ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ১৮ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

নারী নিরাপত্তা : আইন ও বাস্তবতার ফারাক

জুহা
নারী নিরাপত্তা : আইন ও বাস্তবতার ফারাক

পত্রিকার পাতা খুললেই কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায় নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, সহিংসতা ও হয়রানির অভিযোগ। এসব যেন আমাদের সমাজের নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ একটি সভ্য ও মানবিক সমাজে নারী এমন পরিবেশে বসবাস করবে, যেখানে সে ভয়, সহিংসতা ও বৈষম্য ছাড়াই স্বাধীনভাবে শিক্ষা গ্রহণ, কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে। মূলত তখনই নারীর নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়।

কিন্তু বাংলাদেশে এর কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে, সেটাই আজ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। নারী নিরাপত্তা আজকের বিশ্বে উন্নয়ন ও মানবাধিকারের অন্যতম প্রধান সূচক। কোন দেশ কতটা সভ্য, ন্যায়ভিত্তিক ও উন্নত তা অনেকটা বোঝা যায় সেই দেশে নারীরা কতটা নিরাপদে চলাফেরা, কাজ ও জীবনযাপন করতে পারছে তার ওপর ভিত্তি করে। নারী সমাজ রাষ্ট্রের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে। তাই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন ব্যাহত হয়। নিরাপদ পরিবেশ নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নেতৃত্বে অংশগ্রহণ বাড়ায়। নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে পরিবার ও সমাজে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি বৃদ্ধি পায়। নারীর প্রতি সহিংসতা মানবাধিকারের লঙ্ঘন এবং এটি সমাজে বৈষম্য ও ভয়ের সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশে নারী সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা বিদ্যমান। সংবিধানে নারী-পুরুষের সমঅধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০; পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০; এবং যৌন হয়রানি প্রতিরোধে হাইকোর্টের ২০০৯ সালের নির্দেশনাসহ বিভিন্ন আইনি ব্যবস্থা নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইন থাকা সত্ত্বেও অনেক নারী এখনও সহিংসতা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বিভিন্ন গবেষণায় তা অহরহই দেখা যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (UNFPA) যৌথ জরিপে দেখা যায়, দেশের প্রায় ৭০% নারী তাদের জীবদ্দশায় শারীরিক, যৌন, মানসিক বা অর্থনৈতিক সহিংসতার শিকার হন।

VAW survey ২০২৪ এ প্রযুক্তি ব্যবহারকারী নারীদের মধ্যে প্রযুক্তিনির্ভর লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

এছাড়াও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) বৈশ্বিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ১-তৃতীয়াংশ (৩১.৬%) নারী তাদের জীবদ্দশায় পারিবারিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হন।

তবে অঞ্চলভেদে, যেমন - দক্ষিণ এশিয়ায় এই হার ৫০% এর কাছাকাছি বা তার বেশি হতে পারে। এ থেকেই বোঝা যায়, নারী আজ পরিবার কিংবা বাইরে কোথাও সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়।

ঘর, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণপরিবহন এমনকি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও নারীরা প্রতিনিয়ত সহিংসতা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। যার ফলে আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা সুসংহত থাকলেও বাস্তব জীবনে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিই স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, শুধুমাত্র আইন প্রণয়নই নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। প্রণয়নের পাশাপাশি আইনের কার্যকর প্রয়োগ, দ্রুত বিচার, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নারীর প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ সমানভাবে প্রয়োজন। অন্যথায়, আইন ও বাস্তবতার মধ্যকার এই ব্যবধান আরও প্রকট হয়ে উঠবে এবং নারীর নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার বারবার বাধাগ্রস্ত হবে। আইন ও বাস্তবতার মধ্যে যে ফারাক রয়েছে, তা কমাতে হলে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার সব পক্ষকে একসাথে কাজ করতে হবে। নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ ও সাইবার অপরাধের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। শিক্ষার মাধ্যমে মানসিকতার পরিবর্তন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে লিঙ্গ সমতা, মানবাধিকার ও নৈতিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে তবেই একটি দেশ সত্যিকার অর্থে উন্নত ও মানবিক সমাজে পরিণত হতে পারে। আর এটাই একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও টেকসই সমাজ প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত।

জুহা

শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত