ঢাকা শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬, ২৭ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

পৃথিবীর শেষ প্রহর : মানব সভ্যতার সংকটকাল

মিজানুর রহমান মিজান
পৃথিবীর শেষ প্রহর : মানব সভ্যতার সংকটকাল

বিশ্ব আজ এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বের মুখোমুখি একদিকে অভূতপূর্ব প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, অন্যদিকে পরিবেশগত বিপর্যয়ের অশনিসংকেত। উন্নয়ন যেন যত দ্রুত এগিয়েছে, প্রকৃতি ততটাই ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। একসময় যে পৃথিবী মানুষের বসবাসের জন্য ছিল সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, আজ সেই পৃথিবীই হয়ে উঠছে ক্রমশ অনিশ্চিত, ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপন্ন। জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের হ্রাস, বায়ু ও পানিদূষণ- সব মিলিয়ে পরিবেশ এখন বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি ও মানবজীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। এই সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক নানা সংস্থা ও সম্মেলন দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়- এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর, আর ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোচ্ছে?

বিশ্বব্যাপী পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে International Union for Conservation of Nature (IUCN) একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে আসছে। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটি মূলত জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তি তৈরি করে। তাদের প্রকাশিত জবফ List এখন বিশ্বব্যাপী বিপন্ন প্রজাতির একটি নির্ভরযোগ্য সূচক হিসেবে বিবেচিত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে IUCN শুধু একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি নীতিনির্ধারণী প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে, যা সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভবিষ্যতে প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান বা Nature-based Solutions -এর ওপর গুরুত্ব বাড়িয়ে তারা পরিবেশ ও উন্নয়নের মধ্যে একটি সমন্বিত পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে, জলবায়ু ও আবহাওয়াগত তথ্য বিশ্লেষণে World Meteorological Organization (WMO) অপরিহার্য ভূমিকা পালন করছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তন, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা- এসব বিষয়ে নির্ভুল তথ্য ও পূর্বাভাস প্রদান করে WMO বিশ্বকে সতর্ক করে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা উন্নত করা এখন তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। কারণ, একটি সঠিক পূর্বাভাস হাজারো প্রাণ বাঁচাতে পারে, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দুর্যোগপ্রবণ দেশে।

১৯৭২ সালের স্টকহোম সম্মেলনের পর গঠিত United Nations Environment Programme (UNEP) বিশ্বব্যাপী পরিবেশ নীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। UNEP পরিবেশ সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার পাশাপাশি প্লাস্টিক দূষণ, বায়ুদূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ইস্যুগুলোকে বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা Green Economy ধারণাকে জনপ্রিয় করে তুলেছে, যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ব্যাখ্যায় Intergovernmental Panel on Climate Change (IPCC)-এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাজারো বিজ্ঞানীর গবেষণালব্ধ তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তা জলবায়ু সংকট সম্পর্কে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হয়। এসব প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে, মানবসৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এর প্রভাব এরমধ্যেই প্রকৃতি ও মানবজীবনে প্রতিফলিত হচ্ছে। IPCC সতর্ক করেছে, যদি এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা না যায়, তাহলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘনঘন ও তীব্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খাদ্য উৎপাদনে বিঘ্ন এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়ক্ষতির মতো গুরুতর বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে উঠবে। এই সতর্কবার্তা এখন আর শুধু বৈজ্ঞানিক পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ নেই; বরং বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি ও নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও গভীর প্রভাব ফেলছে এবং দেশগুলোকে টেকসই উন্নয়ন ও কার্বন নির্গমন হ্রাসের দিকে আরও দায়িত্বশীল হতে বাধ্য করছে।

অর্থায়নের ক্ষেত্রে Global Environment Facility (GEF) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহায়তা করার জন্য এঊঋ বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়ন করে থাকে। তবে বাস্তবতা হলো, প্রয়োজনের তুলনায় এই অর্থায়ন এখনও অপর্যাপ্ত। উন্নয়নশীল দেশগুলো বারবার অভিযোগ করে আসছে যে, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পর্যাপ্ত সহায়তা পাচ্ছে না। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৯২ সালে গৃহীত United Nations Framework Convention on Climate Change (UNFCCC) একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি মূলত জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় একটি আন্তর্জাতিক কাঠামো তৈরি করে দেয়। এই কাঠামোর অধীনেই প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় ঈঙচ ঈষরসধঃব ঈড়হভবৎবহপব সম্মেলন, যেখানে বিশ্বের প্রায় সব দেশ অংশগ্রহণ করে। কিয়োটো প্রটোকল থেকে শুরু করে প্যারিস চুক্তি- সবই এই সম্মেলনের ফলাফল। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনও অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, বিশেষ করে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে মতবিরোধ।

জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দেশগুলোর কণ্ঠস্বর হিসেবে Climate Vulnerable Forum (CVF) Ges Vulnerable Twenty Group (V-20) আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।

এসব প্ল্যাটফর্ম উন্নয়নশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিন্ন স্বার্থ তুলে ধরে বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ এই দুটি জোটের অন্যতম সক্রিয় ও অগ্রণী সদস্য হিসেবে জলবায়ু কূটনীতিতে উল্লেখযোগ্য নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। তারা ধারাবাহিকভাবে ‘জলবায়ু ন্যায়বিচার’-এর দাবি উত্থাপন করছে, যেখানে মূল বক্তব্য হলো- যেসব উন্নত দেশ ঐতিহাসিকভাবে বেশি কার্বন নিঃসরণের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী, তাদেরই এই সংকট মোকাবিলায় বেশি আর্থিক, প্রযুক্তিগত ও নৈতিক দায়িত্ব নিতে হবে। এই দাবির মাধ্যমে বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনায় একটি ন্যায্য ও ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোর মধ্যে Rio+10 এবং Rio+20 বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব সম্মেলনে টেকসই উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে একসঙ্গে বিবেচনা করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। Green Economy Ges Sustainable Development Goals (SDGs) এই ধারণাগুলো এসব সম্মেলনের মাধ্যমেই ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। তবে এতসব উদ্যোগের পরও বিশ্বের পরিবেশ পরিস্থিতি খুব আশাব্যঞ্জক নয়। বৈশ্বিক উষ্ণতা ক্রমাগত বাড়ছে, মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বন উজাড় ও জীববৈচিত্র্যের হ্রাস এখন ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। শহরগুলোতে বায়ুদূষণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেক জায়গায় শ্বাস নেওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। এসব সংকটের মূল কারণ হিসেবে অতিরিক্ত শিল্পায়ন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এবং ভোগবাদী জীবনযাত্রাকে দায়ী করা হয়।

বাংলাদেশ এই বৈশ্বিক সংকটের একটি জীবন্ত উদাহরণ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন- এসব যেন বাংলাদেশের নিত্যদিনের বাস্তবতা। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি কৃষি ও পানীয় জলের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। রাজধানী ঢাকা বিশ্বের অন্যতম দূষিত শহর হিসেবে পরিচিত। তবে সবকিছুর মধ্যেও বাংলাদেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে- যেমন নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, জলবায়ু অভিযোজন কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেতৃত্ব প্রদান। ভবিষ্যতের দিকে তাকালে দেখা যায়, মানবতার সামনে এখন তিনটি পথ খোলা। প্রথমত, বর্তমান ধারা অব্যাহত রাখা- যা আমাদের আরও বড় বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, আংশিক পরিবর্তন- যা কিছুটা উন্নতি আনতে পারে, কিন্তু ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করবে না। তৃতীয়ত, মৌলিক বা রূপান্তরমূলক পরিবর্তন- যেখানে উন্নয়ন, পরিবেশ ও সমাজের মধ্যে একটি সুষম সম্পর্ক তৈরি করা হবে। এই তৃতীয় পথটিই সবচেয়ে কার্যকর, কিন্তু বাস্তবায়ন সবচেয়ে কঠিন।

পরিবেশ রক্ষা এখন আর শুধু একটি নীতিগত বিষয় নয়; এটি মানবসভ্যতার অস্তিত্বের প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক সংস্থা, সম্মেলন ও চুক্তিগুলো একটি কাঠামো তৈরি করে দিয়েছে, কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন আনতে হলে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, অর্থনৈতিক বিনিয়োগ এবং সর্বোপরি মানুষের সচেতনতা। পৃথিবীকে রক্ষা করা এখন আর কোনো একক দেশের দায়িত্ব নয়- এটি একটি বৈশ্বিক দায়িত্ব, যেখানে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমাদের এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে- আমরা কি আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে চাই, নাকি উন্নয়নের নামে ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাব? সময় খুব বেশি নেই, কিন্তু সুযোগ এখনও আছে। সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারলেই হয়তো আমরা একটি সুন্দর, টেকসই ও নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তুলতে পারব।

মিজানুর রহমান মিজান

সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত