ঢাকা শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬, ২৭ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

সব জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সমঅধিকারের ভিত্তিতেই গড়ে উঠুক আগামীর পার্বত্য চট্টগ্রাম

এম মহাসিন মিয়া
সব জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সমঅধিকারের ভিত্তিতেই গড়ে উঠুক আগামীর পার্বত্য চট্টগ্রাম

সমঅধিকার বলতে আমরা সাধারণত আইনের চোখে সমতা বোঝালেও এর প্রকৃত অর্থ অনেক বিস্তৃত। এটি শুধু কাগজে-কলমে অধিকার নিশ্চিত করা নয়, বরং বাস্তব জীবনে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, ভূমি ব্যবস্থাপনা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। একটি সমাজ তখনই উন্নত ও টেকসই হয়, যখন সেখানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেকে বঞ্চিত বা উপেক্ষিত মনে করে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে কিছু জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। এই অনুভূতি দূর করতে হলে প্রয়োজন আন্তরিকতা, ন্যায়বিচার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নীতি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই অঞ্চলের উপজাতি জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রথাগতভাবে ভিন্নধর্মী। তাদের জীবনধারা, জুম চাষ, প্রথাগত নেতৃত্বব্যবস্থা এবং সামাজিক কাঠামো একটি নিয়ম ধারণ করেছে। একইসঙ্গে এখানে বসবাসরত বাঙালি জনগোষ্ঠীও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অঞ্চলের অর্থনীতি, শিক্ষা ও সামাজিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ একটি বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক বাস্তবতায় গড়ে উঠেছে।

কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও আইন প্রণয়নের ফলে অনেক ক্ষেত্রে প্রথাগত ব্যবস্থার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ভূমি সংক্রান্ত সমস্যাগুলো দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিদ্যমান। উপজাতি ও বাঙালি, উভয় জনগোষ্ঠীর মাঝেই ভূমির মালিকানা, ব্যবহার ও অধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা ও বিরোধ লক্ষ্য করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে উভয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাদের ভূমির অধিকার নিয়ে উদ্বিগ্ন ও সংশয় দেখা যায়। এই জটিল সমস্যার টেকসই সমাধানের জন্য প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ, ন্যায়ভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া, যেখানে উপজাতি ও বাঙালি, উভয় জনগোষ্ঠীর মতামত, অধিকার ও নিরাপত্তাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংলাপ ও আইনের ন্যায়সঙ্গত প্রয়োগের মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য সমাধানই পারে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি ও সম্প্রীতি নিশ্চিত করতে।

শিক্ষা সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। একটি শিক্ষিত সমাজই পারে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান করতে। পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষার প্রসারে এরইমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও এখনও অনেক দুর্গম এলাকায় শিক্ষাসুবিধা সীমিত। বিশেষ করে মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার অভাব অনেক শিশুদের শিক্ষাজীবনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তাই প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতিকে সম্মান জানিয়ে প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। এতে করে তারা শুধু নিজেদের জীবনমান উন্নত করতে পারবে না, বরং পার্বত্য অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

স্বাস্থ্যসেবা খাতেও সমঅধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে অনেক মানুষ এখনও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি, মোবাইল মেডিকেল টিম, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী এবং সচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল জাতিগোষ্ঠীর প্রতিটি মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে, এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম বড় সম্পদ। প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, পোশাক, উৎসব, সংগীত এবং জীবনধারা এই অঞ্চলকে করেছে অনন্য। নববর্ষ, বৈসাবী, বিঝু, সাংগ্রাই, বৈসুকসহ বিভিন্ন উৎসব শুধু আনন্দের উপলক্ষ নয়, বরং পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ঐক্যের প্রতীক। এই বৈচিত্র্যকে রক্ষা করা এবং সম্মান করা অত্যন্ত জরুরি। কোনো জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি যেন বিলুপ্তির মুখে না পড়ে, সেজন্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সাংস্কৃতিক বিনিময়, গবেষণা এবং সংরক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে এই ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিরাপত্তা ও আস্থার পরিবেশ নিশ্চিত করা। একটি অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা তখনই বজায় থাকে, যখন সব মানুষ নিজেদের নিরাপদ মনে করে এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা রাখে। পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিনের বিভিন্ন উত্তেজনা ও সংঘাতের অভিজ্ঞতা থাকলেও বর্তমানে শান্তি ও উন্নয়নের একটি ইতিবাচক ধারা তৈরি হয়েছে। এই ধারাকে অব্যাহত রাখতে হলে সব পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং সংলাপের পরিবেশ বজায় রাখতে হবে।

উন্নয়ন কার্যক্রমে সকল জাতিগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে এবং সেই উন্নয়নের সুফল সবাই সমানভাবে ভোগ করতে পারে। স্থানীয় জনগণকে বাদ দিয়ে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করলে তা দীর্ঘমেয়াদে সফল হয় না। তাই পরিকল্পনা প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্থানীয় মানুষের মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এতে করে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবসম্মত হবে এবং মানুষের মধ্যে মালিকানাবোধ তৈরি হবে।

নারীর ক্ষমতায়নও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নারীরা অনেক ক্ষেত্রেই পরিবার ও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং নেতৃত্বের সুযোগ বৃদ্ধি করা হলে সমাজের সার্বিক উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে। নারীর প্রতি বৈষম্যদূর করে তাদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত।

সবকিছু বিবেচনায় বলা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎনির্ভর করছে সমতা, ন্যায়বিচার এবং সহাবস্থানের ওপর। এখানে বসবাসকারী সব জাতিগোষ্ঠীর প্রতিটি মানুষই এই অঞ্চলের সমান অংশীদার। তাদের অধিকার, মর্যাদা এবং স্বপ্নকে সম্মান জানিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে পারলেই সত্যিকার অর্থে শান্তি ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বিভেদ নয়, ঐক্যই হতে হবে আমাদের শক্তি, বৈষম্য নয়, সমঅধিকারই হতে হবে আমাদের লক্ষ্য। সব জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সমঅধিকার নিশ্চিত করা গেলে পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং বিশ্বের কাছেও একটি অনন্য সহাবস্থানের মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। আগামীর পার্বত্য চট্টগ্রাম হোক এমন এক ভূখণ্ড, যেখানে সব জাতিগোষ্ঠীর প্রতিটি মানুষ সমান মর্যাদায় বাঁচবে, নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে গর্ব করবে এবং সম্মিলিতভাবে একটি শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলবে।

এম মহাসিন মিয়া

সাংবাদিক, লেখক ও আঞ্চলিক গবেষক-পার্বত্য চট্টগ্রাম

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত