প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৬ এপ্রিল, ২০২৬
একটি রাষ্ট্রের সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা প্রধানত দুটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে : সচল অর্থনীতি এবং সুসংহত আইনশৃঙ্খলা। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে এই দুইয়ের মধ্যকার সম্পর্কটি শুধু নিবিড়ই নয়, বরং অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। জননিরাপত্তা ও আইনের শাসন যেখানে ভঙ্গুর, সেখানে উন্নয়নের চাকা থমকে যেতে বাধ্য। আবার অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য যেখানে চরম পর্যায়ে পৌঁছায়, সেখানে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা হয়ে পড়ে দুরুহ। তাই টেকসই উন্নয়নের জন্য এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান চ্যালেঞ্জ।
যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ। একজন উদ্যোক্তা যখন কোনো শিল্প বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠায় পুঁজি বিনিয়োগ করেন, তখন তিনি সবার আগে খোঁজেন নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। চাঁদাবাজি, অপহরণ, রাজনৈতিক সহিংসতা কিংবা বিচারহীনতার সংস্কৃতি যেখানে বিদ্যমান, সেখানে বিনিয়োগকারীরা পুঁজি নিয়ে আসতে ভয় পান। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চিত্রটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। বিনিয়োগকারীরা দেখেন যে, সেখানে চুক্তির বাস্তবায়ন আইনের মাধ্যমে সুরক্ষিত কি না এবং তাদের জানমালের নিরাপত্তা কতটুকু। যেখানে আইনের শাসন বজায় থাকে, সেখানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয় এবং দুর্নীতির সুযোগ কমে আসে, যা পর্যায়ক্রমে একটি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করে।
সরকার যখন মেগা প্রকল্প বা বড় ধরনের অবকাঠামো উন্নয়নে হাত দেয়, তখন সেগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্যতম দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। যদি নির্মাণাধীন প্রকল্পে চুরি, শ্রমিক অসন্তোষ বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড লেগেই থাকে, তবে প্রকল্পের ব্যয় ও সময় উভয়ই বৃদ্ধি পায়। এটি জাতীয় অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপের সৃষ্টি করে। অর্থাৎ, ভৌত অবকাঠামো গড়ে তোলা যতটা জরুরি, তার চেয়েও বেশি জরুরি সেই অবকাঠামো ব্যবহারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
একটি দেশের পর্যটন খাত সরাসরি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। পর্যটকরা কেবল তখনই কোনো দেশ ভ্রমণে আগ্রহী হন, যখন তারা নিজেদের নিরাপদ বোধ করেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সামান্য অবনতিও পর্যটনশিল্পে ধস নামাতে পারে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একইভাবে ব্যাংকিং খাত, বিমা এবং পরিবহন খাতের সুষ্ঠু পরিচালনার জন্যও একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশ অপরিহার্য। যখন কোনো রাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা শিথিল হয়ে পড়ে, তখন সেখানে ‘ছায়া অর্থনীতি’ বা অবৈধ অর্থনীতির প্রসার ঘটে। মাদক ব্যবসা, চোরাচালান এবং অবৈধ অর্থপাচারের মতো অপরাধগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এর ফলে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতি হয় এবং দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার হয়ে যায়। শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা থাকলে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড রোধ করা সম্ভব, যার ফলে রাষ্ট্রের প্রকৃত আয় বৃদ্ধি পায় এবং তা জনকল্যাণে ব্যয় করা যায়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আইনশৃঙ্খলা শুধু পুলিশি ব্যবস্থার বিষয় নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গেও যুক্ত। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী যখন অনুভব করে যে আইন সবার জন্য সমান নয়, তখন তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও বিশৃঙ্খলা তৈরির প্রবণতা দেখা দেয়। দারিদ্র্যের কারণে অপরাধপ্রবণতা বাড়ে, আবার অপরাধের কারণে দরিদ্র মানুষের জানমালের ক্ষতি হয় বেশি। তাই টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে ‘শান্তি, ন্যায়বিচার ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান’ গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আইনশৃঙ্খলা একে অপরের পরিপূরক। আইনশৃঙ্খলা যদি হয় দেহের কঙ্কাল, তবে অর্থনীতি হলো তার রক্তসঞ্চালন। কঙ্কাল দুর্বল হলে দেহ যেমন সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, তেমনি রক্তসঞ্চালন বন্ধ হলে জীবন স্তব্ধ হয়ে যায়। একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হলে সরকারকে যেমন অর্থনৈতিক সংস্কারে মনোযোগ দিতে হবে, তেমনি পুলিশ ও বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং আধুনিকায়ন করতে হবে। নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের নির্বিঘ্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলেই শুধু উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হবে। নচেৎ, কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে, সাধারণ মানুষের জীবনে তার সুফল পৌঁছাবে না। একটি শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল সমাজই হলো উন্নত অর্থনীতির মূল প্রবেশদ্বার।