ঢাকা বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ২৫ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

খাল খনন : অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এক বিস্মৃত চাবিকাঠি

খাল খনন : অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এক বিস্মৃত চাবিকাঠি

বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি ও অর্থনীতির নাড়ির স্পন্দন হলো পানি। হাজার বছর ধরে এদেশের কৃষি, বাণিজ্য ও সংস্কৃতি আবর্তিত হয়েছে নদীকে কেন্দ্র করে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, পলি জমলে নদীর নাব্য হ্রাস এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে আমাদের খাল ও ছোট নদীগুলো আজ বিলুপ্তপ্রায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ‘খাল খনন’ শুধু একটি খনন কাজ নয়, বরং এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এক শক্তিশালী চাবিকাঠি।

বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি এখনও কৃষি। কৃষকদের সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে খালগুলো প্রাকৃতিক ধমনীর মতো কাজ করে। বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ধারণ এবং শুষ্ক মৌসুমে সেই পানি সেচে ব্যবহার করার মাধ্যমে ফসলের নিবিড়তা (Crop Intensity) বহুগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব।

বর্তমানে কৃষকরা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। পাম্পের মাধ্যমে পানি তুলতে প্রচুর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খরচ হয়। খাল খননের মাধ্যমে ভূ-উপরিস্থ পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করলে কৃষকের উৎপাদন খরচ নাটকীয়ভাবে কমে আসবে। উপকূলীয় অঞ্চলে খাল খননের মাধ্যমে মিঠা পানির প্রবাহ সচল রাখা গেলে কৃষিজমিতে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ ঠেকানো সম্ভব, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য।

সড়কপথের তুলনায় নৌপথ অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব। খালগুলো পুনর্খননের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা গেলে পণ্য পরিবহনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। ভারী পণ্য পরিবহনে জ্বালানি সাশ্রয় হবে এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমবে।

গ্রাম ও শহরের সংযোগ স্থাপনে নৌপথ পুনরুজ্জীবিত হলে গ্রামীণ অর্থনীতি সরাসরি জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত হতে পারবে। খালগুলো মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। বিগত কয়েক দশকে খাল ভরাট হওয়ার ফলে আমাদের দেশীয় প্রজাতির অনেক মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। খাল খননের মাধ্যমে জলাধার সৃষ্টি করলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আমিষের চাহিদা পূরণ হবে। মৎস্য আহরণ ও বিপণনের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পাবে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। খালগুলো মূলত ড্রেনেজ সিস্টেম বা পানি নিষ্কাশন নালী হিসেবে কাজ করে।

সামান্য বৃষ্টিতেই ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে যে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, তার প্রধান কারণ হলো খালের দখল ও ভরাট। খাল খনন ও পুনরুদ্ধার করলে শহুরে জনজীবন যেমন স্বস্তিদায়ক হবে, তেমনি বৃষ্টির পানি দ্রুত সরে যাওয়ায় রাস্তাঘাটের স্থায়িত্ব বাড়বে। বর্ষাকালে নদীর উপচে পড়া পানি ধারণ করার ক্ষমতা থাকে খালের। এর ফলে আকস্মিক বন্যার প্রকোপ কমে এবং জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস পায়।

পরিকল্পিতভাবে খাল খনন ও এর পাড় উন্নয়ন করলে তা পর্যটন শিল্পের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। হাতিরঝিল প্রকল্পের মতো বড় শহরের খালগুলোকে কেন্দ্র করে বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব। এটি শুধু বিনোদনই দেবে না, বরং ক্ষুদ্র ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করবে।

এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও খাল খনন প্রক্রিয়ায় কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের দ্বারা খালের জমি দখল হওয়া সবচেয়ে বড় বাধা। খনন করা খালে পুনরায় প্লাস্টিক ও শিল্প বর্জ্য নিক্ষেপ করা হলে তার সুফল দীর্ঘস্থায়ী হয় না। একবার খনন করে ফেলে রাখলে পুনরায় পলি জমে তা ভরাট হয়ে যায়। তাই নিয়মিত ড্রেজিং ও তদারকি প্রয়োজন। ‘পানি সম্পদকে সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করতে না পারলে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন অসম্ভব।

খাল হলো প্রকৃতির এমন এক দান যা আমরা অবহেলায় হারিয়েছি, কিন্তু এটিই হতে পারে আমাদের অর্থনীতির প্রাণভোমরা।’

খাল খনন শুধু মাটি কাটার কাজ নয়; এটি মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি, পরিবেশ রক্ষা এবং দারিদ্র্য বিমোচনের একটি সমন্বিত পরিকল্পনা। ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ বাস্তবায়নে খাল পুনর্খনন ও সংযোগ স্থাপনের কোনো বিকল্প নেই। সরকারের উচিত স্থানীয় জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদীর শাখা-প্রশাখা তথা খালগুলো সচল থাকলে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে বেগবান এবং পরিবেশ হবে বাসযোগ্য। এখনই সময় খালগুলো উদ্ধারের নতুবা আগামী প্রজন্মের কাছে আমরা এক মরুময় বদ্বীপ রেখে যাব।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত