ঢাকা শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ৫ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

গরমকালীন স্বাস্থ্য সংকট : পরিবর্তিত জলবায়ু ও বাড়তে থাকা রোগঝুঁকির বাস্তবতা

ডা. মু. মাহতাব হোসাইন মাজেদ
গরমকালীন স্বাস্থ্য সংকট : পরিবর্তিত জলবায়ু ও বাড়তে থাকা রোগঝুঁকির বাস্তবতা

বাংলাদেশে গ্রীষ্মকাল শুরু হলেই তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এপ্রিল-মে মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা প্রায়ই ৩৮ক্ক থেকে ৪২ক্ক সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়। কোনো কোনো এলাকায় তা ৪৩ক্ক সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছে। এই তীব্র তাপপ্রবাহ জনজীবনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে- বিশেষ করে শহরাঞ্চল, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ এবং নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য এটি হয়ে ওঠে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্রায় ৪.৮ লক্ষ্য মানুষ তাপপ্রবাহজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। দক্ষিণ এশিয়ার মতো উষ্ণ ও ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে এই ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে আরও বেশি। বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাপজনিত অসুস্থতা, হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগামী দশকে এই ঝুঁকি আরও বহুগুণে বাড়তে পারে।

তীব্র গরম শুধু অস্বস্তি নয়; এটি শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করে এবং একাধিক রোগের ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। ফলে গ্রীষ্মকাল এখন আর শুধু মৌসুমি সময় নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সতর্কতার সময় হিসেবে বিবেচিত হওয়া জরুরি।

শরীরের উপর তাপপ্রবাহের প্রভাব: নীরব কিন্তু গভীর বিপর্যয় মানবদেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৩৬.৫ক্ক থেকে ৩৭.৫ক্ক সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে। এই ভারসাম্য নষ্ট হলে শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। অতিরিক্ত গরমে শরীর ঘামের মাধ্যমে তাপ বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে; কিন্তু দীর্ঘসময় রোদে কাজ করলে শরীর দ্রুত পানি ও লবণ হারায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের মাত্র ২ শতাংশ পানি কমে গেলে কর্মক্ষমতা প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। এই অবস্থায় দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, বমিভাব, অতিরিক্ত ঘাম, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া এবং অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। পরিস্থিতি গুরুতর হলে এটি হিটস্ট্রোকে রূপ নিতে পারে, যা দ্রুত চিকিৎসা না পেলে প্রাণঘাতী হতে পারে।

এছাড়া দীর্ঘস্থায়ী গরম মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে- বিরক্তি, অনিদ্রা, ক্লান্তি এবং মনোযোগের ঘাটতি এই সময় অনেক বেড়ে যায়।

গ্রীষ্মকালীন রোগবৃদ্ধি : ক্রমবর্ধমান বাস্তবতা গরমকালীন সময়ে হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

পানিশূন্যতা ও দুর্বলতা : পর্যাপ্ত পানি গ্রহণ না করলে ডিহাইড্রেশন দেখা দেয়। এতে রক্তচাপ কমে যায়, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা ও অজ্ঞান হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষ এই সমস্যায় বেশি আক্রান্ত হন।

তাপজনিত অসুস্থতা : দীর্ঘসময় রোদে কাজ করলে হিট এক্সহস্টশন ও হিটস্ট্রোক হতে পারে। WHO -এর মতে, তাপমাত্রা প্রতি ১ক্ক সেলসিয়াস বাড়লে তাপজনিত মৃত্যুঝুঁকি ১-৩% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।

ডায়রিয়া ও পানিবাহিত রোগ : গরমে জীবাণু দ্রুত বৃদ্ধি পায়। দূষিত পানি ও খাবারের কারণে ডায়রিয়া ও আমাশয় ছড়িয়ে পড়ে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বছরে প্রায় ৪ লক্ষাধিক শিশু ডায়রিয়ায় মারা যায়, যার বড় অংশ গরমকালে ঘটে।

টাইফয়েড ও সংক্রমণ : দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে টাইফয়েড দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে।

চর্মরোগ ও ঘামাচি : ঘাম, ধুলাবালি ও আর্দ্র পরিবেশে ফুসকুড়ি, চুলকানি ও ছত্রাকজনিত রোগ বৃদ্ধি পায়।

শ্বাসকষ্ট ও অ্যালার্জি : বায়ুদূষণ ও ধুলাবালির কারণে হাঁপানি ও শ্বাসতন্ত্রের রোগ বেড়ে যায়।

ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী : শিশু, বয়স্ক ও গর্ভবতী নারী তীব্র গরমে শিশুদের শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে যায়। তাদের তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পরিপূর্ণভাবে বিকশিত না হওয়ায় তারা সহজেই অসুস্থ হয়ে পড়ে।

বয়স্কদের ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় হিটস্ট্রোক, হৃদরোগ ও জটিলতার ঝুঁকি বেশি। অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি রোগ গরমে আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গরম মা ও শিশুর উভয়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। পানিশূন্যতা ও শারীরিক চাপ প্রসবকালীন জটিলতা বাড়াতে পারে। তাই বিশেষ যত্ন অপরিহার্য।

নগর জীবনে তাপদ্বীপ প্রভাব : বাড়তি ঝুঁকির বাস্তবতা শহরাঞ্চলে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ পরিস্থিতি তৈরি হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের তাপমাত্রা আশপাশের গ্রামাঞ্চলের তুলনায় ২ক্ক থেকে ৫ক্ক সেলসিয়াস বেশি হতে পারে। কংক্রিটের ঘনবসতি, সবুজের অভাব, যানবাহনের ধোঁয়া এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ এই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। বিদ্যুৎচালিত শীতলীকরণ যন্ত্রের অতিরিক্ত ব্যবহার পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করে এবং বিদ্যুৎচাপ বাড়ায়।

ফলে নগর দরিদ্র জনগোষ্ঠী- যারা খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন- তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

প্রতিরোধ ও করণীয় : ব্যক্তিগত দায়িত্বই প্রথম সুরক্ষা

* প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করা (২.৫-৩ লিটার)

* হালকা ও সুতির পোশাক ব্যবহার

* দুপুর ১২টা-৩টা পর্যন্ত রোদ এড়িয়ে চলা

* বাসি ও খোলা খাবার পরিহার করা

* শিশু ও বয়স্কদের বিশেষ যত্ন নেওয়া

* পরিচ্ছন্নতা ও হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখা

* কর্মস্থলে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা

সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ : সমাধানের অপরিহার্য ভিত্তি

তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় কেবল ব্যক্তিগত সচেতনতা যথেষ্ট নয়। স্থানীয় প্রশাসনকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং নগর ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। গণমাধ্যমে নিয়মিত হিটওয়েভ সতর্কতা প্রচার জরুরি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্য সচেতনতা কার্যক্রম চালু করা দরকার। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ‘হিট অ্যাকশন প্ল্যান’ আরও শক্তিশালী করতে হবে। শ্রমিকদের জন্য কাজের সময় পুনর্বিন্যাস ও ছায়াযুক্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

জলবায়ু পরিবর্তন : ভবিষ্যতের বড় হুমকি

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গত শতকে বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রায় ১.১ক্ক সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে তাপপ্রবাহ আরও ঘন, দীর্ঘ ও ভয়াবহ হবে। বনভূমি ধ্বংস, কার্বন নিঃসরণ এবং শিল্পদূষণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। তাই বৃক্ষরোপণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার এবং পরিবেশ সংরক্ষণ এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।

পরিশেষে বলতে চাই, গরমকালীন স্বাস্থ্য সংকট এখন আর শুধু মৌসুমি সমস্যা নয়; এটি একটি বড় জনস্বাস্থ্য বাস্তবতা। পরিসংখ্যান ও অভিজ্ঞতা বলছে, এই ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে।

ব্যক্তিগত সতর্কতা, সামাজিক সহযোগিতা এবং রাষ্ট্রীয় কার্যকর উদ্যোগ একসঙ্গে কাজ করলে এই সংকট অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সবশেষে বলা যায়- গরম থেকে সুরক্ষা শুধু আরামের বিষয় নয়; এটি জীবন রক্ষার সংগ্রাম। সচেতনতা, দায়িত্ববোধ ও সম্মিলিত উদ্যোগই পারে একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে।

ডা. মু. মাহতাব হোসাইন মাজেদ

লেখক, কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত