছে। কোনো তরুণ যখন জীবনের সব আশা ছেড়ে দিয়ে মৃত্যুর মতো এমন একটি চরম ও কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়, তখন এই সমাজ খুব সহজেই তার ওপর ‘পরাজিত’ বা ‘মানসিকভাবে দুর্বল’ হওয়ার তকমা সেঁটে দিয়ে নিজেদের দায় এড়াতে চায়। কিন্তু আমরা কি একটিবারও তলিয়ে দেখি, এই অকাল প্রয়াণের দায়ভার কি কেবলই সেই মানুষটির একার? নাকি আমাদের সমাজ, শিক্ষাব্যবস্থা আর সফলতার অন্ধ প্রতিযোগিতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে তাকে এই খাদের কিনারায় ঠেলে দেওয়ার মূল কারণ?

আমাদের সমাজকাঠামোতে একজন তরুণের জীবন যেন তার নিজের নয়; বরং তা পরিবার ও সমাজের অন্তহীন প্রত্যাশা পূরণের এক নির্মম রেসট্র্যাক। ছোটবেলা থেকেই তাদের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয় সফলতার এক অদৃশ্য বোঝা। জিপিএ ফাইভ, নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়া এবং পরবর্তীতে একটি ‘নিরাপদ’ বা উচ্চ বেতনের চাকরির পেছনে ছুটতে গিয়ে তরুণরা নিজেদের সত্তাকে হারিয়ে ফেলছে। এই প্রতিযোগিতায় নেমে তারা ভুলে যাচ্ছে কীভাবে হাসতে হয়, কীভাবে নিজের মতো করে স্বপ্ন দেখতে হয়। রাতের পর রাত জেগে তারা শুধু ভাবে, ‘আমি কি পারব?’, ‘যদি ব্যর্থ হই, পরিবারকে কী মুখ দেখাব?’। এই ইঁদুর দৌড়ে যারা সামান্য হোঁচট খায়, সমাজ নির্দয়ভাবে তাদের গায়ে ব্যর্থতার সিলমোহর দিয়ে দেয়। সমবয়সীদের সঙ্গে তুলনার বিষবাণ তাদের প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত করে। এই অবিরত চাপ এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ একজন তরুণকে তীব্র একাকীত্ব ও হতাশার দিকে ঠেলে দেয়। চারপাশের কোলাহলের মধ্যেও সে অনুভব করে এক ভয়াবহ শূন্যতা, যা একসময় তাকে আত্মহত্যার মতো চূড়ান্ত পরিণতির দিকে প্ররোচিত করে।

শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে আমরা যতটা সোচ্চার, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমরা ঠিক ততটাই উদাসীন ও নিষ্ঠুর। একটি ছেলে বা মেয়ে যখন হাসিমুখে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়, আমরা কি কখনও খেয়াল করি তার চোখের ভেতরের গভীর বিষণ্ণতা? বিষণ্ণতা, উদ্বেগ (অহীরবঃু), বা তীব্র মানসিক চাপকে আজও আমাদের সমাজে ‘পাগলামি’, ‘নাটক’ বা ‘ধর্মীয় বিশ্বাসের অভাব’ হিসেবে দেখা হয়। একজন শিক্ষার্থী যখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে, তখন তার কথা শোনার বা তাকে পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের আওতায় আনার মতো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা আমাদের পরিবার বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নেই। সে যখন বাঁচতে চেয়ে হাত বাড়ায়, আমরা তাকে ‘অকৃতজ্ঞ’ বলি। মনের ভেতরে জমতে থাকা এই নীরব রক্তক্ষরণ, নিজেকে অপাঙ্?ক্তেয় ভাবার এই যন্ত্রণা একসময় তাকে মৃত্যুর উপত্যকায় নিয়ে যায়। সে বোঝাতে পারে না যে, সে মরতে চায়নি, সে শুধু তার কষ্টগুলোর মৃত্যু চেয়েছিল।

বিষয়টিকে কেবল সামাজিক বা আবেগিক দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে, আইনি ও মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। আমাদের সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের ‘জীবনের অধিকার’ (জরমযঃ ঃড় খরভব)-কে একটি অলঙ্ঘনীয় মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু বাহ্যিক আঘাত থেকে নাগরিককে রক্ষা করা নয়, বরং এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা যেখানে একজন নাগরিক সুস্থ ও সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে। পর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কাঠামোগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারা কি পরোক্ষভাবে সেই সাংবিধানিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন নয়?

অন্যদিকে, আমাদের ঔপনিবেশিক আমলের দণ্ডবিধির (চবহধষ ঈড়ফব, ১৮৬০) ৩০৯ ধারা অনুযায়ী, আত্মহত্যার চেষ্টাকে এখনও একটি দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। যে মানুষটি চরম মানসিক যন্ত্রণায় ভুগে, পৃথিবীর সমস্ত আলো নিভে গেছে ভেবে অন্ধকারের দিকে পা বাড়াতে চেয়েছিল, বেঁচে গেলে তাকে আইনি কাঠগড়ায় দাঁড় করানো বা শাস্তির ভয় দেখানো কতটা অমানবিক হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। আধুনিক আইনবিজ্ঞান বা জুরিসপ্রুডেন্স তীব্রভাবে দাবি করে, আত্মহত্যার চেষ্টাকারী কোনো অপরাধী নন; তিনি একজন চরম ভুক্তভোগী। তার প্রয়োজন কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ বা জরিমানা নয়, তার প্রয়োজন সহানুভূতিশীল মানসিক চিকিৎসা ও বাঁচার মতো আইনি সুরক্ষা।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু জিপিএ আর সার্টিফিকেট উৎপাদনের কারখানা হলে চলবে না; এগুলোকে হতে হবে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল। শিক্ষকরা কেন বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিতে পারবেন না? প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর ও সার্বক্ষণিক সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং সেন্টার স্থাপন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। শিক্ষকদের হতে হবে আরও বেশি শিক্ষার্থীবান্ধব, যাদের কাছে একজন শিক্ষার্থী তার মনের গভীর ক্ষত নির্দ্বিধায় খুলে বলতে পারবে। পাশাপাশি, জাতীয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও এর বাস্তবায়ন এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

আত্মহত্যা কোনো একক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একজন তরুণের আত্মহত্যা মূলত আমাদের সামাজিক কাঠামোর এক চরম ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি এটি এক ধরনের ‘কাঠামোগত হত্যা’ (ঝঃৎঁপঃঁৎধষ সঁৎফবৎ)। একটি ছেলে বা মেয়ে যখন গলায় ফাঁস দেয়, সে আসলে কেবল দড়িতে ঝোলে না; সে ঝোলে আমাদের সমাজের চাপিয়ে দেওয়া অমানবিক নিয়মের যাঁতাকলে। সমাজকে বুঝতে হবে, একটি মৃত স্বপ্নের চেয়ে, একটি ফার্স্ট ক্লাসের চেয়ে একটি জীবন্ত প্রাণ অনেক বেশি মূল্যবান। দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে আসুন আমরা সহানুভূতি ও ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিই। একটিবার তাদের কাঁধে হাত রেখে বলি, ‘আমি আছি, তোমার যে কোনো পরিস্থিতিতে আমি আছি।’ হয়তো এই একটি পরম মমতাময়ী বাক্যই ফিরিয়ে আনতে পারে মৃত্যুর উপত্যকায় হারিয়ে যেতে বসা কোনো অমূল্য প্রাণকে।

মো. বাইজিদ শেখ

তরুণ কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, গাপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত