ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ১৮ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

দুর্নীতির দুষ্টচক্রে উন্নয়ন : সুশাসন প্রতিষ্ঠার এখনই সময়

মো. রেজাউল করিম রনি
দুর্নীতির দুষ্টচক্রে উন্নয়ন : সুশাসন প্রতিষ্ঠার এখনই সময়

উন্নয়ন শুধু আকাশছোঁয়া সেতু, ঝকঝকে মহাসড়ক, আধুনিক রেলপথ কিংবা সুউচ্চ ভবনের নাম নয়। উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন একজন সাধারণ নাগরিক রাষ্ট্রের প্রতিটি সেবায় ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা এবং সমান অধিকার অনুভব করেন। যখন একজন কৃষক ঘুষ ছাড়া সরকারি প্রণোদনা পান, একজন শিক্ষার্থী মেধার ভিত্তিতে সুযোগ লাভ করেন, একজন উদ্যোক্তা অনিয়মের শিকার না হয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন এবং একজন অসুস্থ মানুষ হাসপাতালের দরজায় দালালচক্রের কাছে অসহায় না হন তখনই একটি রাষ্ট্রকে প্রকৃত অর্থে উন্নয়নশীল বলা যায়। অন্যথায় দৃশ্যমান উন্নয়ন যত বড়ই হোক, তার ভিত দুর্বল থেকে যায়।

বাংলাদেশ গত দুই দশকে উন্নয়নের এক নতুন অধ্যায় রচনা করেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো নির্মাণ, ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষি উৎপাদনে সাফল্য এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন সূচকে অগ্রগতি দেশকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশকে সম্ভাবনাময় অর্থনীতি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি বাস্তবতা দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে উন্নয়নের পাশাপাশি দুর্নীতির অভিযোগ, প্রশাসনিক জটিলতা, আর্থিক অনিয়ম, সেবা খাতে স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং জবাবদিহির সংকট সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয় বরং জনগণের আস্থা। জনগণ যখন বিশ্বাস করে যে তাদের পরিশ্রমের অর্থ, কর এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তখন রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়। কিন্তু যখন উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, নিম্নমানের কাজের অভিযোগ ওঠে কিংবা সরকারি সেবা পেতে মানুষকে অনাকাঙ্ক্ষিত ভোগান্তির শিকার হতে হয়, তখন সেই আস্থার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। দুর্নীতি কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয় এটি এমন একটি ব্যাধি, যা রাষ্ট্রের অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিচারব্যবস্থা, ব্যাংকিং, স্থানীয় সরকার এবং সামাজিক মূল্যবোধকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে। একটি উন্নয়ন প্রকল্পে অপচয় হওয়া অর্থ দিয়ে আরও বহু স্কুল, হাসপাতাল, সড়ক কিংবা কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যেত। কিন্তু অনিয়মের কারণে সেই সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ, যাঁরা রাষ্ট্রের ওপর আস্থা রেখেই কর দেন এবং উন্নয়নের সুফল পাওয়ার প্রত্যাশা করেন। সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও দুর্নীতির প্রভাব গভীর। যখন সৎ মানুষ পিছিয়ে পড়েন আর অনৈতিক উপায়ে সুবিধা নেওয়া ব্যক্তিরা দ্রুত সফল হন, তখন তরুণদের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছে যায়। তারা মনে করতে শুরু করে যোগ্যতা নয়, বরং ক্ষমতা ও প্রভাবই সাফল্যের প্রধান চাবিকাঠি। এটি একটি জাতির নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য দেশি বিদেশি বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা এমন পরিবেশে বিনিয়োগ করতে চান, যেখানে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত থাকে। দুর্নীতি যত বাড়ে, বিনিয়োগের ঝুঁকি তত বাড়ে। ফলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশ এরইমধ্যে সরকারি সেবাকে ডিজিটাল করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। অনলাইন আবেদন, ই-ফাইলিং, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং নাগরিক সেবার আধুনিকীকরণ মানুষের ভোগান্তি কমিয়েছে। তবে প্রযুক্তি তখনই কার্যকর হবে, যখন তার সঙ্গে সৎ প্রশাসন, দক্ষ জনবল এবং কঠোর জবাবদিহি যুক্ত হবে। সুশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো জবাবদিহি। সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তি সবার ক্ষেত্রেই আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও ব্যয়ের তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে যত বেশি স্বচ্ছতা থাকবে, অনিয়মের সুযোগ তত কমবে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে স্বাধীন গণমাধ্যম, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং সচেতন নাগরিক সমাজের ভূমিকা অপরিসীম। একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থায় সততা, নৈতিকতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধের চর্চা জোরদার করতে হবে। দুর্নীতিবিরোধী লড়াই শুধু আদালতে নয় পরিবার, বিদ্যালয় এবং সমাজেও গড়ে ওঠে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে করণীয়

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না এটি হতে হবে জাতীয় অঙ্গীকার। উন্নয়ন প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং তথ্য উন্মুক্তকরণ নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের করের অর্থ কোথায়, কীভাবে এবং কতটুকু ব্যয় হচ্ছে তার স্বচ্ছ হিসাব জনগণের জানার অধিকার।

ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। আর্থিক অনিয়ম, খেলাপি ঋণ ও অর্থপাচারের বিরুদ্ধে দ্রুত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নিতে হবে। একইভাবে সরকারি সেবাকে আরও ডিজিটাল ও নাগরিকবান্ধব করতে হবে, যাতে ঘুষ ও হয়রানির সুযোগ কমে আসে। শিক্ষা, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজকে দুর্নীতিবিরোধী সংস্কৃতি গড়ে তুলতে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইন যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ। বাংলাদেশের সামনে এখন একটি বড় লক্ষ্য একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া। কিন্তু উন্নত রাষ্ট্র হওয়ার শর্ত শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয় বরং এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে আইন সবার জন্য সমান, সরকারি প্রতিষ্ঠান জনগণের কাছে জবাবদিহি করে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় হয় না।

মো. রেজাউল করিম রনি

সাবেক শিক্ষার্থী, স্থাপত্য বিভাগ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত